বেদনার রঙে লেখা চিরকুটে হেরে যাওয়ার গল্প
- এমপি গাজী নজরুল ৪ দিনের রিমান্ডে প্রথম স্ত্রী এক দিন

এমপি গাজী নজরুল
‘আমি হেরেছি, তুমি জিতেছো। কারণ, আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম বলেই তো ঠকিয়ে জিততে পেরেছো। আমি ধ্বংসের শেষ প্রান্তেও মুখে হাসি রেখেছি। দেখে নাও, এই হাসির কারণই হবে তোমার ধ্বংসের কারণ’— এভাবেই জাতীয় সংসদের প্যাডে লেখা একাধিক চিরকুট। একেকটি চিরকুট যেন একেকটি দরজা। খুললেই সামনে আসে ভালোবাসা, অভিমান, বিশ্বাসভঙ্গ আর গভীর বেদনার চিত্রপট। কোথাও নিজেকে তুলে ধরা হয়েছে যুদ্ধে নামা এক মানুষ হিসেবে, কোথাও আবার অন্যের হাতে চালিত দাবার ঘুঁটি। শেষে লেখাগুলোতে ফিরে এসেছে আত্মসম্মানের প্রশ্ন— ‘ততটা সস্তা আমি নই।’
একটিতে লেখা, ‘আমি অতি বিশ্বাস করে যুদ্ধে নেমেছিলাম তার সঙ্গে, কিন্তু জিততে পারিনি, হেরে গেলাম ময়দানে। জিতবইবা কেমনে, যুদ্ধের শেষ প্রান্তে এসে দেখি তুমিই তো ছিলে পক্ষ দলের সেনাপতি।’ সাতক্ষীরা-৪ আসনের বিতর্কিত সংসদ সদস্য (এমপি) গাজী নজরুল ইসলামের ঢাকার সরকারি বাসা (ন্যাম ভবন) থেকে উদ্ধার হওয়া হাতে লেখা কয়েকটি চিঠি ও চিরকুটে রয়েছে এমনই আবেগঘন বক্তব্যের উল্লেখ। জাতীয় সংসদের অফিসিয়াল প্যাড, সাদা কাগজ এবং লাল-কালো কালিতে লেখা এসব পাতায় সম্পর্কের টানাপড়েন, বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ ও মানসিক যন্ত্রণার কথা উঠে এসেছে। গাজী নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের পর সেখান থেকে এসব চিঠি ও চিরকুট উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় করা মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এমপি নজরুল ইসলামের চার ও তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলামের এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল সোমবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এহসানুল ইসলাম শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। এদিন দুজনকে আদালতে হাজির করা হয়। এরপর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শেরেবাংলা নগর থানার এসআই শামসুজ্জোহা সরকার তাদের পাঁচ কারণে জিজ্ঞাসাবাদে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন।
এদিকে নজরুলের এমপি পদের বিষয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সংসদের চিঠির অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন ইসি সচিব আখতার আহমেদ। গতকাল গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেছেন, এ বিষয়ে এখনো সংসদ থেকে কোনো চিঠি আসেনি। চিঠি এলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নজরুল ইসলাম ও মাকসুদা ইসলামের রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, মরিয়ম ফাঁস লাগিয়ে মৃত্যুবরণ করার সময় একই বাসায় আসামিরা কী করছিলেন এবং আত্মহত্যায় তাদের প্রভাব আছে কি না, তা উদঘাটন; আত্মহত্যায় প্ররোচনা, উসকানি, মানসিক চাপ, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা অন্য কোনোভাবে আত্মহত্যায় সহায়তা করার বিষয়ে আসামিদের ভূমিকা উদঘাটন; মরিয়মের আত্মহত্যায় পলাতক আসামি ওবায়দুর রহমানের ভূমিকা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ এবং পলাতক আসামির অবস্থান শনাক্তসহ গ্রেপ্তার; মরিয়মের আত্মহত্যায় অজ্ঞাতপরিচয় আসামি জড়িত আছে কি না, তা শনাক্তসহ গ্রেপ্তার এবং মামলার মূল রহস্য উদঘাটনে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন। পরে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। শুনানিতে তিনি বলছিলেন, ‘গাজী নজরুল গরিব মানুষের মেয়েকে নিয়ে যে খেলা করেছেন, তার পরিণতি মরিয়মের মৃত্যু। এ ঘটনায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা হয়েছে। হত্যার বিষয় উড়িয়ে দিতে পারি না। সবকিছুতে পূর্বপরিকল্পনা ছিল। আমরা শুনে এসেছি, জামায়াতে ইসলামীর লোক সৎ। এখন সৎ লোকের শাসন দেখছি। তাদের রিমান্ডের প্রার্থনা করছি।’
অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী মাহবুবুর রহমান রিমান্ড বাতিল চেয়ে শুনানিতে বলেছেন, ‘রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার কোনো উপাদান নেই। যে চিরকুট পাওয়া গেছে, তাতে প্রমাণ করে না গাজী নজরুল আত্মহত্যা প্ররোচনায় জড়িত। তবে এ মামলার ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও রাজনৈতিক হয়রানির বিষয় রয়েছে।’
শুনানি শেষে আদালত গাজী নজরুলের চার ও তার স্ত্রী মাকসুদার এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। শুনানি চলাকালে তারা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকলেও কোনো কথা বলেননি। শুনানি শেষে এক সাংবাদিক জিজ্ঞাসা করলে জবাবে গাজী নজরুল বলেছেন, ‘আমাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা। ঘটনার সময় বাসায় ছিলাম না। সে (মরিয়ম) নিজে আত্মহত্যা করেছে।’ পরে পুলিশ পাহারায় তাদের কাঠগড়া থেকে আদালতের হাজতখানায় নেওয়া হয়।
ঘটনাস্থলে তদন্ত করা সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিটের এক কর্মকর্তা জানালেন, তারা কয়েকটি চিরকুট পেয়েছেন। মরিয়ম যে কক্ষে থাকতেন, তা পরিপাটি অবস্থায়ই ছিল। তার শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। কিছু আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। সেগুলো তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
রিমান্ডে এনে দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরুর তথ্য জানিয়েছেন শেরেবাংলা নগর থানার ওসি মনিরুল ইসলাম।
প্রকৃত দোষী যেন শাস্তি পায় দাবি মৃতের বাবার: গতকাল সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গে মেয়ে মরিয়মের মরদেহের অপেক্ষায় বসেছিলেন মাসুম বিল্লাহ ও তার স্ত্রী। এ সময় মাসুম বিল্লাহ সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আমি তো চাই সঠিক তদন্ত, আমি যেন ন্যায়বিচারটা পাই; প্রকৃত দোষী যেন শাস্তি পায়।’
মেয়ের মৃত্যুর জন্য নিজের শ্যালক ওবায়দুর রহমানকে দায়ী করে মাসুম বিল্লাহ বললেন, “মরিয়ম বলত যে, ‘আমি বাইরে মুখ দেখাব কীভাবে। সে আমার মামা, আমার এত বড় ক্ষতি করবে আমি বুঝতে পারিনি। আমাকে মাফ করে দেন, আমি বাপের থেকে তাকে বেশি বিশ্বাস করতাম। বিশ্বাস করে আজকে আমি ওই পরিণতি ভোগ করতেছি’।”
নজরুলের বিচারের দাবিতে উত্তাল শ্যামনগর: মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত ও গাজী নজরুলের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে সাতক্ষীরার শ্যামনগরে বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। শ্যামনগর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ‘শ্যামনগর উপজেলা সচেতন নাগরিক সমাজ’-এর ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। মিছিলটি শ্যামনগর পৌরসদরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। বিক্ষোভের সময় নজরুলের কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়।
গত রবিবার শেরেবাংলা নগরে ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের তৃতীয়তলার ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা করেন। এতে গাজী নজরুল ইসলাম, তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলাম এবং বাদীর শ্যালক ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়।
মামলার বিবরণে বলা হয়েছে, আসামি ওবায়দুর রহমানের প্রত্যক্ষ প্ররোচনায় গাজী নজরুলের সঙ্গে মরিয়মের বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী মরিয়মকে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন বলে বিভিন্ন সময় মোবাইল ফোনে তার পরিবারকে জানান। এর ধারাবাহিকতায় ২০ সেপ্টেম্বর বিকাল অনুমান সাড়ে ৫টায় গাজী নজরুল মরিয়মের বাবাকে মোবাইল ফোনে কল করে দ্রুত তাদের বাসায় যেতে বলেন। বাসায় এসে দেখতে পান অনেক লোকজন সেখানে উপস্থিত। তখন তিনি জানতে পারেন বাসার ভেতরের রুমে মরিয়ম ওড়না দিয়ে ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলে রয়েছে। আসামিদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে এবং আসামিদের প্ররোচনায় তার মেয়ে মরিয়ম আত্মহত্যা করেছেন।



