এআরটি-১
মেট্রোর এক কিলোমিটারের কী হবে
- কাজ ছেড়ে কাজিমা চলে গেছে জাপান
- তাদের করার কথা ছিল নর্দ্দা-নতুন বাজার ১.২ কি.মি. পথ
- তিন বিকল্প ভাবছে সরকার
- ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে কাজ শুরু, এখনো শুরুতেই আটকে আছে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একত্রিশ কিলোমিটারের মেট্রো। তার তিন ভাগের এক ভাগ মাটির ওপরে। বাকিটা পাতালে। পুরো পথটা করার কথা ১২ ভাগে বা প্যাকেজে। তার মধ্যে নর্দ্দা-নতুন বাজারের প্যাকেজটা ছিল কাজিমা করপোরেশনের। কিন্তু সময়মতো কাজ শুরু না করায় তারা ক্ষুব্ধ। এর সঙ্গে অভিযোগ, সিদ্ধান্ত নিতে টালবাহানা করে কর্তৃপক্ষ। এসব বলে কাজ ফেলে চলে গেছে জাপানি সংস্থাটি। ছেড়ে যাওয়া এ কাজটুকু কে করবে— তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তিন বিকল্প নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। সেখানেও নানা ঝুঁকি।
প্রায় একই অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে তিন বছরের বেশি সময়। মাঝে ঘটেছে অনেক ঘটনা। মেট্রোর কাজ শুরু করতে ঢাকায় জাপানের রাষ্ট্রদূত দুই দফা চিঠি দিয়েছেন সরকারকে। সময় বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয় সরকারের তরফে। কিন্তু তাতে মন ভরেনি কাজিমার। তাদের হাতে অনেক কাজ। এখানকার সিদ্ধান্তহীনতার সংস্কৃতি তাদের পোষায় না। শেষমেশ কাজ করবে না স্পষ্ট জানিয়ে টোকিওর পথ ধরে কাজিমা।
এই প্রতিষ্ঠানটির ১ দশমিক ২ কিলোমিটার পাতাল মেট্রোরেলের পথ নির্মাণ করার কথা ছিল। এই অংশের দুই প্রান্তে নর্দ্দা ও নতুন বাজারে দুটি মেট্রোস্টেশন নির্মাণ করার দায়িত্বও ছিল তাদের কাঁধে।
কাজিমা করপোরেশন চলে যাওয়ার পর এখন বড় প্রশ্ন, এই অংশের নির্মাণকাজের ভবিষ্যৎ কী হবে? যদিও উত্তর খুঁজতে ব্যস্ত মেট্রো বাস্তবায়নকারী সরকারি প্রতিষ্ঠান ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। কোম্পানির আগামী বোর্ড সভায় এ বিষয়ে আলোচনা উঠবে।
ডিএমটিসিএলের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়েছে আগামীর সময়ের। তারা বলছেন, এখনো এ বিষয়টি নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসা যায়নি। কয়েক দফা আলোচনা হয়েছে। আগামী বোর্ড সভার আলোচ্যসূচিতে রাখা হয়েছে। বাকিটা সভা থেকে সিদ্ধান্ত আসবে।
যদিও প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আপাতত ডিএমটিসিএল তিনভাবে চিন্তা করছে। প্রথম, পুনঃদরপত্র আহ্বান। যেখানে শুরু থেকে দরপত্রের প্রক্রিয়া শুরু হবে। আবার কাজিমা যেহেতু ৫ নম্বর প্যাকেজের কাজ করত, এ ক্ষেত্রে ৪ ও ৬ নম্বর প্যাকেজের জন্য যেসব ঠিকাদার কাজ করছে, তাদের ৫ নম্বর প্যাকেজটি ভাগ করে দেওয়া যেতে পারে বলেও আলোচনা আছে। এ ছাড়া প্রথম দরপত্রে অংশ নিয়ে যারা প্রাথমিকভাবে (প্রি-কোয়ালিফাই) টিকে ছিল, শুধু তাদের নতুন করে দরপত্র চাওয়া হতে পারে। এতে সময় বাঁচবে, নির্ধারণ হবে নতুন খরচের সংখ্যা।
এর বাইরেও আরেকটি আলোচনা উঠে আসছে। তাতে যে দরপত্রে কাজিমা করপোরেশন সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েছিল, সেই একই দরপত্রে দ্বিতীয় অবস্থানে যারা ছিল, সরাসরি তাদের কাজ করার জন্য প্রস্তাব দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু তাতে ব্যয়ের একটা পার্থক্য থেকে যায়। আবার ৪ ও ৫ নম্বর প্যাকেজ যে প্রতিষ্ঠান করছে, তাদের কাজ দিতে কাজিমার প্রস্তাব থেকেও ২০ শতাংশ বেশি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে। সে ক্ষেত্রে অবশ্য দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দরদাতার খরচের কাছাকাছি খরচ ঠেকবে। তাই সময় বাঁচাতে এই পদ্ধতিও নেওয়া হতে পারে।
এত কিছুর মধ্যে ঢাকার মেট্রোরেল সম্প্রসারণ প্রকল্পে (এমআরটি) বিলম্ব হলে আরও আন্তর্জাতিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রকল্প থেকে সরে যেতে পারে বলে সতর্ক করে সরকারকে চিঠি দিয়েছিল জাপান। প্রকল্পটির ক্রয় প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে আশ্বস্ত করতে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়ে এই চিঠি দেন ঢাকায় জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি।
