অতএব

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
২০০০ সাল। তরুণ বয়স। না চাইতেই একটা চাকরি পেয়ে গেলাম। আর চাকরির প্রথম বেতন পেয়েই করে বসলাম দুঃসাহসিক এক কাণ্ড।
কাণ্ড মানে মহাকাণ্ড। হঠাৎ করেই একটা মোবাইল ফোন কিনে ফেললাম। আমার স্বপ্ন ছিল মোবাইল হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়াব। একটু ভাব দেখাব। লোকজন আমাকে বড়লোক ভাববে। তখন যাদের মোবাইল ছিল, বেশিরভাগই হাতে নিয়ে ঘুরত। হাতে নিয়ে ঘোরাটাও ছিল বিরাট স্ট্যাটাসের ব্যাপার। অভিজাত ফ্যাশনের অংশ।
তবে ব্যাপারটা আমার জন্য সহজ হলো না। আমি ছিলাম মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান।
আমার বয়সী একটা ছেলের হাতে মোবাইল মানে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাই বাসায় মোবাইল কেনার কথা গোপন রাখতে হলো। রুমের দরজা বন্ধ করে লুকিয়ে লুকিয়ে চার্জ দিতাম। পরিচিত যাদের মোবাইল আছে, তাদের মিসড কল দিতাম। একেকটা মিসড কল দিতে কী যে আনন্দ হতো! কেউ কল ব্যাক করলে জীবনটা ধন্য হয়ে যেত।
আনন্দ বেশি দিন টিকল না। একদিন আব্বার কাছে হাতেনাতে ধরা পড়ে গেলাম। বসানো হলো পারিবারিক আদালত। বিচার হলো। বড়রা সবাই আমাকে এমনভাবে বকাঝকা করলেন, যেন মোবাইল কিনিনি, গোপনে বিয়ে করে ফেলেছি। আমি যে জীবনে কিছু করতে পারব না, সে ব্যাপারে সবার মতামত এক হয়ে গেল। শাস্তি হিসেবে মোবাইল ফোনটাও কেড়ে নেওয়া হলো।
কিন্তু সপ্তাহখানেক যেতেই পরিস্থিতি পুরোপুরি পাল্টে গেল। আব্বা আমার মোবাইলের গুণে মুগ্ধ হয়ে নিজেই আরেকটা কিনে ফেললেন। মোবাইল ফোন যে খুব দরকারি একটা বস্তু, এটাও বুঝতে পারলেন। আব্বার মোবাইল ফোন কেনার পর আমিও আমারটা ফেরত পেলাম।
মোবাইল ফোন কিনে আব্বার অবস্থা হলো আমার চেয়েও খারাপ। সারা দিন একে-ওকে ফোন দিচ্ছেন। সবাইকে নিজের নাম্বার দিচ্ছেন। সবার নাম্বার নিয়ে মোবাইলে সেভ করছেন। আব্বা মোবাইল হাতে নিয়েই মুগ্ধ কণ্ঠে বলতেন, ‘দেখেছিস, সায়েন্স কোথায় চলে গেছে!’
আমি মাথা নাড়তাম।
আব্বা সায়েন্স ফিকশন সিনেমার মতো ভবিষ্যদ্বাণী করতেন। বিশ বছর পর কী হবে তা নিয়ে বলতেন— ‘তুই কি বুঝতে পারছিস, মোবাইল ফোন দিয়ে ঘরে বসেই সব কাজ করা যাবে। মানুষ দূরে থেকেও একে অন্যকে দেখতে পারবে। মানুষের সব প্রশ্নের জবাব দেবে। হাতের এ ছোট যন্ত্রটাই হবে সবচেয়ে দরকারি জিনিস।’
আমি চুপ করে শুনতাম। কারণ তখনো বুঝিনি তার ভবিষ্যদ্বাণী সবই সত্যি হয়ে যাবে। আব্বা শুধু একটা কথা বলতে পারেননি— মোবাইল ফোন একদিন মানুষের হাতে থাকবে না, মানুষই মোবাইলের হাতে চলে যাবে।



