গণিতে পটু হাঙর, তাদেরও থাকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু

ছবি: এআই
শুধু শিকারী নয়, গণিতেও পটু হাঙর! তারা পার্থক্য বোঝে ৩ আর ৫-এর। জ্যাজ সংগীতও নাকি তাদের পছন্দ। শুধু তা-ই নয়, হাঙরেরও আছে ঘনিষ্ঠ বন্ধু আর অসাধারণ অনুভূতির ক্ষমতা। গর্ভেই ভাইবোন খেয়ে বড় হয় কেউ কেউ। তাদের গা ঢাকা ছোট ছোট দাঁতে। তারা টের পায় আপনার হৃদস্পন্দনও।
কোটি কোটি বছর ধরে পৃথিবীতে টিকে থাকা এই সামুদ্রিক প্রাণীটির সম্পর্কে জানলে অবাক হবেন আপনিও।
সবচেয়ে প্রাচীন মেরুদণ্ডী শিকারিদের একটি হাঙর। পৃথিবীর পাঁচটি বড় গণবিলুপ্তির ঘটনার পরও টিকে গেছে তারা। এর মধ্যে ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ পার্মিয়ান-ট্রায়াসিক গণবিলুপ্তি, যেখানে বিলুপ্ত হয়ে যায় পৃথিবীর প্রায় ৯০ শতাংশ সামুদ্রিক প্রাণী।
তবু টিকে আছে হাঙর। আজ তাদের দেখা মেলে পৃথিবীর প্রায় সব মহাসাগরেই। দীর্ঘ বিবর্তনের পথে তারা এমন অনেক বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে, যা সত্যিই বিস্ময়কর।
১. হাঙর অঙ্ক করতে পারে
অনেকেই মনে করেন, শুধু প্রবৃত্তি আর ক্ষুধার তাড়নায় শিকার করে হাঙর। কিন্তু গবেষণা বলছে, তারা বেশ বুদ্ধিমান এবং শেখার ক্ষমতাসম্পন্ন প্রাণী।
বিভিন্ন ধরনের শব্দ, জ্যামিতিক নকশা ও রঙিন আকৃতি আলাদা করে চিনতে পারে হাঙর। এক গবেষণায় দেখা গেছে, অল্পবয়সী ধূসর বাঁশ হাঙর প্রায় এক বছর ধরে মনে রাখতে পারে বিভিন্ন আকৃতি ও দৃষ্টিভ্রমের তথ্য।
এমনকি তারা বুঝতে পারে তিন ও পাঁচ কিংবা চার ও সাতের মতো সংখ্যার পার্থক্যও। তবে চার ও পাঁচের মতো কাছাকাছি সংখ্যার পার্থক্য নির্ণয় করা তাদের জন্য কঠিন।
২. জ্যাজ সংগীতও পছন্দ হাঙরের
অস্ট্রেলিয়ায় পাওয়া পোর্ট জ্যাকসন হাঙরের ওপর এক গবেষণায় দেখা যায়, জ্যাজ সংগীত বাজলে খাবার পাওয়ার নির্দিষ্ট জায়গায় চলে যায় তারা। কিন্তু ধ্রুপদি সংগীতের ক্ষেত্রে একই আচরণ দেখাতে পারেনি তারা।
সিডনির ম্যাককোয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা জানিয়েছেন, হাঙর বুঝতে পারছিল যে সংগীতের সঙ্গে কিছু করার সম্পর্ক আছে। কিন্তু ধ্রুপদি সংগীতের সময় কোথায় যেতে হবে, তা শিখতে পারেনি তারা।
৩. হাঙরেরও থাকে নাভি
সব হাঙর ডিম পাড়ে না। ষাঁড় হাঙর ও হাতুড়িমাথা হাঙরের মতো অনেক প্রজাতি বেড়ে ওঠে মায়ের গর্ভেই।
মায়ের জরায়ুতে তারা নাভিরজ্জুর মাধ্যমে পুষ্টি পায়, ঠিক মানব শিশুর মতো। জন্মের পর কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস পর্যন্ত দেখা যায় তাদের নাভির দাগও।
আবার কিছু হাঙরের ভ্রূণ ডিমের ভেতরেই মায়ের শরীরে বেড়ে ওঠে এবং পরে জন্ম নেয় জীবিত অবস্থায়।
৪. কিছু হাঙরের বাচ্চা জন্মের আগেই একে অন্যকে খেয়ে ফেলে