সড়ক পরিবহনমন্ত্রীকে দেওয়া সেই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, এরই মধ্যে একটি কোম্পানি প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে ভাবছে আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে জুনের মাঝামাঝি তাদের বিড বন্ডের মেয়াদ শেষ হলে আরও জটিল হতে পারে পরিস্থিতি। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট সব কোম্পানিকে আশ্বস্ত করতে দ্রুত গ্রহণপত্র (লেটার অব অ্যাকসেপ্টেন্স) ইস্যু কিংবা পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে চুক্তি সম্পন্নের দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে হবে। দেরি হতে থাকলে শুধু মূল ঠিকাদার নয়; তাদের উপ-ঠিকাদার (সাব-কন্ট্রাক্টর) ও সরবরাহকারীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
খরচ বৃদ্ধিকে যৌক্তিক ধারণা দিতে গিয়ে সেই চিঠিতে বলা হয়, প্রকল্পটির দরকষাকষির অধিকাংশ আলোচনা এখনো হচ্ছে ২০১৯ সালের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী। কিন্তু গত ছয় বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে নির্মাণসামগ্রীর দাম। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে নতুন করে সৃষ্টি হয়েছে মূল্যচাপ। এ কারণে দরদাতাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
২০২২ সালে শুরু হওয়া এই কাজের জন্য এখন পর্যন্ত নির্মাণকারী সব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত করতে পারেনি ডিএমটিসিএল। চুক্তিতে অতিরিক্ত দেরি হওয়ায় একটি প্রতিষ্ঠান তো চলেই গেল। যে দুটি অংশের কাজের জন্য দরপত্র শেষে চুক্তি হয়, সেগুলোর কাজ থেমে রয়েছে।
রাজধানীর কাঞ্চন সেতু থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ৩১ দশমিক ২৪ কিলোমিটার পথটি ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) লাইন-১ নামে পরিচিত হবে। এর মধ্যে ১৯ দশমিক ৮৭ কিলোমিটার মাটির নিচ দিয়ে, বাকি ১১ দশমিক ৩৭ কিলোমিটার উড়ালপথে যাবে। ২০২৬ সালে কাজ শেষ হলে প্রতিদিন প্রায় আট লাখ যাত্রী চলাচল করতে পারতেন। এতে যানজট, জীবাশ্ম জ্বালানি ও সময় ব্যয়— সবই কমত। প্রকল্পের প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু হয় ২০১৯ সালে। তখন বিস্তারিত জরিপ, নকশা এবং ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়।
দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল নির্মাণের জন্য ২০১৮ সালের ধারণামূলক নকশা প্রস্তাবের ভিত্তিতে ডিপিপি তৈরি হয়। তাতে খরচ ধরা হয় ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। জাপানের সরকারি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নে আন্তর্জাতিক টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ২০২২ সালে শুরু হয় প্রকল্পের কার্যক্রম।
প্রাক-যোগ্যতা পর্যায়ে বাংলাদেশ, ভারত, চীন, মিসর, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশের নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান এতে অংশ নেয়। মূল দরপত্র কার্যক্রম শুরু হয় ২০২৩ সালে। দরপত্র প্রক্রিয়া শেষে ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৯৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ মূল নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার আগেই ব্যয় প্রায় ৮৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।
মূলত নির্মাণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধি এবং ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ার কারণে ব্যয়ের পরিমাণ বেড়েছে আশাতীত। দ্রুত নির্মাণকাজ শুরু করা না গেলে এই ব্যয় আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সময় যেহেতু অনেকখানি গেছে, তাহলে আরেকটু যাক, তবুও পুনঃদরপত্র করা হোক— এমনটাই মনে করছেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান। তিনি মনে করেন, ‘নকশা পরিবর্তন করে নির্মাণ ব্যয় কমানোর পথ তৈরি হতে পারে। আবার নির্মাণ পদ্ধতিতে বেশ কিছু শর্ত যুক্ত থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান আগের দরপত্রে অংশ নিতে পারেনি। সেসব শর্ত তুলে দিয়ে পাতাল অংশের পুরোটায় আবার দরপত্র আহ্বান করা যায় কি না, সেটি ভাবা উচিত। কারণ, এটিই আমাদের প্রথম পাতাল মেট্রো। এটির উদাহরণ নিয়ে পরেরগুলো তৈরি হবে। ব্যয় অনেক বেশি হলে চাপ বাড়বে ভাড়ার ওপর।’




