নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে করের বোঝা, ‘সবুজ রাজস্ব নীতি’ চায় সিপিডি
- জীবাশ্ম জ্বালানি সস্তা করে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি
- সোলার প্যানেল এবং বায়ুবিদ্যুৎ সরঞ্জামে অগ্রিম কর প্রত্যাহার দাবি

সিপিডির লোগো
জ্বালানি খাত আরও টেকসই এবং পরিবেশবান্ধব করতে জীবাশ্ম জ্বালানিতে ভর্তুকি ও কর-সুবিধা থেকে ধীরে ধীরে সরে এসে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে কর ও শুল্ক নীতিতে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন বলে মনে করছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। এবারের বাজেটে রাজস্ব নীতিকে আরও পরিবেশবান্ধব এবং টেকসই করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
রবিবার রাজধানীর ধানমণ্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে ‘জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় জীবাশ্ম জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির মধ্যে রাজস্ব বৈষম্য’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয় এ আহ্বান।
সংস্থাটির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম অভিযোগ করেন, বর্তমান রাজস্ব কাঠামো জীবাশ্ম জ্বালানিকে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা দিচ্ছে, অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে কৃত্রিমভাবে অপ্রতিযোগিতামূলক করে রাখা হয়েছে।
‘সরকার একদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাড়ানোর কথা বলছে, অন্যদিকে জীবাশ্ম জ্বালানিকে বিপুল কর ছাড় দিয়ে বাঁচিয়ে রাখছে। দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা ও পরিবেশের স্বার্থে এই নীতিগত বৈপরীত্য দূর করার এখনই সময়।’ এ সময় আসন্ন বাজেটে অর্থমন্ত্রীকে সুস্পষ্টভাবে ‘সবুজ রাজস্ব নীতি’ ঘোষণার আহ্বান জানান তিনি।
সিপিডির গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, দীর্ঘদিন ধরে বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটের ৯৫ শতাংশেরও বেশি বরাদ্দ পেয়েছে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো। বিপরীতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পগুলো বরাদ্দ পেয়েছে পাঁচ শতাংশেরও কম।
এ ধরনের বৈষম্য পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করেছে এবং টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যতের পথে দেশের অগ্রযাত্রা মন্থর করেছে বলে জানান মোয়াজ্জেম।
তারা বলছেন, পরিবেশ দূষণকারী তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিতে কোনো ভ্যাট নেই, এর মোট করভার মাত্র ৯ দশমিক ৫ শতাংশ। কয়লার ক্ষেত্রে এই হার ২৭ শতাংশের ঘরে। অথচ পরিবেশবান্ধব সোলার প্যানেল আমদানিতে প্রায় ২৮ থেকে ৩১ শতাংশ এবং লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির ক্ষেত্রে ৬২ থেকে ৯৩ শতাংশ পর্যন্ত করভার চাপানো আছে। এতে কৃত্রিমভাবে জীবাশ্ম জ্বালানিকে সস্তা করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে সাশ্রয়ী ও জনপ্রিয় করতে আগামী বাজেটের জন্য বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কর অব্যাহতির প্রস্তাব দেয় সিপিডি। এর মধ্যে রয়েছে-সোলার প্যানেল এবং বায়ুবিদ্যুৎ সরঞ্জামের ওপর বিদ্যমান ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অগ্রিম কর প্রত্যাহার, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির কাস্টমস ডিউটি ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং এর ওপর থাকা ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বাতিল করা।
অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি অবকাঠামো সম্প্রসারণের জন্য গ্রিডভিত্তিক সৌর বিদ্যুতের উপকরণের আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি এলএনজি আমদানির ওপর বর্তমান শূন্য ভ্যাট সুবিধা প্রত্যাহার করে ১৫ শতাংশ ভ্যাট পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে সিপিডি।
এছাড়া বৈদ্যুতিক যানের (ইভি) প্রসার বাড়াতে এর ওপর থেকে সম্পূরক ও রেগুলেটরি শুল্ক প্রত্যাহার করে কাস্টমস ডিউটি ২৫ থেকে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছে সিপিডি। বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন আধুনিকায়নের যন্ত্রপাতি, যেমন ট্রান্সফরমার ও স্মার্ট মিটারের কাস্টমস ডিউটিও ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার কথা বলেছে সংস্থাটি।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, সৌর ও বায়ুশক্তি খাতের তুলনায় এলএনজি খাতকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার কারণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রতি বছর সম্ভাব্য ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা থেকে ১ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা পর্যন্ত রাজস্ব হারাচ্ছে। সম্পূর্ণ ভ্যাট অব্যাহতির সুবিধার কারণে এলএনজি আমদানিকারকরা অতিরিক্ত প্রায় ১ হাজার ৬৭২ কোটি টাকার আর্থিক সুবিধা পাচ্ছেন, যা নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে দেওয়া হয় না।
সিপিডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের গড় ভর্তুকি প্রতি ইউনিটে ৭.৫ টাকা, যেখানে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো ২০.১৮ টাকা পর্যন্ত ভর্তুকি পেয়ে থাকে।
একই সঙ্গে বিনা দরপত্রে পাওয়া জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চুক্তি আর কোনোভাবেই নবায়ন না করার পরামর্শ দিয়েছে। সিপিডি বলছে, মেয়াদোত্তীর্ণ কেন্দ্রগুলো অবিলম্বে ‘নো ইলেকট্রিসিটি, নো পে’ শর্তের আওতায় আনতে হবে, যাতে ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা কমে। এতে কমবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) লোকসান।
সংবাদ সম্মেলনে সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট হেলেন মাশিয়াত প্রিয়তী, রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট আতিকুর রহমান সাজিদসহ পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি স্টাডি টিমের অন্যান্য গবেষকেরা উপস্থিত ছিলেন।




