চামড়া রহস্য

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কোরবানির পশুর প্রতি বর্গফুট কাঁচা চামড়ার (গরু) দাম ২০১৩ সালে ছিল প্রায় ৯০ টাকা। ২০২৬-এ সরকার নির্ধারণ করে দেয় ৬৫ টাকা। অর্থাৎ ১৩ বছরে দাম বাড়া দূরের কথা, উল্টো কমে গেছে ২৫ টাকা। প্রায় ২৮ শতাংশ। কিন্তু একই সময়ে দেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি আয় কমেনি, বরং দীর্ঘমেয়াদে বেড়েছে। এখানেই বড় প্রশ্ন— যে খাত বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে, সেই খাতের মূল কাঁচামাল কোরবানির পশুর চামড়ার দাম ১৩ বছর ধরে কেন কমেছে। দীর্ঘমেয়াদি ধস এবং লাখ লাখ চামড়া নষ্ট হচ্ছে। ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে মৌসুমি ক্রেতা, মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলো। কী এর রহস্য!
অনুসন্ধানে জানা যায়, চামড়ার বাজারে প্রতি বছরই বিপর্যয়ের কারণ একাধিক। সরকারের কৃত্রিমভাবে দাম নির্ধারণ, আন্তর্জাতিক বাজার হারানো, চীনের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা, ট্যানারির সংকট, পরিবেশগত সনদ না পাওয়া এবং সিন্ডিকেটভিত্তিক বাজার কাঠামো। এসব কারণে দেশের চামড়াশিল্প রয়েছে অস্তিত্ব সংকটে। কাঁচা চামড়ার সরবরাহকারী এ খাতের সবচেয়ে দুর্বল পক্ষ আর পুরো ভ্যালু চেইনের লাভ কেন্দ্রীভূত হয়েছে ট্যানারি ও রপ্তানিকারক গোষ্ঠীর হাতে। এবারের কোরবানি ঘিরেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। সরকার যথারীতি দাম বেঁধে দিলেও বাজারের দাম তার ধারেকাছেও যায়নি। এমনকি উপযুক্ত মূল্য না পেয়ে চামড়া নদীতে ফেলে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। চট্টগ্রাম, ফেনী, সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন এলাকায় মৌসুমি ব্যবসায়ীদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে কেনা চামড়ার ন্যায্য দাম না পেয়ে সেগুলো রাস্তার ওপরে, নদীর পাড়ে ও খোলা জায়গায় ফেলে দিতে দেখা গেছে।
‘মুক্ত বাজার’ শুধু কাগজে: বাংলাদেশ মুক্তবাজার অর্থনীতির দেশ; কিন্তু কোরবানির চামড়ার ক্ষেত্রে প্রতি বছর সরকার দাম বেঁধে দেয়। আবার বাস্তবে সেই দামও কার্যকর হয় না। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কোনো বাজারে যদি সরকার পণ্যের মূল্য বেঁধে দেয়, আর ক্রেতা গোষ্ঠী সীমিত থাকে, তাহলে সেটি প্রতিযোগিতামূলক বাজার নয়; বরং ‘ক্রেতানির্ভর নিয়ন্ত্রিত বাজার’-এ রূপ নেয়। চামড়ার ক্ষেত্রে সেটিই ঘটছে। দেখা গেছে, প্রতি বছরের মতো এবারও চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। রাজধানীতে প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম ৬০-৬৫ এবং ঢাকার বাইরে ৫৫-৬০ টাকা নির্ধারণ করলেও বাস্তবে অনেক এলাকায় ২০-৩০ টাকার বেশি দাম মেলেনি। কোথাও কোথাও চামড়া একেবারেই বিক্রি হয়নি।
মুক্তবাজার অর্থনীতিতে মূল্য বেঁধে দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্য সচিব (রুটিন দায়িত্ব) মো. আবদুর রহিম খান আগামীর সময়কে বললেন, কোরবানির ঈদ কেন্দ্র করে সারা দেশে এক দিনে এক কোটি পিসের বেশি পশুর চামড়া কেনাবেচা হয়। এটি চামড়ার বাজারে নিয়মিত সরবরাহ ও চাহিদার বিবেচনায় অস্বাভাবিক। যে কারণে এটি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য সরকার হস্তক্ষেপ করে। আগামীতে চামড়ার বাজারে বিপর্যয় এড়াতে সরকার একটি পরিকল্পনা করছে। এ পরিবর্তনে মত দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রীও। বিশেষ করে ঢাকা, চট্রগ্রাম ও নাটোরসহ যেসব অঞ্চলে বেশি চামড়া সংগ্রহ হয় সেখানে পাইলটিং ভিত্তিতে পশুর চামড়া ছাড়ানো ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করার চিন্তাভাবনা রয়েছে।
