জাপানের পুঁজি ও প্রযুক্তিতে চোখ বাংলাদেশের

টোকিওতে সাসাকাওয়ার আমন্ত্রণে নৈশভোজে সস্ত্রীক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান - পিএমও
টোকিওর আকাশ জুড়ে মেঘ। সঙ্গে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি আর হালকা শীতের আমেজ। তাপমাত্রা ১৭ থেকে ১৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলেও বাংলাদেশিদের কাছে তা বেশ শীতল। এমন আবহাওয়ার মধ্যেই গতকাল সোমবার সকালে জাপানের নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ১০ মিনিটে তাকে বহনকারী উড়োজাহাজটি অবতরণ করে। বিমানবন্দর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে টোকিওর ইম্পেরিয়াল হোটেলে পৌঁছান তিনি। বিশ্রামের অবকাশ খুব বেশি ছিল না। হোটেলে পৌঁছানোর পরই শুরু হয় একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক।
চার দিনের সফরের প্রথম দিনেই জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী তারো আসো, দেশটির বৃহৎ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান মারুবেনি করপোরেশনের চেয়ারম্যান মাসুমি কাকিনোকি এবং জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রেসিডেন্ট আকিহিকো তানাকার সঙ্গে বৈঠক করেন তারেক রহমান। তিনটি বৈঠকেই ঘুরেফিরে এসেছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জাপানি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের প্রসঙ্গ।
স্পষ্টতই, এবারের সফরে বাংলাদেশের লক্ষ্য শুধু পুরনো বন্ধুত্বের সম্পর্ক ঝালাই করা নয়; বরং সে সম্পর্ককে নতুন বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগে রূপ দেওয়া। কোন খাতে জাপানি বিনিয়োগ বাড়তে পারে, কীভাবে বিনিয়োগের প্রক্রিয়া সহজ করা যায় এবং জাপানের প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের কাজে লাগানো যায়— এসব বিষয়েই গুরুত্ব দিচ্ছে ঢাকা।
আজ মঙ্গলবার স্থানীয় সময় বেলা সাড়ে ১১টায় জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি। দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আরও জোরদার করা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং উন্নয়ন সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরির বিষয়ে সেখানে আলোচনা হওয়ার কথা। পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে সমঝোতা স্মারক সইয়ের প্রস্তুতি চলছে। আটটি সমঝোতা নিয়ে আলোচনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত কয়টি সই হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
বিনিয়োগ বাড়াতে জাপানের সহযোগিতা চান প্রধানমন্ত্রী
গতকাল বেলা ৩টায় টোকিওর ইম্পেরিয়াল হোটেলে জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও জাপান-বাংলাদেশ সংসদীয় মৈত্রী লীগের সভাপতি তারো আসোর নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। আলোচনায় উঠে আসে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, জাপানি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়।
প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন জানালেন, বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি সইয়ের পরিপ্রেক্ষিতে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণে তারো আসোর সহযোগিতা চান তারেক রহমান। বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার বাস্তবায়ন এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতেও জাপানের অব্যাহত সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন তিনি।
তারো আসোর সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের স্মৃতিও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। ২০০৬ সালে বিএনপির তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে জাপান সফরের সময় তাদের সাক্ষাতের কথা স্মরণ করেন তিনি। জাপানের প্রধানমন্ত্রী, উপপ্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকাকালে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে তারো আসোর ভূমিকার প্রশংসা করেন তারেক রহমান।
অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকটও গুরুত্ব পায়। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে জাপানের সহযোগিতা কামনা করেন প্রধানমন্ত্রী। তারো আসো ও সংসদীয় মৈত্রী লীগের সদস্যদের বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণও জানিয়েছেন তিনি।
সার কারখানা থেকে প্রযুক্তি, মারুবেনির দিকে বাংলাদেশের নজর
বিকাল ৩টা ৪৫ মিনিটে মারুবেনি করপোরেশনের চেয়ারম্যান মাসুমি কাকিনোকির সঙ্গে বৈঠকে বসেন তারেক রহমান। বাংলাদেশের কোন কোন খাতে জাপানি বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে, সেই আলোচনায় অটোমোবাইল, অর্ধপরিবাহী, তথ্যপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও উন্নত উৎপাদনশিল্পকে গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।
তবে আলোচনার পরিধি শুধু নতুন বিনিয়োগের আহ্বানে সীমাবদ্ধ ছিল না। বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন, কর্ণফুলী সার কারখানার আধুনিকায়ন এবং দেশে দ্বিতীয় একটি সার কারখানা স্থাপনের সম্ভাবনা যাচাইয়েও জাপানের সহযোগিতা চান তিনি।
