পুশইন অস্থিরতায় সীমান্ত সম্মেলন

বিএসএফ ঠেলে পাঠানোর পর বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের জিরো লাইনে ১২ বছরের রোজিনা। গতকাল ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার মশালগাঁওয়ে। ছবি: আগামীর সময়
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই বাংলাদেশের সীমান্তে উত্তেজনা বেড়ে গেছে। বিএসএফের পুশইন প্রচেষ্টায় এই মুহূর্তে ১৩ জেলার সীমান্তে তৈরি হয়েছে একধরনের উদ্বেগ। বিজিবির তথ্যমতে, গত সপ্তাহে কমপক্ষে ৩০০ জনকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী। এমন পরিস্থিতি নিরসনে আজ থেকে শুরু হচ্ছে দুদেশের সীমান্ত সম্মেলন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘আমরা পুশইন হতে দেব না। পুশইন ঠেকাতে কূটনৈতিক চ্যানেলে চলছে আলোচনা।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের পশ্চিম, উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত দিয়ে পুশইনের চেষ্টা চলছে। এর মধ্যে রয়েছে যশোরের গোগা ও রুদ্রপুর, ঝিনাইদহের যাদবপুর-মহেশপুর, ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর, জয়পুরহাটের কয়া এবং বাসুদেবপুর, নওগাঁর করমুডাঙ্গা, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ, সিলেটের উৎমাছড়া, নেত্রকোনার কচুগড়া, মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার বাগিছড়া ও চম্পাছড়া, হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের রেমা, লালমনিরহাটের পাটগ্রামের বুড়িমারী, নীলফামারীর তিস্তা, বড়বাড়ী প্রধানপাড়া এবং পঞ্চগড়ের রওশনপুর সীমান্ত এলাকা।
বিজিবির তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ৭ মে থেকে চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত বিএসএফ ২ হাজার ৩৪৪ জনকে বাংলাদেশে পুশইন করেছিল। এরপর গত ৭ মে পর্যন্ত কোনো পুশইনের ঘটনা ঘটেনি। তবে ৮ মে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার মুরইছড়া সীমান্ত দিয়ে নারী, শিশুসহ ১০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠায় বিএসএফ। এরপর থেকে একের পর এক পুশইনের চেষ্টা চলছে।
বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, সীমান্ত দিয়ে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বিদ্যমান আইন এবং দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার পরিপন্থী যেকোনো পুশইন চেষ্টা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে।
তিনি বলেছেন, ‘পুশইন করার শঙ্কা রয়েছে— এমন ৭০টি স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় বিজিবির গোয়েন্দা নজরদারি ও অতিরিক্ত বিজিবির সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এ ছাড়া জনসাধারণকেও সচেতন করা হচ্ছে। পুশইন ঠেকাতে বিজিবির সঙ্গে সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষও জড়িত আছেন।’
আজ থেকে শুরু হচ্ছে সীমান্ত সম্মেলন: সীমান্তে এমন পরিস্থিতির মধ্যে আজ থেকে ভারতের নয়াদিল্লিতে শুরু হচ্ছে চার দিনব্যাপী (৮ থেকে ১১ জুন) বিজিবি ও বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলন। এ সম্মেলনে বাংলাদেশের ১৫ সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী। এ ছাড়া আরও থাকবেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, ভূমি জরিপ অধিদপ্তর ও যৌথ নদী কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। অন্যদিকে বিএসএফ মহাপরিচালকের নেতৃত্বে ভারতীয় প্রতিনিধিদলে থাকবেন ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের একজন সদস্য আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘এই সম্মেলনে পুশইনের অপচেষ্টা, নো ম্যানস ল্যান্ডে ভারতের অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ এবং সীমান্ত হত্যার বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এসব ঘটনার কড়া প্রতিবাদ জানানো হবে।’
গতকাল রবিবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলনে অবৈধ পুশইন, সীমান্ত হত্যা এবং সামগ্রিক সীমান্ত নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।’
পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ: সীমান্তে এমন পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক এক কর্মকর্তা আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘ভারত প্রতিবেশী হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দেশ, কিন্তু এ ধরনের একতরফা পুশইন চেষ্টা কোনোভাবেই বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের মধ্যে পড়ে না। পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় যে মানসিক পরিবর্তন এসেছে, তার একটি প্রভাব এখানে দেখা যাচ্ছে। সীমান্তের এ সংকট দূর করতে দুদেশের সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা প্রয়োজন।’
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন মনে করেন, ‘সীমান্তে উত্তেজনা কোনো স্থায়ী সমাধান বয়ে আনবে না। বাংলাদেশকে কোনো উসকানিতে পা দেওয়া যাবে না। তবে বিএসএফ যদি নিয়মিতভাবে এভাবে লোক ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বিষয়টি উত্থাপন করা প্রয়োজন। মানবিক অধিকার ক্ষুণ্ন করে, পরিচয় নিশ্চিত না করে কাউকে অন্য দেশে ঠেলে দেওয়া যায় না।’
শূন্যরেখায় বাড়ছে মানুষ: ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার মশালগাঁওয়ে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের শূন্যরেখায় অপেক্ষমাণ রয়েছেন অন্তত ১১ জন। যাদের মধ্যে পুরুষের পাশাপাশি রয়েছেন নারী ও শিশুও। প্রখর রোদ, রাতভর বৃষ্টি আর অনিশ্চয়তা মাথায় নিয়ে তাদের বসে থাকতে হচ্ছে।
দুই দেশের সীমান্তে এমন অপেক্ষমাণের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। বিএসএফ একদল মানুষকে পুশইন করার চেষ্টা করছে সীমান্তের বিভিন্ন এলাকা দিয়ে। আর তা প্রতিহতের কঠোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যরা— জানালেন দিনাজপুরের ৪২ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আব্দুল্লাহ আল মঈন হাসান। প্রায় একই অবস্থা ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্তেও। ৫৮ বিজিবির পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রফিকুল আলম বলেছেন, ‘মহেশপুর সীমান্তের ১২টি বিওপির মধ্যে যাদবপুর, খোসালপুর ও সামন্তা এলাকায় অন্তত পাঁচটি পুশইন চেষ্টার ঘটনা ঘটছে। এ উপজেলার মোট ৭০ কিলোমিটার সীমান্তের মধ্যে ১০ কিলোমিটারে কাঁটাতার নেই। পুশইন ঠেকাতে বিজিবির পাশাপাশি আনসার সদস্য ও গ্রামবাসীও পাহারা দিচ্ছেন।’
শনিবার মেহেরপুরের গাংনী সীমান্ত দিয়ে ছয়জনকে পুশইনের চেষ্টা হয়েছিল। বিজিবি তাদের রুখে দিলেও ওই ব্যক্তিরা এখন অবস্থান করছেন শূন্যরেখায়। তাদের বিষয়ে পতাকা বৈঠক হলেও তাতে আসেনি কোনো সিদ্ধান্ত।
প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট জেলা প্রতিনিধিরা




