রাজনীতির পাঠশালা : আগামী দিনের নেতৃত্ব তৈরিতে প্রশিক্ষণ কেন জরুরি?

ছবি : এআই
বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তি, দল ও নির্বাচনকেন্দ্রিক আলোচনার বৃত্তে আবর্তিত হয়েছে। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য কেবল একটি সুষ্ঠু নির্বাচনই যথেষ্ট নয়; এর জন্য প্রয়োজন দায়িত্বশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি, দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মী এবং দূরদর্শী নেতৃত্ব। এসব গুণ সচরাচর স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে ওঠে না, এর পেছনে প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, ধারাবাহিক অনুশীলন ও সুনির্দিষ্ট প্রস্তুতি। এই প্রেক্ষাপটে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক প্রশিক্ষণের চিন্তাটি নতুন করে আলোচনার দাবি রাখে।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক পদক্ষেপগুলোর অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক ছিল দলীয় কর্মী ও সম্ভাব্য নেতাদের প্রশিক্ষণের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠার পর কর্মীদের রাজনৈতিক দর্শন, সাংগঠনিক বিধিবিধান ও গঠনমূলক কর্মকৌশল সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা দিতে বিশেষ কর্মশালার আয়োজন করা হয়। পরবর্তী সময়ে সংসদ সদস্যদেরও সংসদীয় কার্যক্রম ও দায়িত্ববোধ সম্পর্কে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়। বিশেষ করে ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি দুই শতাধিক আসনে জয়লাভ করার পর নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের জন্য আয়োজিত প্রশিক্ষণ কর্মশালাটি বাংলাদেশের দলীয় রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত। এর মূল লক্ষ্য কেবল দলীয় আদর্শ শেখানোই ছিল না, বরং সংসদীয় আচার-আচরণ, আইন প্রণয়ন বিধি এবং একজন জনপ্রতিনিধির প্রকৃত দায়িত্ব সম্পর্কে তাদের যোগ্য করে তোলা।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রশিক্ষণের এই প্রয়োজনীয়তা আজকের দিনে আরও বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ রাজনীতি কেবল মাঠপর্যায়ের বক্তৃতা কিংবা মিছিলের বিষয় নয়; এটি মূলত রাষ্ট্র পরিচালনার একটি জটিল ও সংবেদনশীল প্রক্রিয়া। একজন রাজনৈতিক কর্মীকে মানুষের অভাব-অভিযোগ শুনতে হয়, স্থানীয় সংকট বুঝতে হয় এবং একইসঙ্গে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নীতি সম্পর্কে সচেতন থাকতে হয়। তার অর্থনীতি, কৃষি, শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ, প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও প্রশাসনের সার্বিক কাঠামো সম্পর্কে ন্যূনতম স্বচ্ছ জ্ঞান থাকা জরুরি।
একজন সংসদ সদস্যের দায়িত্ব তো আরও ব্যাপক। তাকে দেশের জন্য আইন প্রণয়ন করতে হয়, জটিল জাতীয় বাজেট বিশ্লেষণ করতে হয়, সংসদীয় কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হয় এবং সরকারের সার্বিক কর্মকাণ্ডের নিরপেক্ষ পর্যালোচনা করতে হয়। ফলে কেবল দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক আনুগত্য বা রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা একজন দক্ষ জনপ্রতিনিধি হওয়ার জন্য যথেষ্ট হতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন একাডেমিক জ্ঞান, প্রায়োগিক দক্ষতা, উচ্চ নৈতিকতা, কার্যকর যোগাযোগ ক্ষমতা, তথ্য বিশ্লেষণের দক্ষতা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। ঠিক এই জায়গাতেই একটি আধুনিক ‘রাজনীতির পাঠশালা’ কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়।
