জ্যাকেটের গোপন চেম্বারে ফেনসিডিল, বাসে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ঢাকায়
- ৩০৯ বোতল ফেনসিডিলসহ গ্রেপ্তার ৪
- ৩-৪ বছর ধরে সক্রিয় চক্র

ছবি: আগামীর সময়
বাইরে থেকে দেখতে আর দশটা সাধারণ পোশাকের মতোই জ্যাকেট। অথচ ভেতরে তৈরি করা হয়েছে একাধিক গোপন চেম্বার। সেই চেম্বারে ঢোকানো হয়েছে একের পর এক ফেনসিডিলের বোতল। এরপর যাত্রী সেজে বাসে চেপে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ঢাকার পথে যাত্রা। এভাবেই রাজধানীতে ফেনসিডিল পাচারের নতুন কৌশল নিয়েছে একটি চক্র। চক্রটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে রাজধানীতে ফেনসিডিল সরবরাহ করে আসছিল। শেষ পর্যন্ত তাদের সেই কৌশল ধরা পড়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) গোয়েন্দা জালে।
রাজধানীর মহাখালী কাঁচাবাজার এলাকায় পৃথক দুটি বাসে অভিযান চালিয়ে ৩০৯ বোতল কোডিন ফসফেটযুক্ত ফেনসিডিলসহ চক্রটির চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে ডিএনসির ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়। জব্দ করা হয়েছে মাদক পরিবহন ও যোগাযোগে ব্যবহৃত পাঁচটি মোবাইল ফোন।
আজ বুধবার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মেহেদী হাসান বিষয়টি জানিয়েছেন।
বাস বদল, মোবাইল বন্ধ, এনক্রিপ্টেড অ্যাপ
মেহেদী হাসান জানান, মঙ্গলবার গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তারা জানতে পারে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে দুটি যাত্রীবাহী বাসে করে বিপুল পরিমাণ ফেনসিডিল ঢাকায় আনা হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর মহাখালী কাঁচাবাজার এলাকায় কস্তুরী রেস্টুরেন্টের সামনে অবস্থান নেয় ডিএনসির একটি বিশেষ দল।
নির্ধারিত সময়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ঢাকাগামী ন্যাশনাল ট্রাভেলসের একটি বাস সেখানে পৌঁছালে সেটি থামানো হয়। বাসটিতে থাকা তিন যাত্রীর ওপর সন্দেহ হয়। তাদের সঙ্গে থাকা ব্যাগে তল্লাশি চালিয়ে উদ্ধার করা হয় ১০৯ ও ১০০ বোতল ফেনসিডিল।
কিছুক্ষণ পর একই এলাকায় পৌঁছায় দেশ ট্রাভেলসের আরেকটি বাস। সেটিতেও অভিযান চালিয়ে এক যাত্রীকে আটক করা হয়। তার পরনে থাকা বিশেষভাবে তৈরি জ্যাকেট তল্লাশি করে পাওয়া যায় গোপন চেম্বার। সেখান থেকে উদ্ধার করা হয় কোডিন ফসফেটযুক্ত ফেনসিডিল।
সাধারণ জ্যাকেট, ভেতরে মাদকের ‘গোপন ঘর’
ডিএনসির কর্মকর্তাদের কাছে সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হয়ে উঠেছে ফেনসিডিল পরিবহনে বিশেষভাবে তৈরি জ্যাকেটের ব্যবহার।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাইরে থেকে সাধারণ পোশাকের মতো দেখালেও জ্যাকেটগুলোর ভেতরে তৈরি করা হয়েছিল একাধিক গোপন চেম্বার। এসব চেম্বারে ৫০ থেকে ৬০ বোতল পর্যন্ত ফেনসিডিল বহন করা সম্ভব। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ এড়াতেই এমন অভিনব কৌশল নেয় চক্রটি।
অর্থাৎ একটি বাসে যাত্রীদের ভিড়ের মধ্যেই শরীরের সঙ্গে মাদকের বোতল বহন করছিলেন পাচারকারীরা। বাইরে থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই, একজন সাধারণ যাত্রীর পোশাকের ভেতরেই লুকিয়ে আছে বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ মাদক।
একদিনে উদ্ধার ৩০৯ বোতল ফেনসিডিল
ডিএনসি জানায়, অভিযানে একটি ব্যাগ থেকে ১০৯ বোতল এবং অপর একটি ব্যাগ থেকে ১০০ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া বিশেষভাবে তৈরি জ্যাকেটের গোপন চেম্বার থেকে আরও ১০০ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে উদ্ধার হয়েছে ৩০৯ বোতল কোডিন ফসফেটযুক্ত ফেনসিডিল। প্রতিটি বোতলে ১০০ মিলিলিটার হিসেবে মোট তরল মাদকের পরিমাণ ৩০ দশমিক ৯ লিটার। মাদক কারবারে ব্যবহৃত পাঁচটি মোবাইল ফোনও জব্দ করা হয়েছে।
৩-৪ বছর ধরে চলছে ঢাকায় সরবরাহ
ডিএনসির প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে চক্রটির দীর্ঘদিনের তৎপরতার তথ্য। কর্মকর্তাদের দাবি, গ্রেপ্তাররা গত তিন থেকে চার বছর ধরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ঢাকায় নিয়মিত ফেনসিডিল সরবরাহ করে আসছিল।
নজরদারি এড়াতে তারা একাধিক কৌশল ব্যবহার করত। মাদক পরিবহনের সময় ব্যবহৃত মোবাইল ফোন বন্ধ রাখা, একাধিক রুট ব্যবহার এবং বিভিন্ন যাত্রীবাহী বাসে করে মাদক পাঠানো ছিল তাদের নিয়মিত কৌশল। নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ ও লেনদেনের জন্য ব্যবহার করা হতো বিভিন্ন এনক্রিপ্টেড অ্যাপও।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে মাদক সংগ্রহ করে ঢাকায় এনে স্থানীয় মাদক কারবারিদের কাছে পৌঁছে দেওয়া ছিল তাদের মূল কাজ বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়া গেছে।
গ্রেপ্তার ৪, খোঁজা হচ্ছে নেটওয়ার্কের অন্যদের
গ্রেপ্তাররা হলো- চাঁপাইনবাবগঞ্জের মো. নাসিরুল ইসলাম (৪৮), নাটোরের লালপুরের মো. ফাহিম আজাদ (২৭), চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের মোছা. জুলেখা খাতুন (৩২) এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের মোছা. শারমিন খাতুন (৩২)।
ডিএনসি বলছে, গ্রেপ্তারদের বিরুদ্ধে আগেও একাধিক মাদক মামলা রয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধভাবে কোডিন ফসফেটযুক্ত ফেনসিডিলের অবৈধ কারবারের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে বলে দাবি করেছে সংস্থাটি।
তবে এই চারজনই চক্রটির মূল হোতা কি না, নাকি তাদের পেছনে আরও বড় কোনো নেটওয়ার্ক রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মাদক সরবরাহকারী, অর্থদাতা, স্থানীয় বিক্রেতা ও সহযোগীদের শনাক্তে তদন্ত চলছে।






