মেসি কি ‘স্লো ফুটবলের’ পথিকৃৎ

এবার বিশ্বকাপে লিওনেল মেসি ৬৩ শতাংশ সময় মাঠের মধ্যে হেঁটে কাটিয়েছেন। এ সময় তার গতি ছিল ঘণ্টায় শূন্য থেকে ৭ কিলোমিটার। ম্যাচের এক-চতুর্থাংশ সময় তিনি একেবারে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এ পরিসংখ্যান তুলে ধরে দুদিন আগে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ পত্রিকা ‘দ্য টেলিগ্রাফ’। প্রতিবেদনটি যে ধাঁধার জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেছে, তা হলো, মাঠ জুড়ে অলস হেঁটে বেড়ানো ৩৯ বছর বয়স্ক এই খেলোয়াড় কী করে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে হিংস্র, গোলক্ষুধার্ত খেলোয়াড় হয়ে ওঠেন আর কী করেইবা প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের কাছে তিনি এক বিভীষিকা হয়ে দাঁড়ান। রহস্যটি কী?
সাদা চোখে মেসির হাঁটা একধরনের অলসতা; কিন্তু গভীর পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, মেসি আসলে ম্যাপিং করছেন। হাঁটতে হাঁটতে তিনি মাঠটিকে ‘পাঠ করেন’, যেভাবে জাহাজের কাপ্তান তার মানচিত্র খুঁটিয়ে দেখেন, বা একজন দাবাড়ু হিসাব কষেন ঘুঁটিগুলোর পজিশন এবং সম্ভাব্য চাল। মেসি খেলোয়াড়দের অবস্থান, ফাঁকা জায়গা, প্রতিপক্ষের দুর্বলতা এবং সম্ভাব্য আক্রমণের পথ নিয়ে হিসাব কষতে থাকেন তার মাথায়। তার পা স্থির থাকলেও তার মগজ তখন তুমুল ব্যস্ত।
২০২২ সালের বিশ্বকাপের সময়ও মার্কিন ম্যাগাজিন ‘দ্য নিউ ইয়র্কার’ মেসিকে নিয়ে একই রকম রিপোর্ট করেছিল, যার শিরোনাম ছিল ‘দ্য জিনিয়াস অব লিওনেল মেসি জাস্ট ওয়াকিং অ্যারাউন্ড’।
এবার দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদকের অ্যাসাইনমেন্ট ছিল মেসির হাঁটা পর্যবেক্ষণ করা। রিপোর্টার স্টপওয়াচ নিয়ে বসেছেন এবং ঘড়ি ধরে মেপেছেন। অবাক করা সব পরিসংখ্যান পেয়েছেন তিনি।
পত্রিকাটির পর্যবেক্ষণ বলছে, মেসির এই ধীরলয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পুরো আর্জেন্টাইন টিমটাই তাদের সুর বদলে নিয়েছে। এ কারণে আর্জেন্টাইন টিমের খেলার সার্বিক গতি অন্য দলগুলোর চেয়ে কম মনে হয়। আমি জানি না, হ্রস্বগতির এই সুর শুধু আর্জেন্টিনা দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে কি না। হয়তো মেসির এই হণ্টন পরোক্ষভাবে পুরো ফুটবল খেলাটির সার্বিক ধরনটিকেই বদলে দিতে শুরু করবে। হয়তো মেসির হাত ধরে ‘স্লো ফুটবল’ নামে একটি নতুন ধারা তৈরি হতে পারে, যেখানে ফুটবল গতির পাশাপাশি মগজের খেলায় পরিণত হবে।
আমি এখানে ‘স্লো ফুটবল’ শব্দটি প্রয়োগ করলাম এ যুগে আরও বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে ‘স্লো’ মুভমেন্ট শুরু হয়েছে, তার সঙ্গে মিল রেখে। যদিও আমি জানি ‘স্লো ফুড’ বা ‘স্লো মিউজিক’ বা ‘স্লো জার্নালিজমের’ মতো প্রতিষ্ঠিত কোনো আন্তর্জাতিক আন্দোলন ফুটবলে শুরু হওয়া ততটা সহজ হবে না। কিন্তু একটি ধারণাগত রূপক হিসেবে কথাটা তোলা যেতে পারে। ‘স্লো’ মানে এক্ষেত্রে ‘ধীর’ নয়। এটি একটি অ্যাটিটিউট। একটি জীবনদর্শন। কী রকম?
