কিন্তু

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সকালে ঘুম থেকে উঠেই বুঝলাম, আজও আমাকে বেঁচে থাকতে হবে; কিন্তু ব্যাপারটা সহজ হবে না বলেই মনে হচ্ছে। ঘুম ভাঙল প্রচণ্ড গরমে। বিদ্যুৎ নেই। ফ্যান ঘুরছে না। মোবাইলের দিকে তাকালাম। চার্জ মাত্র ২০ পারসেন্ট। ভেবেছিলাম ঘুম থেকে উঠে চার্জ দেব; কিন্তু তাও হচ্ছে না।
আমি বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালাম। ফ্রেশ হতে হবে। বাথরুমে ঢুকে দেখি পানিও নেই। পানির সমস্যাটা নতুন। দুদিন ধরে হুটহাট পানি চলে যায়। বিদ্যুতের সঙ্গে পানিরও একটা সম্পর্ক আছে। আমি পানিহীন কলের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম। কলটাকে খুব নিষ্ঠুর মনে হলো। আজকের পানি সংকটের জন্য শুধু কলটাকেই দায়ী মনে হচ্ছে।
বালতিতে সামান্য পানি ছিল। তা দিয়েই হাত-মুখ ধুলাম। আজকে গোসল ছাড়াই অফিসে যেতে হবে। এই গরমে গোসল ছাড়া দিন পার করাটা অমানবিক নয়, চরম অমানবিক।
দিনটা ভালো যাবে না বুঝতে পারছি। গ্যাস থাকে না প্রায় সারা দিন। সকালে রুটি খাওয়া বাদ দিয়েছি। এখন আমরা হালকা ও শুকনো খাবার খাই। মুড়ি, চিড়া, পাউরুটি, বিস্কুট— এসব। দুপুরে ভাত হবে কি না, বোঝা যায় আগের দিন গভীর রাতে। রাত বাড়লেই গ্যাস মহাশয় বাড়িতে বেড়াতে আসেন। তবে কখন আসবেন তা বলে আসেন না। মর্জি ভালো থাকলে ১২টায় আসেন। কোনো দিন আসেন রাত ৪টায়। তিনি কতক্ষণ থাকবেন বলা মুশকিল। রাগ বেশি হলে রান্নার মাঝপথেও চলে যান।
অফিসে যাব। বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দেখি বাস কম। জানা গেল, গ্যাসচালিত বাসগুলো গ্যাস পাচ্ছে না। সিএনজিচালিত অটোরিকশাও চোখে পড়ছে কম। গাড়ির গ্যাস নেওয়া এখন পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। একটুখানি গ্যাসের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে থাকতে হয়।
আমি বাসের অপেক্ষায় থাকি। অফিস টাইমে বাসে ওঠা আসলে ওঠা না, প্রতিযোগিতা। এখানে শরীরের সঙ্গে বুদ্ধিরও কসরত হয়। বাসে ওঠার সময় আমার লক্ষ্য বাসে ওঠা নয়। লক্ষ্য থাকে, শরীরের ৫০ ভাগ বাসের ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া। একবার ঢোকাতে পারলেই কেল্লাফতে। বাকি ৫০ ভাগ নিজে থেকেই ঢুকে যায়।
বাসে ঢুকেও লাভ হলো না। কিছুদূর যেতেই থেমে গেল। সামনে ভয়াবহ জ্যাম। আমি গুগল ম্যাপের দিকে তাকালাম। কয়েক কিলোমিটার লাল দেখাচ্ছে। অফিসে লেটমার্ক হবে নিশ্চিত। বেশি দেরি হলে বসের বকাঝকাও অবধারিত। তিন দিন লেট হলে এক দিনের বেতন কাটা যায়। বকাঝকার সঙ্গে টাকাটাও যাচ্ছে আজ।
ফেরার পথে বাজারে যাই। মধ্যবিত্ত বাজারে যায় লম্বা তালিকা নিয়ে। আর ব্যাগ ভরে যায় লজ্জার অভিজ্ঞতা দিয়ে। প্রথমে সবজির দিকে তাকাই। সবজি আমার দিকে তাকায়। দুজনের মধ্যে শান্তিপূর্ণ বোঝাপড়া হয়— আজ না হয় তোমাকে না-ইবা নিলাম।
মাছের দাম শুনে চুপসে গেলাম। দোকানদার নিশ্চুপ। মাছেরাও যে কথা বলছে না। তিনপক্ষের মধ্যে একটা সমঝোতা চুক্তি হলো। সিদ্ধান্ত হলো, মাছটা মাছের দোকানেই থাকবে।
ডিমের হালি ৫০। ডিম দেখে মনে হলো, আগে এরা খাবার ছিল। এখন বিলাসিতা। চারটা ডিম কিনব, নাকি ৫০ টাকা বাঁচাব— এমন ভাবনাও মাথায় আসে।
গরমটা বেড়েছে খুব। ক্লান্তি আসে শরীরে। একটু বাতাস যদি হতো! বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত হয়। আমি আসতেই আবার লোডশেডিং। ফ্যানের বাতাসের ঘণ্টাখানেক ছুটি। ঘামতে ঘামতে অপেক্ষা করি। এক ঘণ্টা পর সত্যি সত্যি বিদ্যুৎ আসে। খুব আনন্দ হয়। আনন্দে চিৎকার করি। ফ্যান ঘুরতে থাকে। হঠাৎ করেই পৃথিবীকে অসম্ভব শান্তিময় মনে হয়।






