নারীদের বাস আগেও ছিল, টেকেনি কেন

নতুন করে চালু হতে যাচ্ছে গোলাপি রঙের মহিলা বাস সার্ভিস
রাজধানীর সড়কে নারীদের জন্য বিশেষ বাস নতুন কোনো উদ্যোগ নয়। প্রায় তিন দশকে একাধিকবার এমন বাস নামানো হলেও নিয়মিত ও পর্যাপ্ত সেবা নিশ্চিত না হওয়ায় বারবারই তা হারিয়ে গেছে সড়ক থেকে। ২০১৮ সালে বেসরকারি উদ্যোগে ‘দোলনচাঁপা’ নামে চারটি বাস পর্যন্ত চললেও ২০২২ সালের ২৩ অক্টোবর সেই সেবাও বন্ধ হয়ে যায়। এর আগে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) নারী বাস সার্ভিসও বিভিন্ন সময়ে রুট ও বাসের সংখ্যা কমে কার্যত সীমিত হয়ে পড়ে। এবার সেই ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা পেছনে ফেলে নতুন করে রঙ মাখিয়ে মঙ্গলবার থেকে নারীদের জন্য বাস চালু করতে যাচ্ছে বিআরটিসি।
নারীদের জন্য আলাদা বাসের উদ্যোগ দেশে প্রথম নেওয়া হয় ১৯৯৮ সালে বিআরটিসির মাধ্যমে পরীক্ষামূলকভাবে। পরে ২০০১ সালে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় সেবা সম্প্রসারণ করা হয়। বিভিন্ন সময়ে সেবা বন্ধ ও পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০০৮ সালে বিআরটিসি মিরপুর-গুলিস্তান ও খিলগাঁও তালতলা-গুলিস্তান রুটে আবার বিশেষ বাস চালু করেছিল। গবেষণাতেও দেখা যায়, সে সময় নারী বাস সেবার বড় সমস্যা ছিল সীমিত রুট, সময়সূচি ও যাত্রীদের মধ্যে সেবা সম্পর্কে কম পরিচিতি।
২০১৪ সালের রামপুরা-বাড্ডা-খিলগাঁও-মতিঝিল রুটে বরাদ্দ চারটি বাস কমে তিনটিতে নেমেছিল। টঙ্গী-মতিঝিল রুটে দুইটির জায়গায় চলছিল একটি এবং মিরপুর-১২-মতিঝিল রুটেও দুইটির জায়গায় ছিল একটি। অনেক বাস দিনে মাত্র একটি ট্রিপ দিত। অর্থাৎ কাগজে বাস থাকলেও বাস্তবে নিয়মিত সেবা পাওয়া যাচ্ছিল না। ২০১৬ সালেও এমন চিত্র পাওয়া যায়। আব্দুল্লাহপুর-মতিঝিল নারী বাস সার্ভিস বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তা পুনরায় চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ওই সময় রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে নারী সার্ভিস হিসেবে ১৯টি বাস চলার কথা বলা হয়েছিল।
পরবর্তীতে বিআরটিসির নারী বাস সেবা নিয়ে বিভিন্ন অব্যবস্থাপনার কথা উঠে আসে। নির্ধারিত সময়সূচি না থাকা, বাস নিয়মিত না চলা, যাত্রীদের অনেকের সেবা সম্পর্কে না জানা, পুরোনো বা দুর্বল বাস ব্যবহার এবং যাত্রীসংখ্যা কম থাকার অভিযোগ ছিল। ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে বিআরটিসির কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছিলেন, নারী বাস সার্ভিসে নির্দিষ্ট সময়সূচি ও শৃঙ্খলার ঘাটতি রয়েছে এবং সেবাটি লোকসানে চলছে।
দোলনচাঁপার অভিজ্ঞতাও সুখকর নয়
সরকারি উদ্যোগের বাইরে ২০১৮ সালের ২ জুন বেসরকারি উদ্যোগে রাজধানীতে নারীদের জন্য চালু হয় ‘দোলনচাঁপা’ বাস। র্যাংগস গ্রুপ ও ভারতীয় ভলভো আইশার ভেহিকেল লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে মিরপুর-১২ থেকে মতিঝিল রুটে এসি বাস দিয়ে এই সেবা শুরু হয়েছিল। শুরুতে দুটি বাস থাকলেও নারী যাত্রীদের আগ্রহের কারণে পরে সংখ্যা চারটিতে উন্নীত হয়। পরে মিরপুর ইসিবি চত্বর থেকে আজিমপুর রুটেও বাস চলাচল শুরু করে।
তবে চালুর পরপরই দোলনচাঁপার ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। চালুর পরের মাসেই দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও মিরপুর-১২ এলাকায় বাসটির দেখা পাওয়া যায়নি। উদ্বোধনের সময় দুই মাসের মধ্যে আরও বাস নামানোর ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে তা প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি। করোনার সময় যাত্রী কমে যাওয়ায় চারটির মধ্যে দুটি দোলনচাঁপা বাসের চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছিল। পরে দুটি বাস দিয়ে সেবা চালু থাকলেও শেষ পর্যন্ত ২০২২ সালের ২৩ অক্টোবর পুরো সার্ভিস বন্ধ হয়ে যায়।
