চিফ প্রসিকিউটর
গুমের শিকার ২৫০ জনের বেশি মানুষের সন্ধান মেলেনি

আয়নাঘর পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম
গুমের শিকার হওয়া ২৫০ জনের বেশি মানুষের এখনো সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, গুমের শিকার অনেককে পরে মুক্তি দিয়ে মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে, আবার অনেকে নিহত বা এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
মানবতাবিরোধী অপরাধের চলমান বিচারকার্যের অংশ হিসেবে আজ শনিবার সকালে রাজধানীর উত্তরায় র্যাব-১ সদর দপ্তরে অবস্থিত গোপন বন্দিশালা ‘টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন সেল (টিএফআই সেল)’ পরিদর্শন করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর তিন বিচারক, প্রসিকিউশন টিম ও ডিফেন্স ল’ ইয়ারদের একটি দল।
পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেছেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।
ব্রিফিংকালে তিনি বলেছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিধিমালা ও রোম স্ট্যাটিউটের সংশ্লিষ্ট বিধানের আওতায় এ বিচারিক পরিদর্শন (জুডিশিয়াল ভিজিট) পরিচালিত হয়েছে। বিচারকরা যাতে কেবল সাক্ষ্য-প্রমাণ বা নথির ওপর নির্ভর না করে ঘটনাস্থল সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করতে পারেন, সে উদ্দেশ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিচারকদের পর্যবেক্ষণ একটি বিচারিক স্মারক (মেমোরেন্ডাম) আকারে মামলার নথির অংশ হবে এবং বিচারকার্যে তা বিবেচনায় নেওয়া হবে।
চিফ প্রসিকিউটরের দাবি, পরিদর্শনে ছোট-বড় মোট ২৯টি কক্ষ পাওয়া গেছে, যেখানে ভুক্তভোগীদের দীর্ঘদিন ধরে অমানবিক পরিবেশে হাত-পা ও চোখ বেঁধে আটকে রেখে নির্যাতন করা হতো।
‘প্রাথমিক তদন্তে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদকেও একসময় ওই বন্দিশালায় আটক রাখা হয়েছিল বলে তথ্য পাওয়া গেছে। একই ধরনের আরেকটি গোপন বন্দিশালা, যা ঢাকার সেনানিবাসে ডিজিএফআইয়ের একটি স্থাপনায় রয়েছে বলে ট্রাইব্যুনালের তদন্তে উঠে এসেছে, সেটিও আগামী শনিবার পরিদর্শনে যাবেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারকগণ’, যোগ করেন তিনি।
মো. আমিনুল ইসলাম বললেন, এ ধরনের গোপন আটকাদেশ সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদ এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৬১ ও ১৬৭ ধারার পরিপন্থী, যেখানে গ্রেপ্তারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ব্যক্তিকে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তার দাবি, অবৈধ আটক, গুম ও হত্যার এসব অভিযোগ মানবতাবিরোধী অপরাধের আওতায় পড়ে এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখেই এ বিচারকার্য পরিচালনার চেষ্টা করছেন তারা।
তিনি জানালেন, অনেকে হয়তো এই ‘আয়নাঘর’ বিষয়টিকে রূপকথার গল্প হিসেবে মনে করতে পারেন। কিন্তু এটি কোনো রূপকথার গল্প নয়, এটিই চরম বাস্তবতা ছিল; তৎকালীন সরকার এবং রাষ্ট্র যে একটি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র ছিল এবং যারা এই রাষ্ট্রটিকে পরিচালনা করেছিলেন তারা যে কতটা ফ্যাসিস্ট ছিলেন, এই আয়নাঘরের মধ্য দিয়েই তাদের চরিত্র আজ উন্মোচিত হয়েছে।
অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার এ বি এম হামিদুল মিসবাহ প্রসিকিউশনের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। তিনি বলেছেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কোনো গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে আদালতে হাজির করতে ব্যর্থ হওয়ামাত্রই মানবতাবিরোধী অপরাধ হয়ে যায় না; বিষয়টি আগে প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিচারযোগ্য।
তার মতে, ‘আন্ডার নো সারকামস্ট্যান্সেস, ইট উইল বি আ ক্রাইম এগেইনস্ট হিউম্যানিটি। এটা আমাদের খুব পরিষ্কারভাবে মনে রাখতে হবে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যদি কাউকে চালান দিতে ব্যর্থ হয় কোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য- সেটা র্যাব হোক, সেটা অন্য বাহিনীর সদস্য হোক- সেটা ডিপার্টমেন্টাল প্রসিডিং হবে। আগে সেখানে বিচার করে তারপরেই দেখতে হবে যে এটা আদৌ আইসিটিতে পড়ে কি না, এটা একটা বড় প্রশ্ন আপনাদের সামনে রেখে যাচ্ছি।’
তিনি দাবি করেন, পরিদর্শনে দেখা বাস্তব চিত্রের সঙ্গে প্রসিকিউশনের উপস্থাপিত বর্ণনার মিল পাওয়া যায়নি এবং এ পরিদর্শন আসামিপক্ষকে তাদের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতে সহায়তা করবে।
পরিদর্শনের সময় আরও উপস্থিত ছিলেন মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন, গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলামকে তুলি, ডিফেন্স ল’ ইয়ার মো. তবারক হোসেন ভূঁইয়া প্রমুখ।








