পরীক্ষা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
‘পাকা দুই ক্রোশ পথ হাঁটিয়া স্কুলে বিদ্যা অর্জন করিতে যাই।’ শরৎচন্দ্রের বিলাসী গল্পের মতো কেউ আর দুই ক্রোশ তথা চার মাইল পথ হেঁটে স্কুলে যায় না এখন। গ্রামে গ্রামে এখন স্কুল— সরকারি, বেসরকারি, বাংলা, ইংরেজি, আরবি। কোনো কোনো জায়গায় ভাষা শেখারও স্কুল আছে— ফ্রেঞ্চ, জাপানি, জার্মানি, ইংরেজি। বিদ্যা অর্জনের জন্য প্রয়োজনে চীন দেশে যেতে বলা হয়েছে। আমরা এখন সারা পৃথিবীতে যাই— ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, কানাডা। কিন্তু যারা যাই, তারা আর ফিরে আসি না। আমাদের দেশের ধানের চালের ভাত খেয়ে, মুরগির ডিম খেয়ে, গরুর দুধ খেয়ে, ক্ষেতের লাউ-বেগুন-আলু-পটোল খেয়ে, লকলকে পুঁই পালং আর হেলেঞ্চা শাক খেয়ে শরীর বাড়াই, মাথা বড় করি, মগজ প্রসারিত হয়, বিকাশ ঘটে বুদ্ধি আর বিদ্যার, তারপর একদিন টুক করে দেশ ছাড়ি উচ্চশিক্ষার অসিলায়। শিক্ষা শেষ হয়, কিন্তু আর ফিরে আসা হয় না, ফিরে আসি না। মেধা আর শ্রমের সবটুকু অন্য দেশে ঢালি।
ব্রিটিশদের দুইশ বছরের দাসত্ব করার মেরুদণ্ডটা যে আমাদের আজও রয়ে গেছে— পর দেশের লাগি জীবন পার।
০২
জিপিএ ৫ পেয়ে আমার মেয়ে এসএসসি পাস করেছে। আমার স্ত্রী এক কলেজে পড়ায়। আর আমি অলস বসে থাকি বাসায়, টুকটাক লেখালেখি করি। কিন্তু গত তিন বছর যে ঝড় বয়ে গেছে আমাদের সংসারে— আমার মেয়ে সারা ঘর ছটফট করে, আমার বউয়ের রান্না মুখে দেওয়া যায় না, আমি না লিখে আরও অলস হয়ে যাই। সামনে এসএসসি পরীক্ষা, কিন্তু সিস্টেম পরিবর্তন হচ্ছে! উদ্ভট সেই সিস্টেম! সৃষ্টিশীলতার নামে যে অরাজকতা চলেছে, ঘুম হারাম হয়েছে মা-বাবার, সারা দেশের ছাত্রছাত্রীর।
শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনজন বুদ্ধিজীবীকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করেছি আমি, তারা কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। অবোধ পেন্ডুলামের মাথা নেড়েছেন তারা এদিক-ওদিক। তাদের মনে ক্ষোভ, অসন্তোষ; কিন্তু তারা কোনো প্রতিবাদ করেননি, একটা কলমও লেখেননি। শুধু গৃহপালিত পোষ্যর মতো জাবর কেটেছেন; পাছে প্লট, মাস শেষে মাসোয়ারা, বিদেশ যাওয়ার খয়রাতি খরচ মিস হয়ে যায় তাদের!
একটা জাতিকে ধ্বংস করার সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে তার শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করা, নষ্ট করা, যা আমরা এরই মধ্যে অনেকখানি করে ফেলেছি। অথচ নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছেন, ‘শিক্ষা হলো সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র, যা দিয়ে আপনি পুরো পৃথিবী বদলে দিতে পারবেন।’
০৩
সবচেয়ে লেটেস্ট গাড়িটা আমাদের দেশে আসতে কয়টা মাস দেরি হয়। নতুন ভার্সনের মোবাইল আসতে লাগে কয়েক সপ্তাহ। সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া প্রসাধনসামগ্রী আসে প্রতিদিনই, ব্যাগে-লাগেজে।
কুঁজোর চিত হয়ে শোয়ার মতো আমরা বিশাল টাকা খরচ করে স্যাটেলাইট পাঠিয়েছি মহাশূন্যে। পরের দেশেরটা দেখে লস প্রজেক্টের টানেল বানিয়েছি, গলায় ফাঁস এখন ওটা। সামান্য যুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা নেই কোনো প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে, তবু আমরা যুদ্ধবিমান কিনি মাঝেমধ্যেই। কিন্তু সারা পৃথিবীর অনেক দেশে চমৎকার কিছু শিক্ষাব্যবস্থা আছে, আমরা তা ধার করি না, তা অনুসরণ করি না, সম্ভবত তার কথা সংশ্লিষ্ট কেউ জানিই না আমরা!
