মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফনে বাধা ‘মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন’, ২৮ নাগরিকের নিন্দা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
পিরোজপুরে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফন ও রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনার প্রদানে জামায়াতে ইসলামীর বাধা দেওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ, ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছেন নাগরিক সমাজের বিশিষ্ট ২৮ ব্যক্তি। তারা এ ঘটনাকে ‘মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘন’ হিসেবে উল্লেখ করে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
শনিবার এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদার পাঠানো বিবৃতিতে তারা বলেন, গত ২৪ অক্টোবর বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মৃত্যুর পর তার গার্ড অব অনার ও দাফনকে কেন্দ্র করে পিরোজপুরে সৃষ্ট পরিস্থিতি অত্যন্ত দুঃখজনক, অনভিপ্রেত ও নিন্দনীয়।
বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রথমবার কবর খোঁড়ার পর স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা সেটি ভরাট করে দেন। পরে আনুমানিক রাত ২টার পর মানিক পশারীর মেয়ে ও দুই বোন গ্রাম পুলিশের সহায়তায় মোবাইল ফোনের আলোয় আবার কবর খুঁড়ে মৃত্যুর প্রায় ১৫ ঘণ্টা পর পুলিশি নিরাপত্তায় তার দাফন সম্পন্ন করেন বলে বিবৃতিতে জানানো হয়।
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার শেষ বিদায়কে ঘিরে এমন পরিস্থিতি রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি সম্পর্কে গভীর প্রশ্ন ও উদ্বেগের জন্ম দেয় বলেও জানান তারা।
বিবৃতিতে বলা হয়, পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে গোপালগঞ্জে মেয়ের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। সেখানেই ২৪ অক্টোবর তিনি মারা যান। রাষ্ট্রীয় নিয়ম অনুযায়ী, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাকে গার্ড অব অনার প্রদানের মাধ্যমে দাফনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে তিনি মুক্তিযোদ্ধা কি না, সেই প্রশ্ন তুলে তাকে দাফনে বাধা দেওয়া হয়।
বিবৃতিদাতারা বলেন, কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার দাফনের অধিকার মৌলিক মানবাধিকার। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী, এমনকি রাষ্ট্রও এ অধিকার লঙ্ঘন করতে পারে না। পরবর্তী সময়ে পিরোজপুর পুলিশ লাইনে তার মরদেহে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের বাধার মুখে প্রায় ১৫ ঘণ্টা তার দাফন আটকে থাকে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, রাষ্ট্রীয়ভাবে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাওয়া কোনো ব্যক্তি মুক্তিযোদ্ধা কি না, তা নির্ধারণের একমাত্র ক্ষমতা রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র প্রয়োজন মনে করলে বিষয়টি যাচাই-বাছাই করতে পারে। কিন্তু স্বাধীনতাবিরোধী কোনো দল এ সিদ্ধান্ত দিতে পারে না যে কে মুক্তিযোদ্ধা আর কে নন। ১৯৭১ সালে দলটি শুধু স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাই করেনি; দলটির নেতাদের অনেকের বিরুদ্ধে বুদ্ধিজীবী হত্যাসহ যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ দালিলিকভাবে প্রমাণিত। বিবৃতিদাতাদের অভিযোগ, দলটি আজ পর্যন্ত এসব অপরাধের দায় স্বীকার করেনি কিংবা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতার জন্য ন্যূনতম প্রকাশ্য ক্ষমা প্রার্থনাও করেনি।
তারা বলেন, মানিক পশারীর সঙ্গে সংঘটিত কর্মকাণ্ড ফৌজদারি অপরাধের শামিল। কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক অবস্থান বা অতীতের ভূমিকার কারণে তার জানাজা ও দাফনে বাধা সৃষ্টি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মৃত ব্যক্তির যথাযথ মর্যাদায় সৎকার করা ইসলাম ধর্মসহ সব ধর্মেরই অনুশাসন এবং অবশ্য পালনীয় শিক্ষা হিসেবে বিবেচিত। সেই শিক্ষাকে অবজ্ঞা করে মানিক পশারীর প্রতি যে অসম্মান দেখানো হয়েছে, তার নিন্দা জানানোর ভাষা তাদের জানা নেই।
বিবৃতিতে এ ধরনের ফৌজদারি অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে উপযুক্ত ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানানো হয়।
বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন—
১. অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, মানবাধিকার কর্মী ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন।
২. খুশী কবির, সমন্বয়কারী, নিজেরা করি।
৩. ড. ইফতেখারুজ্জামান, নির্বাহী পরিচালক, টিআইবি।
৪. অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না, সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।
৫. শাহীন আনাম, নির্বাহী পরিচালক, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন।
৬. রাশেদা কে চৌধুরী, নির্বাহী পরিচালক, গণসাক্ষরতা অভিযান।
৭. শহিদুল আলম, আলোকচিত্রী।
৮. শামসুল হুদা, নির্বাহী পরিচালক, এএলআরডি।
৯. ড. সামিনা লুৎফা, অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
১০. ড. সুমাইয়া খায়ের, অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
১১. ড. তানজীমউদ্দিন খান, অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
১২. ড. জোবাইদা নাসরীন, অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
১৩. রোবায়েত ফেরদৌস, অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
১৪. ড. স্বপন আদনান, ভিজিটিং প্রফেসর, লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্স।
১৫. ড. নোভা আহমেদ, অধ্যাপক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়।
১৬. রেহনুমা আহমেদ, লেখক ও গবেষক।
১৭. অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।
১৮. অ্যাডভোকেট তবারক হোসেন, সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।
১৯. অ্যাডভোকেট সালমা আলী, নির্বাহী পরিচালক, বিএনডব্লিউএলএ।
২০. মো. নুর খান, মানবাধিকারকর্মী।
২১. পাভেল পার্থ, লেখক ও গবেষক।
২২. রোজিনা বেগম, গবেষক ও অধিকারকর্মী।
২৩. জাকির হোসেন, প্রধান নির্বাহী, নাগরিক উদ্যোগ।
২৪. অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমান, প্রধান নির্বাহী, মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন।
২৫. সাঈদ আহমেদ, মানবাধিকারকর্মী।
২৬. দীপায়ন খীসা, মানবাধিকারকর্মী।
২৭. ড. হানা শামস আহমেদ, অধিকারকর্মী।
২৮. মুক্তাশ্রী চাকমা, অধিকারকর্মী।



