কিন্তু

আমার একটা বদভ্যাস আছে। কেউ কোনো ভালো খবর দিলে আমি খুশি হই। তারপর একটা কিন্তু বলি। কথাটা শুনে মানুষের মুখের হাসি কমে যায়। আমি সেটা লক্ষ করি। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।
সেদিন এক বন্ধু ফোন করে বলল, ‘দোস্ত, একটা সুখবর আছে। নতুন চাকরি পেয়েছি।’
আমি বললাম, ‘বাহ! বেতন কেমন?’
সে বেতন বলল। শুনে আমারও ভালো লাগল।
তারপর বললাম, ‘বেতন তো ভালো। কিন্তু অফিসটা বাসা থেকে কত দূরে?’
বন্ধু একটু থেমে বলল, ‘প্রায় দুই ঘণ্টা।’
আমি বললাম, ‘ওহ! তাহলে তো প্রতিদিন চার ঘণ্টা রাস্তায়।’
ফোনের ওপাশে নীরবতা।
বন্ধু বলল, ‘তুই আমাকে অভিনন্দন জানাবি না?’
আমি বললাম, ‘আরে, অভিনন্দন তো জানিয়েছিই!’
সে ফোন রেখে দিল।
আমার স্ত্রী বলে, এই কিন্তু বলার অভ্যাসটা একদিন সংসার নষ্ট করবে। আমি বলি, ‘তা কী করে হয়? আমি তো সব কথাই ভালোভাবে বলি।’
স্ত্রী বলে, ‘তুমি ভালোভাবে বলো। কিন্তু কথার শেষে এমন কিছু বলো, যে কারণে ভালো কথাটাই আর ভালো থাকে না।’
স্ত্রীর কথাটা আমার পছন্দ হয়নি। কিন্তু কথাটা সত্যি। আমাদের অফিসেও একজন আছেন। তার কাছে কোনো লেখা নিয়ে গেলে প্রথমে বলেন, ‘চমৎকার হয়েছে।’
লেখক তখন মনে মনে পুরস্কার গ্রহণের প্রস্তুতি নেন।
এরপর তিনি বলেন, ‘কিন্তু শেষটা আরেকটু ভালো করা যেত।’
লেখক পুরস্কার ফেরত দিয়ে বাসায় চলে যান।
একদিন ঠিক করলাম, আর কিন্তু বলব না। মানুষকে উৎসাহ দেব। ভালো কথা বলব। কারও আনন্দে পানি ঢালব না।
বিকালে এক পরিচিত লোকের সঙ্গে দেখা। তিনি জানালেন, তার ছেলে পরীক্ষায় প্রথম হয়েছে।
আমি বললাম, ‘দারুণ খবর! ছেলেকে আমার অভিনন্দন জানাবেন।’
লোকটি খুশি হয়ে চলে যাচ্ছিলেন। আমি পেছন থেকে ডাকলাম। তিনি ফিরে তাকালেন।
আমি বললাম, ‘একটা কথা ছিল।’
তিনি বললেন, ‘কী?’
আমি বললাম, ‘না, কিছু না।’
লোকটি চলে গেলেন। আমিও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। আজ তাহলে বেঁচে গেছি।
বাসায় ফিরে স্ত্রীকে ঘটনাটা বললাম। সে হাসল।
আমি বললাম, ‘দেখলে? আজ কিন্তু বলিনি।’
স্ত্রী বলল, ‘বাহ!’
আমি খুশি হলাম। সে একটু থামল। তারপর বলল, ‘কিন্তু তুমি যে কথাটা বলতে চেয়েছিলে, সেটা কী?’
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।
এই পৃথিবীতে মানুষকে কিন্তু বলা থেকে বিরত রাখা কঠিন। আর নিজের কিন্তু গিলে ফেলা আরও কঠিন।



