আপনার কত টাকা প্রয়োজন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
চমকে উঠে থমকে যাবেন আপনি। নির্ঘাত কল্পনা নয়, স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আমি। অতশত কিছু না, কোনো ভণিতাও নয়, পাশের ব্যাগের চেইনটা খুলে ফেলা হলো, ঈষৎ ফাঁক করে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলো আপনার। কিছুটা কুঁজো হয়ে দেখলেন চেইন খোলা ভেতরটা। আপনি তাকিয়ে আছেন নিচে, আমি আপনার চোখে। আপনার দুই চোখ প্রথমে স্থির হলো, চারপাশ কুঞ্চিত হলো খানিকটা, তারপর বড় হয়ে গেল হঠাৎ। চকচকে নোটে থরে থরে সাজানো আছে ব্যাগটা।
ঠিক ঝট করে নয়, বহুদূর হেঁটে আসা ক্লান্ত পথিকের মতো সোজা হলেন আপনি। হাজারো প্রশ্ন থাকার কথা চোখে, সেসব পাশ কাটিয়ে সেখানে কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা, তাৎক্ষণিক মৃদু চঞ্চলতাও।
হেসে কাঁধে হাত রাখি আপনার। স্থির করার চেষ্টা করি আপনাকে। শান্ত ভঙ্গিতে তারপর আমি বলি, ‘এক কোটি টাকা আছে এখানে। সবই আপনার!’
২. আইফেল টাওয়ারের ওপরে দাঁড়ানোর সামর্থ্য নেই আমার, দাঁড়ানোর ক্ষমতা নেই আমাদের সংসদ ভবনের ছাদেও। গুলশান কিংবা বনানীর সবচেয়ে উঁচু ভবনটাতে দাঁড়াতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু না, আমাদের উঠোনটাকে ঢেকে দেওয়া যে কংক্রিটের জঙ্গলটা গড়ে উঠেছে পাশে, যার ছায়া অনেক লম্বা, মূল রাস্তার পাশেই বেশ অহংকারী দেখায় যাকে, উঠতে পারি আমরা তার ছাদে।
তার আগে ওই বাড়ির যে তিনটি মেয়ে আছে, তার বড়টাকে জিজ্ঞেস করতে পারি, ‘আচ্ছা, এই এত বড় একটা বাড়ি, এটা বানাতে কত টাকা লেগেছে তোমার বাবার?’
উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করবে না মেয়েটা। কিংবা উত্তরটা আদৌ জানা নেই তার। আমি আরও একটু মোহনীয় গলায় বলব, ‘তোমার বাবা একজন চাকরিজীবী। কত টাকা বেতন পান তিনি? তোমাদের তিন বোনের লেখাপড়ার খরচ, দুটি গাড়ি চালানোর ড্রাইভার আর তেল, সপ্তাহে সপ্তাহে তোমাদের আয়োজিত শপিং, সংসারের মহোৎসব ব্যয়, আরও অনেক কিছু। প্রতি মাসে কত টাকা জমাতে পারেন তিনি? আর কত টাকা জমাতে পারলে এত বড় একটা দালান বানানো যায়?’
খুব ভালো করেই জানেন আপনি, আমিও— কোনো উত্তর নেই মেয়েটার কাছে। তাকে পাশ কেটে বরং আমরা ছাদে উঠে যাই তাদের। রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে সামনে তাকাতে বলি আপনাকে। আপনি তাকালেন। আমি আবারও আপনার কাঁধে হাত রাখি একটা। আঙুলগুলো মৃদু ঠেসে বলি, “কাঁধে ব্যাগওয়ালা ওই যে লোকটাকে দেখছেন, দাঁড়িয়ে আছেন বাসের জন্য, একটু ভালো করে দেখুন তাকে। পাশে সিটে বসা রিকশাওয়ালাটাকেও দেখুন প্লিজ। ভ্যানগাড়িতে বিক্রি করা সবজিওয়ালা আর ‘অ্যাই মুইরগি অ্যাই মুইরগি’ বলে চেঁচানো মানুষটাকেও বাদ দেবেন না।”
কিঞ্চিৎ পাশ ফিরে আপনি আমার দিকে তাকালেন। যথারীতি আমি হেসে বললাম, ‘জি, আপনি আমাকেও দেখুন। নিজেকেও দেখতে বলতাম আমি আপনাকে, কিন্তু মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে— মানুষ নিজেকে দেখতে পারে না। প্রিয় চোখ-মুখ-চেহারা দেখতে আয়না লাগে তার। সাহায্য নিতে হয় অন্যের। আপনি ওই মানুষটাকেও দেখুন, ওই যে, কোট-টাই পরে যে মানুষটা ঝকঝকে গাড়ি থেকে নামলেন, হনহন করে হেঁটে যাচ্ছেন ওপাশের অট্টালিকায়। আপনি বাদ দেবেন না লাঠি আর থালা হাতের ওই অন্ধ মানুষটাকেও।’
কিছুটা কৌতূহল নিয়ে দৃষ্টি ফেরালেন আপনি আমার দিকে। আমি বুদ্ধিজীবীর চাহনিতে বিজ্ঞের মতো আপনাকে বললাম, ‘সব পোশাকের, সব ভঙ্গির, সব মানুষ কেবল একটা জিনিসের জন্যই বাসাবাড়ি থেকে বের হয়েছে, পথে নেমেছে ক্লান্তিহীন।’
‘জি, একটা জিনিসের জন্যই।’ ক্লাসের উত্তর জানা পটু ছেলের মতো বলে দিলেন আপনি।
৩. ‘আচ্ছা বলুন তো, ৮ হাজার কোটি ডলার সমান কত টাকা?’