না জানা কোনো দোষের নয়, কিন্তু কিছু না জেনে চেয়ারে বসা দোষনীয়, মহা অন্যায়।
০৪
বানরের তেলওয়ালা বাঁশ বাওয়া সেই অঙ্ক কি এখনো শেখানোর দরকার আছে আমাদের, এই এআইয়ের সময়ে? ধরা যাক শিখলাম, তারপর কোন কাজে আসে সেই অঙ্কটা? গরু একটি গৃহপালিত জন্তু, তার একটি লেজ আছে, দুটি শিং আর চারটি পা আছে। এই রচনা পড়ে পরবর্তীকালে আপনি কোথায় প্রয়োগ করবেন? আমাদের শুরুই হয়— অ-তে অজগর ওই আসছে তেড়ে, আ-তে আমটি আমি খাব পেড়ে। একটি শিশুমনে প্রথমেই অজগরের ভয় ঢোকানো! আর একটা শিশু বুঝি গাছ থেকে আম পাড়তে পারে!
মদনমোহন তর্কালংকার সাহেব আমাদের এত কিছু শেখালেন, ভুল প্রয়োগ হয়েছে তো প্রথম দুটি বাক্যেই।
০৫
পণ্ডিত নগেন মুনশী স্যারের কথা আমি অনেকবার বলেছি— সিরাজগঞ্জের জ্ঞানদায়িনী উচ্চ বিদ্যালয়ের বাংলা দ্বিতীয় পত্রের শিক্ষক ছিলেন তিনি। শুনেছি, ওনার আপত্তিতে ভুলে ভরা দুটি বাংলা ব্যাকরণ বই বাতিল করেছিল রাজশাহী বিভাগ।
সারা দেশে ইদানীং যে স্কুলশিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়, কারা নিয়োগ পান? গ্রামের স্কুলের অনেক স্কুলশিক্ষক বহুদিন স্কুলে আসেন না। কেউ হাজিরা খাতায় সই করে অন্য কাজে চলে যান। কারও কারও পড়ানোরই কোনো যোগ্যতা নেই। স্কুলে এসে চেয়ারে এসে শুধু ঘুমান।
শিক্ষকদের মান নিয়ে কথা উঠেছে অনেক দিন ধরে, উঠেছে এবারও। যে কর্মী সেলাই বা কাঁচি চালাতে পারে না, কোনো গার্মেন্টস মালিক তো প্রতিষ্ঠানে রাখবে না তাকে। তাহলে যে শিক্ষক পড়াতে পারেন না, কিন্তু মাসের পর মাস বেতন নিচ্ছেন, তাকে কেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাখছি আমরা? কেন আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভার ছেড়ে দিচ্ছি এই অযোগ্যদের হাতে?
০৬
মাহদী আমিন আমাদের প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা। তিনি একটা কথা বলেছেন। কথাটা পছন্দ হয়েছে। পছন্দ হওয়ার কারণ পুরো সত্য এবং আসল কথাটা বলেছেন তিনি— আগের বছরগুলোয় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কৃত্রিমভাবে জিপিএ ৫ ও পাসের হার বাড়িয়ে দেখানো হতো। কিন্তু কার বুদ্ধিতে, কাদের ষড়যন্ত্রে এই অন্যায় এবং বর্বরোচিত কাজটি করা হয়েছে, তা খুঁজে বের করা দরকার আমাদের। কিচ্ছু না, শুধু এই দেশ শত্রুদের কদর্য চেহারাটা দেখতে চাই আমরা একবার।
মাহদী আমিনকে একটি কথা— প্রতি বছর যত্রতত্র বিদেশে যান আমাদের কর্তাব্যক্তিরা। কী কী কারণে যান, আপনি জানেন। আপনি সারা দেশ থেকে মাত্র ১০ জন বিজ্ঞ মানুষকে বাছাই করুন। যে দেশে এই মুহূর্তে সেরা শিক্ষানীতি আছে, আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা আছে, সেই দেশে যান। তা নিয়ে আসুন আমাদের দেশে। আমাদের ছেলেমেয়েরা আক্ষরিক অর্থেই মেধাবী, তারা তা সহজে গ্রহণ করবে, দ্রুত শিখে নিতে পারবে। প্রকৃত যোগ্যতা, দক্ষতা ও সৃজনশীলতা তাদের অগাধ আছে।
আপনি নিশ্চয়ই জানেন, পৃথিবীর অন্তত এক ডজন দেশে আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রধান হয়ে আছে।
০৭
এই লেখার প্রথম পর্বটা আরও একবার মনে করুন প্লিজ। আর সবার মতো আমার মেয়েকেও বিদেশে পাঠাব সুযোগ পেলে। গত কয়েক যুগের জঞ্জালে অন্ধকার হয়ে গেছে চারপাশ। সুস্থ ও সুন্দরভাবে কাজ করার নেই কোনো পরিবেশ। ক্ষমতাসীন পোষ্যদের দাপট আর আস্ফালনে যোগ্যরা হারিয়ে গেছে ধীরে ধীরে। অযোগ্যরা গেড়ে বসে সাহসে, নির্লজ্জতায়। যোগ্যরা যোগ্য স্থান পেলেই ফিরে আসবে এ দেশে। শিক্ষামন্ত্রীর ভাষায়, নম্বর দেওয়ার কোনো দরকার হবে না তাদের, মন খুলে শুধু কাজ করার সুযোগ দেবেন। গান তারা নিজে নিজেই গাইবে!




