জাপান সফরে খুলল অনেক দুয়ার

ছবি: পিএমও
জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করে চার দিনের সফর শেষ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরে দুই দেশের শীর্ষ বৈঠক, যৌথ ঘোষণা, সহযোগিতা চুক্তি, ঋণ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি এবং বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে জাপানের ১ ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের সম্ভাবনা এবং ‘বিগ-বি’ উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত সফরের উল্লেখযোগ্য অর্জন। তবে এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তব বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কতটা ভূমিকা রাখবে, তা নির্ভর করছে বাংলাদেশের প্রস্তুতির ওপর। সাবেক কূটনীতিক ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) সাবেক চেয়ারম্যান মুন্সী ফয়েজ আহমদ মনে করেন, এ সুযোগ কাজে লাগাতে দক্ষ জনবল তৈরি, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং নিজস্ব আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
গত ২৬ অক্টোবর চার দিনের সফরে জাপানের টোকিওতে যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরের দ্বিতীয় দিনে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন তিনি। বৈঠকের পর প্রকাশিত যৌথ ঘোষণায় অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ, বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা, অবকাঠামো ও শিল্প খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর অঙ্গীকার উঠে আসে।
যৌথ ঘোষণায় আগামী পাঁচ বছরে জাপানের বেসরকারি খাতের ১ ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রায় দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনাও তুলে ধরা হয়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও উৎপাদনশীল শিল্পের বিকাশে এটি বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ। তবে এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বাংলাদেশের প্রস্তুতি কতটা, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। মুন্সী ফয়েজ আহমদের মতে, বিদেশি বিনিয়োগের সুফল পেতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি ব্যবহারের উপযোগী দক্ষ জনবল তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি আইনকানুন ও ব্যবস্থাপনাকে আরও বিনিয়োগবান্ধব করার সুযোগ খুঁজতে হবে। শুধু বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি পেলেই হবে না, নতুন শিল্প ও প্রযুক্তি পরিচালনার সক্ষমতাও গড়ে তুলতে হবে।
সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো— ‘বিগ-বি’ বা বাংলাদেশ-জাপান বিশেষ অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্প এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির অবকাঠামো উন্নয়নে সমন্বিত সহযোগিতার পরিকল্পনা রয়েছে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে মাতারবাড়ী-মহেশখালী অঞ্চলকে জ্বালানি, শিল্প ও সরবরাহব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করার উদ্যোগও তাৎপর্যপূর্ণ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। একই সঙ্গে প্রকল্পগুলো বাংলাদেশের প্রকৃত প্রয়োজন পূরণ করছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি।
মুন্সী ফয়েজ আহমদ মনে করেন, বিদেশি সহযোগিতায় নেওয়া প্রকল্পের শর্ত, উপযোগিতা ও দীর্ঘমেয়াদি সুফল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। প্রযুক্তি হস্তান্তরের ব্যবস্থা না থাকলে বিদেশি বিশেষজ্ঞরা কাজ করে গেলেও বাংলাদেশের দক্ষতা বাড়বে না। তার মতে, নতুন প্রযুক্তি আত্মস্থ করে পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা তৈরি করাই হওয়া উচিত এসব সহযোগিতার অন্যতম লক্ষ্য।
সফরকালে উপকূলীয় নিরাপত্তা জোরদারে টহল জাহাজ সরবরাহের জন্য জাপান সর্বোচ্চ ২১২ কোটি ইয়েন অনুদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ ছাড়া অর্থনৈতিক সম্পর্ক, কৃষি, কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুটি উন্নয়ন প্রকল্পে প্রায় ২৯৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণসহায়তার প্রতিশ্রুতিও এসেছে। বেসরকারি খাতকেও সফরে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো) এবং জাপান-বাংলাদেশ বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা কমিটির আয়োজনে বিনিয়োগ ফোরামে জাপানি ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। দুই দেশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এসব সমঝোতার ভিত্তিতে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।
মারুবেনিসহ জাপানের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর আলোচনায় শিল্পায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও উৎপাদনশিল্পে বিনিয়োগের সম্ভাবনা উঠে এসেছে। জাপানের চিবা প্রিফেকচারের ফুতসু শহরে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শনের মাধ্যমে জ্বালানি অবকাঠামো সম্পর্কেও অভিজ্ঞতা নেওয়ার সুযোগ হয়েছে।
বিদেশি বিনিয়োগের সুফল ধরে রাখতে দক্ষ জনবল তৈরির পাশাপাশি নিজস্ব আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন মুন্সী ফয়েজ আহমদ। তার মতে, উন্নয়ন প্রকল্পে ক্রমাগত বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীল না থেকে সরকারের নিজস্ব আয় ও সঞ্চয় বাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে। বিদেশি বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে দেশে প্রশিক্ষণ এবং বাংলাদেশি কর্মীদের বিদেশে নিয়ে গিয়ে হাতে-কলমে শেখানোর সুযোগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থা ও কারিগরি প্রশিক্ষণকে নতুন শিল্পের চাহিদার সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন।
সফর শেষে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির একে সাম্প্রতিক সময়ে কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের অন্যতম সফল সফর হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। তার মতে, এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে মুন্সী ফয়েজ আহমদের মতে, জাপান ও চীনের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককেও সুস্থ ও কার্যকর পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্কের অচলাবস্থা সামগ্রিক কূটনৈতিক সাফল্যকে ম্লান করতে পারে। তাই নতুন অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব গড়ার পাশাপাশি বিদ্যমান সম্পর্কগুলোও কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।