স্লো ফুড আন্দোলন চালু হয়েছিল ‘ফাস্ট ফুড’ সংস্কৃতির বিপরীতে; কিন্তু সেটি আসলে রান্নার গতির ব্যাপার নয়। এক্ষেত্রে খাদ্যের স্থানীয়তা, ফুড প্রসেসিং এবং খাদ্য গ্রহণের অভিজ্ঞতার ওপর জোর দেওয়া হয়। সেরকম স্লো জার্নালিজম চালু হয়েছে ব্রেকিং নিউজের হুড়োহুড়ি প্রতিযোগিতার সংস্কৃতির বিপরীত স্রোতে দাঁড়িয়ে সংবাদের প্রেক্ষাপট, অনুসন্ধান এবং সংবাদ বিশ্লেষণকে গুরুত্ব দিয়ে। মেসির ফুটবলও তেমনি দ্রুততার যুগে ধীরতার একটি নন্দনতত্ত্ব তৈরি করতে পারে।
এটি না মেনে উপায় নেই যে আধুনিক ফুটবল ক্রমেই হয়ে উঠেছে গতি ও শারীরিক সক্ষমতার খেলা। অত্যধিক প্রেসিং, দ্রুত ট্রানজিশন, অজস্র স্প্রিন্ট মিলিয়ে খেলোয়াড়দের কাছ থেকে সারাক্ষণ দাবি করা হয় তীব্র গতি। কিন্তু মেসি দেখিয়েছেন, সবসময় ক্ষিপ্রতাই দক্ষতার চিহ্ন নয়। কখন থামতে হবে, কখন অপেক্ষা করতে হবে, কখন বিস্ফোরণের মতো গতি বাড়াতে হবে, তা মাথায় রাখা হলো শিল্প।
সংগীতে যেমন বিরতি একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, ফুটবলেও তেমনি থামার মূল্য আছে। মেসির হাঁটা হচ্ছে সেই বিরতি। মেসি জানেন, সারাক্ষণ ছুটতে থাকাই সব নয়; বরং সঠিক মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করাই কখনো কখনো সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।
এই দর্শনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ডাচ ফুটবল লেজেন্ড জোহান ক্রুইফের পজিশনাল ফুটবলের ধারণা। ক্রুইফ বিশ্বাস করতেন, ফুটবল মূলত জায়গার খেলা। মেসি সেই দর্শনকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছেন। তিনি শুধু বলের অবস্থান দেখেন না, তিনি দেখেন আগামী কয়েক সেকেন্ডে কোথায় জায়গা তৈরি হবে। অন্য খেলোয়াড় যেখানে বলের দিকে ছুটছেন, মেসি সেখানে ছুটছেন ভবিষ্যতের ফাঁকা জায়গার দিকে।
এ কারণেই মেসির হাঁটা আসলে শক্তি সঞ্চয়ের কৌশলও। পুরো ম্যাচে অকারণ দৌড় না দিয়ে তিনি নিজের শক্তি জমিয়ে রাখেন। যখন সময় আসে, তখন তার গতি হয়তো অন্যদের চেয়ে বেশি নয়; কিন্তু তার সিদ্ধান্তের গতি অন্যদের ধরাছোঁয়ার বাইরে। মেসির ফুটবল আমাদের সময়ের একটি বড় প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়: আমরা কি সবকিছুকে শুধু গতির মাপকাঠিতে বিচার করব? দ্রুত সংবাদ কি সবসময় ভালো সংবাদ? দ্রুত খাবার কি সবসময় ভালো খাবার? দ্রুত ফুটবল কি সবসময় বুদ্ধিমান ফুটবল?
মেসি দেখাচ্ছেন, গভীরতা অনেক সময় ধীরতার মধ্যে লুকিয়ে থাকে। মাঠে তার হাঁটা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দক্ষতা মানে শুধু বেশি করা নয়; কখন কম করতে হবে, সেটিও জানা।
ফুটবল একসময় ছিল শক্তির খেলা, পরে তা হয়ে উঠেছে গতির খেলা। লিওনেল মেসি তাকে পাল্টে ফেলছেন চিন্তার খেলায়। তিনি প্রমাণ করেছেন, সবচেয়ে ক্ষিপ্রগতির খেলোয়াড়টি মাঠের সবচেয়ে বিপজ্জনক খেলোয়াড় নাও হতে পারে। কখনো কখনো মাঠে সবচেয়ে শান্তভাবে হেঁটে বেড়ানো খেলোয়াড়টি ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেবে। কারণ সেই খেলোয়াড়টি জানে খেলার পরবর্তী মুহূর্তটি জন্ম নিতে যাচ্ছে কোন স্পেসে।