রাজনৈতিক প্রশিক্ষণকে যদি কেবল দলীয় প্রচার-প্রচারণা বা মতাদর্শ বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয়, তবে এর প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। একটি সময়োপযোগী প্রশিক্ষণ কর্মসূচির পরিধি হতে হবে অনেক বেশি বিস্তৃত ও আধুনিক। সেখানে স্থান পেতে পারে দেশের সংবিধান ও রাষ্ট্রব্যবস্থা, সংসদীয় কার্যপ্রণালি, আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া, জনঅর্থ ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় সরকার ও বিকেন্দ্রীকরণ, টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা মোকাবিলা, তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, পররাষ্ট্রনীতি, ভূরাজনীতি, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীল আচরণ, মানবাধিকার, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং সংকটকালীন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা। এককথায়, রাজনীতির পাঠশালা কর্মীকে কেবল নির্বাচনী লড়াকু হিসেবে নয়, বরং একজন দূরদর্শী ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে গড়ে তুলবে।
অতীতে জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক শিক্ষার যে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন, আধুনিক যুগে তার প্রাসঙ্গিকতা এখনও অটুট। সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে, আধুনিক রাজনীতির এই চাওয়াকে গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান নবনির্বাচিত বিএনপি সংসদ সদস্যদের জন্য একটি প্রশিক্ষণ কর্মশালা উদ্বোধন করেছিলেন। সেখানে সংসদীয় রীতি, আচরণবিধি, বিল পর্যালোচনা, বাজেট নথি পাঠ ও সংসদীয় কমিটির ভূমিকা সম্পর্কিত পাঠ্যসূচি রাখা হয়েছিল। এটি স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, নির্বাচন শেষ হলেই নেতৃত্বের শেখার প্রক্রিয়া শেষ হয়ে যায় না; বরং জনগণের আমানত রক্ষার দায়িত্ব পাওয়ার পর নিজেকে আরও বেশি যোগ্য করে তুলতে হয়।
এই প্রশিক্ষণ ধারণাকে কেবল সংসদ সদস্য বা শীর্ষ নেতাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। ভবিষ্যতের নেতৃত্ব তৈরির জন্য যুব ও ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত তরুণ কর্মীদেরও একটি ধারাবাহিক ও সুসংগঠিত কাঠামোর অধীনে আনা দরকার। এর জন্য রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে একটি আধুনিক ‘লিডারশিপ স্কুল’ বা নেতৃত্ব বিকাশ কেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে। এর উদ্দেশ্য কোনো বিশেষ রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সুবিধা তৈরি করা নয়, বরং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষ, নীতিবান ও দায়িত্বশীল নাগরিক নেতৃত্ব গড়ে তোলা।
এমন উদ্যোগে তরুণ রাজনৈতিক কর্মী, স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি, ছাত্রনেতা ও সামাজিক সংগঠনের সম্ভাবনাময় যুবদের বিভিন্ন মেয়াদে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি-বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (বিপিএটিসি) এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিশেষজ্ঞদের পরামর্শক ও প্রশিক্ষক হিসেবে যুক্ত করা যেতে পারে।
তাত্ত্বিক আলোচনার পাশাপাশি সিমুলেশনের মাধ্যমে কৃত্রিম সংসদ পরিচালনা, ড্রাফট বাজেট তৈরি, পাবলিক হেয়ারিং বা জনশুনানি আয়োজন ও নীতি-প্রস্তাব তৈরির মতো বাস্তবভিত্তিক মহড়ার ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। এর ফলে তরুণরা স্লোগানসর্বস্ব রাজনীতির বাইরে এসে সমস্যা বিশ্লেষণ ও বাস্তবমুখী সমাধান বের করার প্রয়োগিক দক্ষতা শিখবে।
