এবং

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বুধবার মধ্য রাত। অফিস থেকে বাসায় ফিরছিলাম। কারওয়ান বাজার থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় উঠি। সঙ্গে ছিলেন সহকর্মী রাকিব। পান্থপথ হয়ে এফডিসি পার করে আমরা হাতিরঝিলে প্রবেশ করছিলাম। তখন রাত ঠিক ২টা। একটি রিকশাকে অতিক্রম করে আমাদের অটোরিকশা যখন সামনে এগোচ্ছিল, তখন রিকশা ও অটোরিকশার মাঝখান দিয়ে একটি মোটরসাইকেল দ্রুত যাওয়ার চেষ্টা করে। সেই সময় মোটরসাইকেলটির সঙ্গে রিকশার সামান্য ধাক্কা লাগে। যতটুকু আমরা দেখেছি, তাতে ভুল ছিল মোটরসাইকেল চালকেরই।
ধাক্কা লাগার পর কী হবে, তা বুঝে ওঠার আগেই মোটরসাইকেলে থাকা তিনজনের একজন নেমে রিকশাচালকের চোয়াল ও কান বরাবর সজোরে থাপ্পড় মারতে শুরু করেন। রিকশাচালকের প্রথম আর্তনাদ ছিল, ‘ওরে মা... মাগো... ওরে বাবারে...’। কিন্তু তাতেও থামেননি হামলাকারী। ডান হাতে মোবাইল ফোন ধরা অবস্থাতেই একের পর এক আঘাত করতে থাকেন।
আমরা সঙ্গে সঙ্গে অটোরিকশার ভেতর থেকেই প্রতিবাদ করি। এমনকি মোটরসাইকেলে থাকা অন্য দুজনকে অনুরোধ করি, ‘ভাই, ওনাকে মারতে নিষেধ করুন। মাফ করে দিন।’ কিন্তু কে শোনে কার কথা! যে মানুষ অন্যায় করতে দ্বিধা করে না, সে কি এত সহজে অনুরোধে থেমে যায়? হয়তো যায় না। যদি যেত, তবে সমাজে এত অনিয়ম, এত ক্ষমতার অপব্যবহার থাকত না। এরপর রিকশাচালকের ভাগ্যে কী ঘটেছিল, তা আর জানা হয়নি।
কিন্তু এর পর থেকেই একের পর এক প্রশ্ন আমাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। আমরা কেন গাড়ি থেকে নামলাম না? কেন নির্যাতিত মানুষটির পাশে দাঁড়াতে পারলাম না? কেন আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিবাদ করলাম না?
প্রশ্নগুলো তীরের মতো বিদ্ধ করছে আমাকে। আমাদের সমাজ এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতেও ভয় লাগে। ভয়— নিজেই আক্রমণের শিকার হওয়ার।
জীবনের পথে চলতে গিয়ে আমরা এমন অনেক ঘটনার সাক্ষী হই, যা শুধু চোখে দেখা কোনো দৃশ্য নয়; সেগুলো মনের গভীরে স্থায়ী ক্ষত তৈরি করে। কিছু ঘটনা মানুষকে ভেঙে দেয়, কিছু ঘটনা প্রতিবাদী করে তোলে, আবার কিছু ঘটনা তাকে আরও দৃঢ় হতে শেখায়। কিন্তু কিছু আঘাত আছে, যা রাতের ঘুম কেড়ে নেয়। বারবার মনে করিয়ে দেয়— কেন আমরা দুর্বলের পাশে দাঁড়াতে পারলাম না?
আমরা চলে এসেছি। কিন্তু সেই রিকশাচালককে কে সাহায্য করল? কে তাকে আশ্রয় দিল? কে তার হয়ে কথা বলল? এমন অসংখ্য প্রশ্ন নিয়েই হয়তো কেটে যায় অনেক রাত।
বাস্তবতা হলো— সবকিছু বুঝেও ভয়, অনিশ্চয়তা আর নিজেদের নিরাপত্তার চিন্তা অনেক সময় মানুষকে পিছিয়ে দেয়। আর সেই নীরবতার ভারই সবচেয়ে বেশি বহন করতে হয় নিজের বিবেককে।