ট্যানারি মালিকদের যুক্তি কতটা সঠিক: ট্যানারি মালিকদের দীর্ঘদিনের দাবি— বাংলাদেশের চামড়া আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স মানতে পারছে না। বিশেষ করে পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণ না হওয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও উন্নত বাজারে প্রবেশ সীমিত। ফলে চীন ছাড়া বড় ক্রেতা নেই। কিন্তু এ বক্তব্যের মধ্যেই বড় অসংগতি রয়েছে বলে মনে করেন খাত-সংশ্লিষ্টরা। প্রথমত, যদি আন্তর্জাতিক বাজার এত খারাপ হয়, তাহলে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি আয় প্রতি বছর বাড়ছে কীভাবে। দ্বিতীয়ত, রপ্তানি আয় বাড়লেও কেন তার সুফল কাঁচা চামড়ার উৎপাদক পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে না। তৃতীয়ত, যদি বাজার সংকুচিতই হয়, তাহলে ট্যানারি খাতের বড় উদ্যোক্তারা কেন নতুন বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকৃত সমস্যা আন্তর্জাতিক বাজারে নয়; বরং দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার কাঠামোতেই।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, উচ্চমাত্রার বর্জ্য তৈরি করে যেসব শিল্প সেগুলো এমন স্থানে হওয়া উচিত যেখানে পর্যাপ্ত বর্জ্য পরিশোধনের ব্যবস্থা বা সেন্ট্রাল এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (সিইটিপি) সুবিধা আছে। সেই বিবেচনায় হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারিশিল্প স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। কিন্তু যেভাবে এটি স্থানান্তর করা হয়েছে, সেই ব্যবস্থাপনাটি ছিল অব্যবস্থাপনায় ভরা। তার মতে, আগামী জুলাই মাসের মধ্যে চামড়া খাতের উন্নয়ন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রকাশ করা হবে।
ট্যানারি ব্যবসায়ী আইয়ুব ব্রাদার্স লিমিটেডের পরিচালক বেলাল হোসেন গত শুক্রবার আগামীর সময়কে বলছিলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ায় ট্যানারি মালিকরা কম দামে চামড়া কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। তার মতে, সরকারকে আগে এ শিল্প ঘিরে সমস্যার শিকড়ে যেতে হবে। সেখানে সমাধান করতে পারলে কোরবানির চামড়ার মূল্য বেঁধে দেওয়া বা না দেওয়া তখন খুব বেশি প্রভাব ফেলবে না। এখন আমরা শুধু চীনের বাজারের ওপর ভরসা করে পুরো চামড়া খাত পরিচালনা করছি। এ অবস্থা থেকে বেরোতে হলে আমাদের কারখানাগুলোকে কমপ্লায়েন্স করতে হবে। এর জন্য সরকারের সহায়তা দরকার।
সিন্ডিকেটের কলকাঠি: মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন, কাঁচা চামড়ার বাজার কয়েকটি বড় গ্রুপ ও ট্যানারি মালিকের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। ঈদের সময় তারা জোট বেঁধে কম দামে চামড়া কিনে থাকে। ফলে গ্রামের মৌসুমি ব্যবসায়ী, মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলো প্রতিযোগিতামূলক বাজার পায় না। অনেক এলাকায় পাইকাররা ইচ্ছা করেই দেরিতে বাজারে আসে, যাতে চামড়া পচে যাওয়ার ভয় তৈরি হয় এবং কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন সংগ্রাহকরা। ঈদের সময় কয়েকটি বড় ট্যানারি নগদ অর্থ সংকটের অজুহাত দেখায়। ব্যাংক ঋণের জটিলতার কথা বলে। ফলে আড়তদাররা কম দামে চামড়া কিনতে বাধ্য হন।
আন্তর্জাতিক বাজারের চিত্র: ভারত, পাকিস্তান ও ভিয়েতনামে কাঁচা চামড়ার বাজার অন্যদের তুলনায় বেশি প্রতিযোগিতামূলক। সেখানে স্থানীয় প্রক্রিয়াজাত শিল্পের পাশাপাশি বহুমুখী রপ্তানি বাজার রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের চামড়া খাত দীর্ঘদিন ‘লো-ভ্যালু ট্র্যাপ’-এ আটকে আছে। অর্থাৎ কম দামের কাঁচামাল কিনে সীমিত মূল্য সংযোজন করে রপ্তানি করা হচ্ছে। এ ধারা চলতে থাকলে আগামীতে কোরবানির চামড়ার অর্থনীতি পুরোপুরি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, নতুন প্রজন্ম চামড়া সংগ্রহে আগ্রহ হারাচ্ছে। মাদ্রাসাগুলোও নির্ভরতা কমাচ্ছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজার এখন দ্রুত পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স, স্বচ্ছতা ও টেকসই উৎপাদনের দিকে যাচ্ছে। বাংলাদেশ সেই দৌড়ে পিছিয়ে আছে।