এখানে দলীয় শিক্ষাক্রম ও জাতীয় শিক্ষাক্রমের পার্থক্যটি পরিষ্কার রাখা অত্যন্ত জরুরি। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নিজস্ব কর্মীদের আদর্শিক ও সাংগঠনিক পাঠ দেবে, সেটি স্বাভাবিক। তবে রাষ্ট্রীয় বা বৈশ্বিক মানের কোনো নেতৃত্ব বিকাশ কর্মসূচির চরিত্র হতে হবে সম্পূর্ণ অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক। সেখানে ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা, সুস্থ বিতর্ক, স্বাধীন চিন্তার সুযোগ ও সাংবিধানিক মূল্যবোধের শিক্ষা থাকা চাই। কারণ গণতন্ত্র কেবল নিজের কথা বলার অধিকার নয়, প্রতিপক্ষের যুক্তিসঙ্গত কথা শোনার ধৈর্য ও মানসিকতাও বটে। একজন নেতা যদি প্রতিপক্ষকে চিরশত্রু না ভেবে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতে শেখেন, তবেই তার নেতৃত্ব পরিপক্বতা লাভ করে।
আজকের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক প্রশিক্ষণের চিন্তাটিকে নতুন সময়ের সঙ্গে মেলাতে হবে। তখনকার চ্যালেঞ্জের সাথে আজকের চ্যালেঞ্জের ব্যাপক তফাত। বর্তমান যুগ ডিজিটাল রূপান্তর, সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব, এআই প্রযুক্তির ব্যবহার, বৈশ্বিক জলবায়ু সংকট ও জটিল ভূরাজনীতির যুগ। তাই আজকের পাঠ্যক্রমে সাধারণ রাজনৈতিক ইতিহাসের পাশাপাশি যুক্ত করতে হবে কৃষকের জীবনযাত্রার উন্নয়ন, তরুণদের জন্য নতুন দিনের কর্মসংস্থান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কীভাবে চাকরির বাজারে পরিবর্তন আনছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কীভাবে দেশীয় বাজারে প্রভাব ফেলছে এবং সীমিত সম্পদের সর্বত্তম বণ্টন কীভাবে সম্ভব, তার মতো বাস্তবভিত্তিক আলোচনা।
বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত ভৌত অবকাঠামো, মহাকাশ প্রযুক্তি কিংবা মেগা প্রকল্পে বিপুল বিনিয়োগ করছে। কিন্তু সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গড়ে তোলার অন্যতম মূল কারিগর যে গুণগত রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সেখানে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করার চর্চাটি আমাদের দেশে তুলনামূলকভাবে কম। অথচ দিনশেষে রাষ্ট্রের প্রতিটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারণ করেন এই রাজনীতিকরাই। তাই আগামী দিনের নেতৃত্ব গড়ার প্রক্রিয়াকে যদি একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা যায়, তবে তা দেশের সার্বিক গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকেই মজবুত করবে। এর মাধ্যমে এমন একটি সচেতন প্রজন্ম উঠে আসবে যারা রাজনীতিকে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার মাধ্যম না ভেবে জনসেবা ও রাষ্ট্র গঠনের দায়িত্ব হিসেবে দেখবে।
রাজনৈতিক তাৎক্ষণিক লাভ-ক্ষতির চেয়েও রাষ্ট্রের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ টেকসই নেতৃত্ব গড়ে তোলা। জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক উদ্যোগকে কেবল অতীত ইতিহাসের অংশ না বানিয়ে, তার মূল চেতনাকে আধুনিক, সুসংগঠিত ও গণতান্ত্রিক রূপ দেওয়া দরকার। আজকের মাঠপর্যায়ের কর্মীরাই আগামী দিনের সংসদ সদস্য, মন্ত্রী বা নীতিনির্ধারক হবেন। তাদের যদি শুরু থেকেই আইন, সংবিধান, অর্থনীতি, প্রশাসন, প্রযুক্তি ও নৈতিকতার ওপর যথাযথ পাঠ দেওয়া যায়, তবে তার প্রকৃত সুফল পাবে পুরো দেশ। একটি সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের জন্য কেবল ইট-পাথরের অবকাঠামো নয়, প্রয়োজন প্রজ্ঞাবান ও প্রশিক্ষিত রাজনৈতিক নেতৃত্ব। আর সেই দূরদর্শী নেতৃত্ব তৈরির জন্য এক আধুনিক ‘রাজনীতির পাঠশালা’ সময়োপযোগী বাস্তবতারই নাম।
লেখক : উপাচার্য, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা
[email protected]