স্যান্ড টাইগার হাঙরের বাচ্চাদের জীবন শুরু হয় ভয়ংকর প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে। একটি মায়ের দুইটি জরায়ুতে একাধিক ভ্রূণ বেড়ে উঠলেও নিজেদের ভাইবোনকেই খেয়ে ফেলে তারা। শেষ পর্যন্ত প্রতিটি জরায়ুতে মাত্র একটি করে বাচ্চা বেঁচে থাকে।
এরপর সেই বাচ্চাগুলো মায়ের উৎপাদিত নিষিক্ত না হওয়া ডিম খেয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে জন্ম নেয়।
৫. হাঙরেরও ঘনিষ্ঠ বন্ধু থাকে
হাঙর সবসময় একাকী থাকে, এমন ধারণা সঠিক নয়। ধূসর রিফ হাঙর একই দলের বন্ধুদের সঙ্গে চলাফেরা করতে পারে টানা চার বছর পর্যন্ত। তারা মাঝেমধ্যে আলাদা হলেও পরে আবার একত্রিত হয়।
অল্পবয়সী লেমন হাঙর দলবদ্ধভাবে থাকে এবং একে অন্যের কাছ থেকে খাবার খোঁজা ও শিকারির হাত থেকে বাঁচার কৌশল শেখে।
গবেষণায় এমনও দেখা গেছে, ‘সাইমন’ ও ‘জেকিল’ নামে দুটি গ্রেট হোয়াইট হাঙর একসঙ্গে অতিক্রম করেছে প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটার পথ।
৬. হাঙরের শরীর জুড়ে থাকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দাঁত
হাঙরের শরীরে সাধারণ আঁশ নেই। এর বদলে থাকে ডেন্টিকল নামে অসংখ্য ক্ষুদ্র দাঁতের মতো গঠন।
এগুলো পানির প্রতিরোধ কমিয়ে সাহায্য করে দ্রুত সাঁতার কাটতে। উল্টো দিকে হাত বুলালে এটি মোটা স্যান্ডপেপারের মতো খসখসে লাগে।
অনেক সময় অপরিচিত বস্তুর গায়ে শরীর ঘষে তার গঠন ও বৈশিষ্ট্য বোঝার চেষ্টা করে হাঙর।
৭. হাঙর আপনার হৃদস্পন্দনও টের পেতে পারে
হাঙরের শুধু পাঁচটি নয়, রয়েছে মোট আটটি ইন্দ্রিয়। দৃষ্টি, শ্রবণ, ঘ্রাণ, স্পর্শ ও স্বাদের পাশাপাশি তারা পানির চাপ, বৈদ্যুতিক সংকেত এবং অনুভব করতে পারে পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রও।
তাদের শরীরে থাকা বিশেষ সংবেদনশীল অঙ্গ অন্য প্রাণীর হৃদস্পন্দনের ফলে তৈরি হওয়া ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিক সংকেতও শনাক্ত করতে পারে। এমনকি অন্ধকার পানিতেও শিকার খুঁজে বের করতে সক্ষম তারা।
৮. হাঙর গাছের চেয়েও প্রাচীন
বর্তমান হাঙরের পূর্বপুরুষের জীবাশ্মের বয়স প্রায় ৪৫ কোটি বছর। অর্থাৎ পৃথিবীতে প্রথম গাছ জন্মানোরও প্রায় ৬ কোটি বছর আগে অস্তিত্ব ছিল হাঙরের পূর্বপুরুষের।
ডাইনোসরেরও প্রায় ২২ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে বিচরণ করত তারা। এমনকি শনির বলয় ও আকাশের নর্থ স্টারের চেয়েও হাঙরের ইতিহাস অনেক পুরনো।
বর্তমানে পৃথিবীতে হাঙর রয়েছে প্রায় ৫০০ প্রজাতির। বিজ্ঞানীরা এখনো সন্ধান পাচ্ছেন নতুন নতুন প্রজাতির।
মানুষ ও হাঙরের দূর সম্পর্কের আত্মীয়তা
বিজ্ঞানীদের ধারণা, মানুষ ও হাঙরের সর্বশেষ অভিন্ন পূর্বপুরুষ প্রায় ৪৪ কোটি বছর আগে বাস করত পৃথিবীতে। দেখতে সেটি মানুষের চেয়ে হাঙরের মতোই ছিল।
এরপর কোটি কোটি বছরের বিবর্তনে দুই প্রজাতির পথ আলাদা হয়ে গেলেও পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের ইতিহাসে মানুষ ও হাঙরের সম্পর্ক জড়িয়ে আছে গভীরভাবে।
সূত্র: বিবিসি