নির্ঘাত আপনি আবার চমকে উঠবেন। ফুটবল বিশ্বকাপসংক্রান্ত এ টাকার কথা আমার আপনার না জানলেও চলবে। তবে আপনাকে একটা শিশুসুলভ প্রশ্ন করি— ‘এই মুহূর্তে যদি আপনাকে ১২ হাজার ৭৬৩ কোটি গুনতে দেওয়া হয় এবং তা যদি দেশের সবচেয়ে বড় নোট ১০০০ টাকার হয়, তাহলে কত ঘণ্টা সময় নেবেন আপনি?’
‘এত টাকা আপনার আছে?’ কিছুটা বিদ্রূপ মেশানোর স্বর আপনার।
‘না নেই, তবে এ টাকাগুলো আমার আপনার মতোই বাংলাদেশির, যা ২০২৫ সালে জমা হয়েছে সুইস ব্যাংকে।’
‘বলেন কী?’
‘আমি আর কী বলি, যা বলার বলে দিয়েছেন শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ। বাংলাদেশ এরই মধ্যে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, সাইপ্রাসসহ বিভিন্ন দেশে অবৈধ সম্পদ ফেরাতে শুরু করেছে হানা দেওয়া। এমন পদক্ষেপ আগেই উপলব্ধি করে অনেকে নিরাপদ ভেবে সুইস ব্যাংকে টাকা স্থানান্তর করেছেন। কেননা, এখন পর্যন্ত সুইস ব্যাংক কারও সম্পদ ফেরত দেয়নি। সেজন্য নিরাপদ ভেবে কালো টাকার মালিক বাংলাদেশিরা সেখানে টাকা জমানো বাড়িয়েছেন। যদি কালো টাকা না হতো তবে কেন পাশের দেশ এবং নিজ দেশের ব্যাংকগুলোতে টাকা রাখছেন না। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি ছাড়া সব বিদেশি অর্থই কালো টাকা।’ আমি একটু হেসে নিয়ে বললাম, ‘কালো টাকা কিন্তু কালো রঙের নয়; কালো চরিত্র, কালো চিন্তার, কালো মনন, কালো দেশদ্রোহীদের টাকাই হচ্ছে কালো টাকা।’
৪. ‘কোনো পুলিশ আছে আপনার পরিবারে? কিংবা কোনো আত্মীয়?’ দ্রুত কোনো উত্তর না দেওয়ায় আমি বললাম, ‘একটা সুখবর আছে তাদের জন্য। ৭৬ কোটি টাকার নতুন পোশাক বাদ দিয়ে নতুন করে ৭৭ কোটি টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। না না, আমি আপনার কাছে জানতে চাচ্ছি না, দেশে কতগুলো পুলিশ সদস্য আছে, এই ৭৭ কোটি টাকার পোশাক কিনলে একজন পুলিশের একটি পোশাকের দাম কত পড়বে, কার ব্যাংক ব্যালান্স কত বাড়বে ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি কেবল জানতে চাচ্ছি, পোশাক বদলালে কী হয়? সততা বৃদ্ধি পায়? দায়িত্ব পালনে সচেতনতা বাড়ে? সাধারণ মানুষ প্রকৃত সেবা পায়?’ আরও একটু হেসে নিই আমি, ‘শেখ সাদি অবশ্য পোশাক পাল্টিয়েছিলেন। আগের চেয়ে অপেক্ষাকৃত ভালো খাবার পেয়ে তিনি নিজে খাননি, পোশাকের পকেটে ঢুকিয়েছিলেন, পোশাককে খাইয়েছিলেন! হায়, সব সুখ তবে কি কেবল ওই পোশাকেই, পোশাকেরই?’
৫. কিছুটা চমকে উঠলেন এবারও আপনি। জি, আমি আপনাকে এই বৃদ্ধার কাছেই আনতে চেয়েছি, যাকে আমি অনেক বছর ধরে এখানে দেখি। ঠিক ভিক্ষুক নন তিনি, হাত পাতেন না কারও সামনে, কিন্তু কেউ কিছু দিলে হাতে নেন তা। আমরা এখন তার হাতে একটা ৫০০ টাকার নোট দেব।
মানিব্যাগ থেকে ৫০০ টাকার একটি নোট বের করলাম, দিলাম বৃদ্ধার হাতে। তারপর কিছুটা নিচু হয়ে বললাম, ‘কী করবেন এই টাকা দিয়ে?’
দৃষ্টির পুরোটা স্থাপন করলেন তিনি আমার চোখে। আমি দেখলাম— বেতফলের মতো ঘোলাটে তার চোখ। কোথা থেকে কিছু জল এলো তার ওপর, ছেয়ে গেল চারপাশ। তারপর গড়িয়ে পড়ল গালে, আঁচলে, রক্তনালির আধিক্যে মোড়া শীর্ণ হাতে। আমি জানি, এ টাকা দিয়ে তিনি মাছ কিনবেন, কোনো তেলাপিয়া কিংবা পাঙাশ। মাংসের স্বাদ পাওয়ার জন্য বাজারের কোনায় বিক্রি করা মুরগির পা, এটা-ওটা।
আমি স্পষ্ট টের পেলাম— কালো কিংবা সাদা বলে কোনো টাকা নেই। টাকা কারও কাছে বিলাস, কারও কাছে তীক্ষ্ণ যাপনের উপকরণ, কারও কাছে পূর্ণিমার চাঁদ, সবশেষে সবার কাছে— প্রয়োজন!
‘জন্মমাত্রই টাকা, জীবনান্তে টাকা, জগৎ টাকারই খেলা’— মীর মশাররফ হোসেন তাই বলে গেছেন কত কত দিন আগে।




