ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই

ছবি : এআই
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে সঠিকভাবে বুঝতে হলে শুধু আজকের নিত্যপণ্যের বাজারদর, জ্বালানি তেলের মূল্য কিংবা সাময়িক মূল্যস্ফীতির দিকে তাকালে চলবে না। একটি অর্থনীতি যখন দীর্ঘ সময় ধরে দুর্বল রাজস্ব আহরণ, ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম, বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র চাপ, ঋণের দায় এবং বিনিয়োগের স্থবিরতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে, তখন নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রাতারাতি সেই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব হয় না।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের পেছনে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত দুর্বলতার পাশাপাশি সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার গভীর প্রভাব রয়েছে। ২০২৪ সালের অর্থনৈতিক শ্বেতপত্রে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সময়কালে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার অবৈধ আর্থিক বহিঃপ্রবাহের একটি অনুমান তুলে ধরা হয়েছিল। এই অর্থ পাচার দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজার, সরকারের বিনিয়োগ সক্ষমতা ও আর্থিক ব্যবস্থার ওপর গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করেছে।
একই সময়ে সরকারি ঋণ ও ঋণসেবার ক্রমবর্ধমান দায় রাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থাপনার জন্য বড় এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইএমএফের ২০২৬ সালের মূল্যায়নেও বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে দুর্বল রাজস্ব আহরণ, ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে।
এই জটিল পরিস্থিতিতে বর্তমান সরকারের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, একদিকে পূর্ববর্তী সময়ের জমে থাকা পর্বতসম আর্থিক দায় ও কাঠামোগত সমস্যা সামলানো, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রেখে অর্থনীতিতে নতুন গতি সৃষ্টি করা। এটি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত কঠিন এক ভারসাম্যের কাজ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি; বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে তীব্র অস্থিরতা তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ যেহেতু জ্বালানি আমদানিনির্ভর একটি দেশ, তাই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য বৃদ্ধি সরাসরি অভ্যন্তরীণ পরিবহন ব্যয়, কৃষি উৎপাদন, শিল্পের উৎপাদন খরচ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পেছনে আন্তর্জাতিক বাজার, বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণ এবং জ্বালানি খাতে ভর্তুকির চাপের কথা সরকার তুলে ধরেছে। তাই তেলের মূল্যবৃদ্ধিকে কেবল একটি বিচ্ছিন্ন সরকারি সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে পুরো অর্থনৈতিক চিত্রটি বোঝা যাবে না। তবে এটাও সত্য যে মূল্যবৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষ, প্রান্তিক কৃষক, পরিবহন খাত ও শিল্প উদ্যোক্তারা চরম বাস্তব চাপের মুখে পড়ছেন। ফলে সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দেওয়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির অভিঘাত কমাতে কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা বলয় ও উৎপাদনমুখী নীতি নিশ্চিত করা।
ঠিক এই জায়গাতেই ফ্যামিলি কার্ড এবং ফার্মার কার্ডের মতো কল্যাণমুখী উদ্যোগগুলোর অপরিহার্য গুরুত্ব তৈরি হয়। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির মূল ধারণা হলো পরিবারকে সামাজিক সুরক্ষার একটি কেন্দ্রীয় একক হিসেবে বিবেচনা করা। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এর প্রাথমিক পর্যায়ে নির্দিষ্ট নির্বাচিত পরিবারগুলোকে কার্ডের আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। একইভাবে ফার্মার কার্ডের লক্ষ্য হলো কৃষকদের সরকারি সেবা সরাসরি পৌঁছে দেওয়া এবং মধ্যস্বত্বভোগীর ভূমিকা কমিয়ে আনা।
তবে এসব কর্মসূচির সাফল্য শুধু নীতিগত ঘোষণার মাধ্যমে নিশ্চিত হবে না। সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন, আধুনিক ও নির্ভুল ডিজিটাল ডেটাবেজ, স্বচ্ছ বিতরণ ব্যবস্থা, নিয়মিত মূল্যায়ন এবং সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত বাস্তবায়নই নির্ধারণ করবে এসব উদ্যোগ বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে। এ জায়গায় সরকারকে যেমন কঠোর প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকেও সার্বিক প্রক্রিয়ার ওপর গঠনমূলক সমালোচনা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
বর্তমান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো সরকারের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের সমালোচনা করবে, এটাই স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিত প্রক্রিয়া। কিন্তু অর্থনৈতিক নীতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিতর্ক যেন কেবল ‘সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ’ অথবা ‘সরকার সফল’ এই দুই মেরুর সরল স্লোগানে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো সিদ্ধান্তের ফলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের কী ধরনের ব্যয় হচ্ছে, কোন খাতে অর্থ সাশ্রয় হচ্ছে, সাধারণ মানুষের ওপর কতটা চাপ পড়ছে, সামাজিক সুরক্ষায় কতজন প্রান্তিক মানুষ উপকৃত হচ্ছে এবং অর্থনীতির কোনো সুনির্দিষ্ট সূচকে উন্নতি হচ্ছে এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।
এখানে স্বাধীন গণমাধ্যম, বিশ্ববিদ্যালয়, পেশাদার অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও সুশীল সমাজের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। তাদের কাজ সরকারের অন্ধ প্রশংসা করা কিংবা কেবল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সমালোচনা করা, কোনোটিই নয়; বরং সরকারের নীতির বাস্তব প্রভাব জনগণের সামনে বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের ভিত্তিতে তুলে ধরা। যে উদ্যোগ কার্যকর, সেটির প্রশংসা যেমন করা প্রয়োজন, তেমনি যে জায়গায় ব্যর্থতা বা দুর্বলতা রয়েছে, সেটিও স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা প্রয়োজন।
কারণ একটি সংকটাপন্ন অর্থনীতি পুনর্গঠন কেবল সরকারের একার দায়িত্ব হতে পারে না। রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী সমাজ, কৃষক, শ্রমিক, গবেষক, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ সব পক্ষের দায়িত্বশীল ও পরিপক্ব ভূমিকা এখানে অপরিসীম। একই সঙ্গে অতীতের আর্থিক অনিয়মের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, অবৈধ অর্থপাচার রোধ, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করার মতো দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার প্রক্রিয়াও সাহসের সাথে এগিয়ে নিতে হবে।
আইএমএফ ও বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, আর্থিক খাতের সংস্কার, সুশাসন ও অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানোর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে বাস্তবতাকে স্বীকার করা। অতীতের ভুলের দায় নির্ধারণ যেমন জরুরি, তেমনি বর্তমানের কার্যকর উদ্যোগগুলোকে সফল করার সুযোগ দেওয়াও সমভাবে জরুরি। দায়িত্বশীল সমালোচনা সরকারকে সংশোধন হওয়ার সুযোগ দেয়, আর কার্যকর উদ্যোগের স্বীকৃতি জনগণের আস্থা ধরে রাখতে সাহায্য করে। এই দুইয়ের পারস্পরিক ভারসাম্যই হতে পারে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ।
লেখক : উপাচার্য, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]