কেন সফল হয়নি নারী বাস
বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি কারণ সামনে আসে। প্রথমত, বাসের সংখ্যা ছিল প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। ২০১৮ সালে ঢাকার বিভিন্ন রুটে প্রতিদিন চলা প্রায় সাত হাজার বাসের বিপরীতে নারীদের জন্য বিআরটিসি বাস ছিল মাত্র ১৭টি। দ্বিতীয়ত, নির্দিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য সময়সূচির অভাব নিরুৎসাহিত করেছে নারী যাত্রীদের। একটি গবেষণায় প্রায় অর্ধেক নারী সময়সূচির সমস্যার কারণে নারী বাস ব্যবহার করেননি বলে উঠে আসে। একই গবেষণায় সেবাটিকে লোকসানি প্রকল্প হিসেবে দেখানোর কথাও উল্লেখ করা হয়।
তৃতীয়ত, পর্যাপ্ত প্রচার ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি ছিল। ২০২৪ সালের মাঠপর্যায়ের এক জরিপে দেখা যায়, অনেক নারীই বিআরটিসির বাস সার্ভিস সম্পর্কে জানতেন না। এমনকি বাসে যাত্রীসংখ্যা ও আয়-ব্যয়ের সুনির্দিষ্ট হিসাবও নিয়মিতভাবে সংরক্ষিত ছিল না বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। চতুর্থত, নারীদের জন্য নির্ধারিত সেবায়ও পুরুষের অনুপ্রবেশ ও শৃঙ্খলার সমস্যা ছিল। দোলনচাঁপায় পুরুষ যাত্রী উঠে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে। আবার সাধারণ বাসে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনও অনেক সময় পুরুষ যাত্রীরা দখল করে রাখেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সবশেষে রয়েছে আর্থিক টেকসইতার প্রশ্ন। যাত্রী কম হলে নারী বাস পরিচালনায় লোকসান হয়— এমন অভিযোগ বিআরটিসির কর্মকর্তাদের। ফলে কেবল বাস নামালেই যে সেবা টেকসই হবে না, আগের অভিজ্ঞতা সেটিই দেখিয়েছে।
এবার কতটা আলাদা?
নতুন উদ্যোগের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো— এবার শুধু আলাদা বাস নয়, বাসের চালক ও চালকের সহকারীও নারী থাকবেন। গোলাপি রঙের বাস এবং ‘মহিলা বাস সার্ভিস’ লেখা থাকায় দূর থেকেই বাসগুলো চেনার সুযোগ থাকবে। পাশাপাশি একসঙ্গে রাজধানীর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ করিডরে ১০টি বাস নামানোর পরিকল্পনা আগের সীমিত পরিসরের তুলনায় বড় উদ্যোগ।
তবে আগের অভিজ্ঞতার প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে— বাসগুলো কি নির্ধারিত সময়সূচি মেনে নিয়মিত চলবে? যাত্রীদের কাছে রুট ও সময়সূচি কীভাবে পৌঁছে দেওয়া হবে? বাস বিকল হলে বিকল্প বাস থাকবে কি না, যাত্রীসংখ্যা ও আয়-ব্যয়ের হিসাব কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে এবং যাত্রী কম হলেও সেবা চালু রাখা হবে কি না। এসব বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থাপনা না থাকলে নতুন উদ্যোগও আগের মতো থমকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
নারীদের জন্য আলাদা বাসের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও গণপরিবহনে হয়রানি ও নিরাপত্তাহীনতার বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, আলাদা বাসের পাশাপাশি সাধারণ গণপরিবহনকেও নারীবান্ধব করা জরুরি। কারণ নারী যাত্রীদের প্রয়োজন মেটাতে শুধু বিশেষ বাসের সংখ্যা বাড়ানো যথেষ্ট নয়; নিয়মিত, নির্ভরযোগ্য ও নিরাপদ গণপরিবহন নিশ্চিত করাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।
নতুন উদ্যোগে রাজধানীর বিভিন্ন রুটে মোট ১০টি বাস চলবে। পাশাপাশি বগুড়া ও চট্টগ্রামে চলবে আরও চারটি বাস। বাসগুলোর রঙ হবে গোলাপি এবং গায়ে লেখা থাকবে ‘মহিলা বাস সার্ভিস’। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হিসেবে এবার বাসের চালক ও চালকের সহকারী—দুজনই নারী থাকবেন। ফলে আগের সেবার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নারীবান্ধব পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে।









