যাত্রী-হেলপার বাগবিতণ্ডা
সরকারের ঘোষণার আগেই ৫-১০ টাকা বাড়তি ভাড়া
- ভাড়ার নামে হচ্ছে খোলাখুলি অনিয়ম
- প্রতি কিলোমিটারে ১৫ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব যাত্রী কল্যাণ সমিতির

ছবি: আগামীর সময়
ভোরের তাড়াহুড়োয় অফিসগামী মানুষের সময়মতো পৌঁছানোর চাপ, কাঁধে ব্যাগ— ঠিক সে মুহূর্তে বাসে উঠেই বাড়তি ভাড়ার মুখোমুখি হতে হচ্ছে যাত্রীদের। সরকারের কোনো ঘোষণা আসার আগেই ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি ভাড়া দাবি করছেন কন্ডাক্টর, আর তা নিয়েই প্রতিটি বাসে শুরু হচ্ছে বাগবিতণ্ডা।
বৈশ্বিক সংকটের কারণে দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই রাজধানীর বিভিন্ন রুটে বৃদ্ধি করা হয়েছে বাসভাড়া। তেলের দামের ঊর্ধ্বগতির সেই চাপ গিয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের কাঁধে; যেখানে প্রতিদিনের যাতায়াতই হয়ে উঠছে বাড়তি দুশ্চিন্তার কারণ।
ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, আজ মঙ্গলবার অধিকাংশ রুটেই যাত্রীপ্রতি অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত। কোথাও কোথাও এই বৃদ্ধি আরও বেশি। আগে যেখানে ভাড়া ছিল ২০ টাকা, সেখানে এখন নেওয়া হচ্ছে ৩০ টাকা পর্যন্ত। আবার পাওয়া গেছে ৬০ টাকার ভাড়া বেড়ে ৮০ টাকা নেওয়ার অভিযোগও।
কারওয়ান বাজার থেকে মিরপুরগামী যাত্রী খাদিজা আক্তার জানালেন, প্রতিদিন একই ভাড়ায় যাতায়াত করলেও আজ হঠাৎ নেওয়া হয়েছে ১০ টাকা বেশি ভাড়া। একই অভিযোগ আগারগাঁও থেকে ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টারগামী আলিফ পরিবহনের যাত্রী তানজিল হোসেনের।
বললেন, 'এই রুটে আগে ৫০ টাকা ভাড়া ছিল, আজ ৬০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। ভাড়া বেশি নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে বাসের কন্ডাক্টর তেলের দাম বৃদ্ধির অজুহাত দিয়ে বলছেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে আগের ভাড়ায় গাড়ি চালানো সম্ভব হচ্ছে না।'
সদরঘাট-মহাখালী-আব্দুল্লাহপুর রুটে চলাচলকারী আজমেরী পরিবহনে গুলিস্তান থেকে মহাখালী ২৫ টাকার ভাড়া এখন নেওয়া হচ্ছে ৩০ টাকা। যাত্রী আনোয়ার হোসেনের ভাষ্য, তেলের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে বাড়ানো হয়েছে ভাড়া। দ্রুত নতুন ভাড়া নির্ধারণ করতে হবে সরকারকে।
গাবতলী-যাত্রাবাড়ী রুটের যাত্রী মো. মাহবুব অভিযোগ করলেন, 'আগে ১৫ টাকা ভাড়া দিতাম, আজ ২৫ টাকা দিতে হয়েছে। এটি একেবারেই অযৌক্তিক।'
আজিমপুর থেকে টেকনিক্যালগামী মেট্রো পরিবহনের যাত্রী আজিজুল হক জানিয়েছেন, আগে আজিমপুর থেকে মিরপুর-১-এর ভাড়া ছিল ২৫ টাকা, আজ ৩৫ টাকা নেওয়া হয়েছে। সরকার বাসভাড়া নির্ধারণ না করলেও পরিবহন শ্রমিকরা ইচ্ছাকৃতভাবে ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় বাসের কন্ডাক্টর আনিসুরের কাছে। তিনি বললেন, 'দুদিন আগে তেলের দাম বেড়েছে, তাই ভাড়াও বাড়ানো হয়েছে। লোকসান দিয়ে তো গাড়ি চালানো সম্ভব নয়।' তবে সরকারিভাবে ভাড়া নির্ধারণের আগেই কেন বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে— এ প্রশ্নের জবাব দেননি তিনি।
এদিকে একই কারণ দেখিয়ে শিকড় পরিবহনের কন্ডাক্টর রানার দাবি, গত দুদিন লোকসান দিয়ে গাড়ি চালিয়েছেন। তাই বাধ্য হয়ে ভাড়া ৫ টাকা বাড়ানো হয়েছে।
শনিবার রাতে সরকার এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ঘোষণা করে জ্বালানি তেলের নতুন দাম। নতুন দামে নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি লিটার ডিজেল ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩০, অকটেন ১৪০ এবং পেট্রল ১৩৫ টাকা, যা কার্যকর হয়েছে রবিবার থেকে। রাজধানীর অধিকাংশ বাস ডিজেলচালিত হওয়ায় এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে গণপরিবহনে।
তেলের দাম বৃদ্ধির পর প্রতি কিলোমিটারে বাসভাড়া ১৫ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে যাত্রী কল্যাণ সমিতি। অতীতে তেলের দাম কমানোর পরিপ্রেক্ষিতে যে হারে বাস ভাড়া কমানো হয়েছিল, সেই একই অনুপাতে এবার ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব সংগঠনটির।
রবিবার যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দেওয়া হয় এই প্রস্তাব। বিজ্ঞপ্তিতে অভিযোগ করে জানানো হয়, ‘জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিকে পুঁজি করে বাস মালিক সমিতির প্রভাবশালী নেতারা অতীতের মতো একচেটিয়া ভাড়া বৃদ্ধির পাঁয়তারা করছেন।’
সংগঠনটির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেছিলেন, 'ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়ানো হয়েছে। আগের হিসাব অনুযায়ী বাসভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১৫ পয়সা বাড়তে পারে। এর বেশি বাড়ানো হলে জনরোষ তৈরি হবে।'
সোমবার ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও তা অনুষ্ঠিত হয়নি।
অন্যদিকে, পরিবহন সংশ্লিষ্টদের দাবি, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে বেড়েছে পরিচালন ব্যয়। তেলের পাশাপাশি বেড়েছে যন্ত্রাংশ ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ। তেল সংগ্রহে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার কারণে ট্রিপ কমে যাওয়ায় কমছে আয়ও।
ঢাকা শহরে প্রায় ৫ হাজার বাস চলাচল করে। এ ছাড়া শহরতলিতে রয়েছে আরও কয়েক হাজার বাস।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রুত সরকারিভাবে ভাড়া নির্ধারণ না করলে আরও বাড়তে পারে এই অরাজকতা। যাত্রীদের দাবি, ভাড়া বাড়াতে হলে তা নির্ধারণ করতে হবে যৌক্তিক ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়।