বাংলাদেশের প্রত্যাশা, জাপানের প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে শিল্প উৎপাদন বাড়ানো, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা সম্ভব হবে। এজন্য বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়ন, অনুমোদনপ্রক্রিয়া সহজ করা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব জোরদারের বিষয়েও সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি, শিল্প ও অবকাঠামো খাতে মারুবেনির বিস্তৃত কার্যক্রম রয়েছে। বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির অভিজ্ঞতা ও বিদ্যমান বিনিয়োগ কাজে লাগিয়ে নতুন শিল্প উদ্যোগের পাশাপাশি চলমান শিল্প অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে সার উৎপাদন ও জ্বালানি খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণ দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও কার্যকর করতে পারে।
জাইকার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক
দিনের শেষ গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকটি হয় জাইকার প্রেসিডেন্ট আকিহিকো তানাকার সঙ্গে। বিকাল ৫টা ১০ মিনিটে অনুষ্ঠিত সৌজন্য সাক্ষাতে বাংলাদেশের উন্নয়নে জাপানের দীর্ঘদিনের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে জাপানের সহায়তায় চলমান বড় প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ে শেষ করা এবং অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তারেক রহমান।
বৈঠকে বাংলাদেশের জন্য সহজশর্তে ঋণসহায়তা অব্যাহত রাখা এবং কারিগরি সহযোগিতা সম্প্রসারণের প্রত্যাশা তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশ-জাপান দক্ষতা উন্নয়ন অংশীদারত্ব, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন নগরী প্রতিষ্ঠা, কৃষির আধুনিকায়ন, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং হালকা প্রকৌশল খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়।
জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে দেশের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে বাজেট সহায়তা দেওয়ার অনুরোধ জানায় বাংলাদেশ। জাইকার প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের সমৃদ্ধি অর্জনে একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
চার বিষয়ে অগ্রাধিকার
জাপানের সংবাদমাধ্যম ইয়োমিউরি শিম্বুনে গত ২৩ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে চারটি বিষয় অগ্রাধিকার পাচ্ছে। এগুলো হলো— ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টিতে বাণিজ্যিক পরিবেশ ও নিয়মকানুন উন্নত করা এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় সহযোগিতা।
পাঁচ বছরে ৬৩০ কোটি ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা
জাপানের সংবাদমাধ্যম নিক্কেইয়ের ২২ অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ১ ট্রিলিয়ন ইয়েন বা প্রায় ৬ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগের ব্যবস্থা করতে চায় জাপান। বাংলাদেশে গাড়ি উৎপাদনসহ বিভিন্ন শিল্প, উৎপাদন খাত এবং জ্বালানি অবকাঠামোতে এ বিনিয়োগ আসতে পারে। জাপানের সুমিতোমো করপোরেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততায় গড়ে ওঠা বাংলাদেশ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলও বিনিয়োগের সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলোর একটি।
বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান টোকিওর নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে তাকে অভ্যর্থনা জানিয়েছেন জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নাকাসোনে ইয়াসুতাকা। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ ও প্রধানমন্ত্রীর এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক বিশেষ সহকারী শাকিরুল ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন।
বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রধানমন্ত্রী ও তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানকে মোটর শোভাযাত্রার মাধ্যমে নিয়ে যাওয়া হয় ইম্পেরিয়াল হোটেলে। জাপান সফরকালে প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীরা এই হোটেলে অবস্থান করবেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতিনিধিদলে রয়েছেন— অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন (আশিক চৌধুরী), বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক বিশেষ সহকারী শাকিরুল ইসলাম খান, পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম, সচিব সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক বিভাগের সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব, নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী ও আমজনতার দলের সাধারণ সম্পাদক মো. তারেক রহমান।



