যদি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
১৯৯৩ সালের দিকে মিরপুরে আমার এক আত্মীয়ের বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলাম, গিয়ে দেখি দরজায় তালা ঝুলছে। কী করি? ভাবতে ভাবতেই পাশের বাসার একজনকে দেখলাম। জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, তারা সবাই গুলিস্তানে কেনাকাটার জন্য গেছেন। আমি তখন থাকতাম সেগুনবাগিচায়। হতাশ হয়ে ফিরে এলাম।
তখন নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের কেনাকাটার জন্য সবাই গুলিস্তানেই যেতেন। এখন যেমন রাজধানীর সব এলাকায় শপিং মল আছে, তখন এমনটা ছিল না। রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র গুলিস্তান— যেখানে প্রতিদিন হাজারো মানুষ প্রয়োজনের তাগিদে ছুটে আসতেন। কম দামে প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার আশায় অনেকের প্রথম পছন্দ ছিল এই এলাকা। তখনকার সেই কেনাকাটার অভিজ্ঞতা সব সময় আনন্দের ছিল না, বরং ছিল তিক্ততার।
কোনো দোকানের সামনে একটু দাঁড়ালেই শুরু হতো ডাকাডাকি। পণ্য ধরে দেখার পর কিনতে না চাইলে অনেককে হকারের বিরূপ আচরণের শিকার হতে হতো। পণ্য দেখে রেখে আসা ছিল বিপজ্জনক। না কিনলে কেউ কটূক্তি করতেন, অনেক সময় একাধিক হকার একসঙ্গে টানাটানি করে নিজের দোকানে নিতে চাইতেন, যা ছিল ক্রেতাদের জন্য বেশ অস্বস্তিকর। ক্রেতার সঙ্গে ভদ্র আচরণের বদলে এমন ব্যবহার পুরো কেনাকাটার আনন্দটাই নষ্ট করে দিত। আর দাম জানতে চাইলে তো কথাই নেই! দাম বলতেই হতো, কম বললেও বিপদ, না বললেও বিপদ। ক্রেতা যা বলতেন তাতেই দিয়ে দিত। মানে হকাররা অনেক বেশি দাম চাইতেন। এতে বেশি বিপদে পরতেন ঢাকার বাইরে থেকে আসা নতুন ক্রেতারা। তারা নাজেহাল না হয়ে ফিরতে পারতেন না গুলিস্তান থেকে।
তখন একা যেতাম না গুলিস্তানে। আমরা চার বন্ধু গেলাম একবার। এক হকারের কাছে একটি ব্যাগের দাম জানতে চাইলাম। বললেন, ‘ভাই, মাত্র ১২০০ টাকা। আমরা হেসে বললাম, ‘এত দাম? সঙ্গে সঙ্গে জানতে চাইলেন, ‘আচ্ছা, আপনি কত দেবেন?’ আমরা বললাম, ‘২০০ টাকা। তিনি নাটকীয় ভঙ্গিতে মাথায় হাত দিয়ে বললেন, ‘ভাই, আপনি ব্যাগ কিনতে আইছেন, নাকি আমার দোকান বন্ধ করতে?’ আশপাশের সবাই হেসে উঠল, আমরা চলে আসতে চাইলে ব্যাগটি ২০০ টাকায়ই দিতে চাইলেন। আমাদের দল ভারি হওয়ায় হাসতে হাসতে সেখান থেকে চলে এলাম। অবশ্য কটুকথা বলতে ছাড়েননি। আমরা পেছনে আর তাকাইনি।
তবু মানুষ যেত। সেখানকার বৈচিত্র্য আর তুলনামূলক কম দামে পণ্য পাওয়ার সুযোগ তখন অনেক এলাকায় ছিল না। এখানকার কোলাহল, মানুষের ভিড় আর দরকষাকষির দৃশ্য যেন ঢাকার ব্যস্ত জীবনের এক চিরচেনা প্রতিচ্ছবি ছিল ওই সময়।
আমি গুলিস্তানে গিয়েছিলাম সেদিন। আগের সেই কোলাহল নেই দোকানে দোকানে। নেই ক্রেতাদের টানাটানি। আগের মতো আকাশচুম্বী দামও হাঁকেন না তারা। অনেক দোকানে তো একদাম ছাড়া বিক্রিও করেন না। যা-আগের দম্ভ ও চিরচেনা ঐতিহ্যের সঙ্গে একেবারেই যায় না।




