প্রয়াণদিনে ফররুখ আহমদ স্মরণ
আঁধারের মাঝি থেকে ভোরের পাঞ্জেরী

সংগৃহীত ছবি
বাংলা সাহিত্যে ফররুখ আহমদ এক বিরল প্রতিভার নাম। তাকে নিয়ে পাঠকসমাজ আজও মূলত দুই ধারায় বিভক্ত। একদল তাকে ‘পাকিস্তানপন্থী’ পরিচয়ে ছোট করে তার কাব্যকৃতিকে উপেক্ষা করে; আরেক দল তাকে ‘মুসলিম রেনেসাঁর আঁধারের মাঝি থেকে ভোরের উত্তরাধিকারী বা অনুসারী ভাবেন, কেউ মনে করেন কবিতায় তিনি নজরুলকেও ছাড়িয়ে গেছেন(!); আবার কেউ বলেন, দুজনের তুলনাই আদতে বৃথা।
ফররুখ নিজেও নজরুল প্রসঙ্গে কম বিচার করেননি; তিনি কোথাও নজরুলের ‘অদম্য ভাবাবেগ’, ‘শব্দচয়নের দুর্বলতা’, ‘অগভীর জীবনবোধ’ ও ‘দার্শনিক দৃষ্টির অভাব’-এর কথা বলেছেন, আবার স্বীকার করেছেন— ‘পলাশীর যুদ্ধের পর নজরুল ইসলাম বাঙালি মুসলমানের জাগরণের প্রথম কবি’। তিনি ইকবালকে ‘মহাকবি’ বলে মান্য করেছেন, ‘সাত সাগরের মাঝি’ উৎসর্গ করেছেন ইকবালের স্মৃতির উদ্দেশে। কিন্তু এসব টানাপড়েন ও বিতর্কের ঊর্ধ্বে গিয়ে ফররুখকে পড়তে হবে তার কবিতারই আলোয়।
ফররুখ আহমদের জন্ম ১৯১৮ সালের ১০ জুন মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার মাঝআইল গ্রামে। বাবা সৈয়দ হাতেম আলী ছিলেন পুলিশ ইন্সপেক্টর, মা রওশন আখতার। গ্রামের পাঠশালায় হাতেখড়ি, পরে কলকাতার তালতলা মডেল এমই স্কুল ও বালিগঞ্জ সরকারি হাই স্কুলে পড়াশোনা; ১৯৩৭ সালে খুলনা জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক, ১৯৩৯ সালে রিপন কলেজ থেকে আইএ পাস করে স্কটিশ চার্চ কলেজে দর্শন ও ইংরেজি সাহিত্যে অনার্সে ভর্তি হন, কিন্তু পরীক্ষা না দিয়েই কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। ছাত্রাবস্থায় এম এন রায়ের র্যাডিক্যাল মানবতাবাদে আকৃষ্ট হয়ে বামপন্থী রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন; চল্লিশের দশকে তার রাজনৈতিক বিশ্বাসে পরিবর্তন আসে, তিনি পাকিস্তান আন্দোলন ও মুসলিম রেনেসাঁর সমর্থক হয়ে ওঠেন। এই রাজনৈতিক পরিচয় তার জীবনের একটি বাস্তব অধ্যায়, কিন্তু সেই পরিচয়ই তার সমগ্র সাহিত্যকে ব্যাখ্যা করার একমাত্র চাবিকাঠি নয়।
সাহিত্যিক জীবন শুরু কিশোর বয়সে কবিতা রচনার মধ্য দিয়ে। ১৯৪৩ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে ‘লাশ’ কবিতা লিখে তিনি প্রথম খ্যাতি অর্জন করেন। এই কবিতায় দুর্ভিক্ষের নির্মম বাস্তবতা ধরা পড়ে— ‘যেখানে পথের পাশে মুখ গুঁজে প’ড়ে আছে জমিনের ’পর; / সন্ধ্যার জনতা জানি কোনদিন রাখেনা সে মৃতের খবর’। এই পঙক্তি প্রমাণ করে, ফররুখ কেবল ‘মুসলিম রেনেসাঁর কবি’ নন— তিনি সেই কবিও, যিনি পথের পাশে পড়ে থাকা মৃতদেহের খবর রাখেন। তার প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘সাত সাগরের মাঝি’ (১৯৪৪)। এর অন্তর্গত ‘পাঞ্জেরী’ কবিতার ‘রাত পোহাবার কত দেরী পাঞ্জেরী? / এখনো তোমার আসমান ভরা মেঘে? / সেতারা, হেলাল এখনো ওঠেনি জেগে?’— এই প্রশ্ন ব্যক্তির নয়, একটি জনসমাজের দীর্ঘ প্রতীক্ষার স্বর। ফররুখের কবিতায় ধর্মীয় প্রতীক ও রূপক বাহ্যিক আড়ম্বর নয়; তা আত্মসন্ধান, ঐতিহাসিক স্মৃতি ও ভবিষ্যৎ-প্রত্যাশার ভাষা।
রাজনৈতিকভাবে তিনি পাকিস্তান আন্দোলনের সমর্থক ছিলেন, কিন্তু বাংলা ভাষার অধিকারে তার অবস্থান ছিল স্পষ্ট ও সাহসী। ১৯৪৭ সালের পর ‘সওগাত’ পত্রিকায় ‘পাকিস্তান: রাষ্ট্রভাষা ও সাহিত্য’ প্রবন্ধে তিনি লেখেন— ‘গণতান্ত্রিক বিচারে যেখানে সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা হওয়া উচিত, সেখানে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষাকে পর্যন্ত যারা অন্য একটি প্রাদেশিক ভাষায় রূপান্তরিত করতে চান তাঁদের উদ্দেশ্য অসৎ।’ ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয় অংশ নেন; রেডিওতে কর্মরত শিল্পী আলতাফ মাহমুদ, আব্দুল আহাদ, আব্দুল হালিম চৌধুরীদের নিয়ে ধর্মঘটে যোগ দেন। ভাষা আন্দোলন নিয়ে তার ‘মধুর চেয়েও মধুর যে ভাই আমার দেশের ভাষা’ গানটি জনপ্রিয় হয়। পাকিস্তানি শাসকদের ব্যঙ্গ করে তিনি ‘রাজ-রাজড়া’ নাটক লেখেন, যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মঞ্চায়িত হয় এবং এতে অভিনয় করেন মুনীর চৌধুরী। এসব কারণেই তাকে ভাষা আন্দোলনের প্রথম সারির একজন সৈনিক বলা যায়।
কাব্যরূপের বিচারেও তিনি দক্ষ কারিগর। ‘হাতেম তায়ী’ (১৯৬৬) তার মহাকাব্যিক প্রয়াস— যেখানে ইসলামী দানশীলতা, উদারতা ও সামাজিক ন্যায়ের থিম উচ্চারিত। ‘নৌফেল ও হাতেম’ (১৯৬১) কাব্যনাট্যে ক্ষমতালোভী নৌফেলের সঙ্গে মানবতাবাদী হাতেমের দ্বন্দ্ব চিত্রিত। ‘মুহূর্তের কবিতা’ (১৯৬৩) তার সনেটসংকলন; বাংলা সাহিত্যে মাইকেলের পরে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে এত সফল সনেট আর কেউ লেখেননি বলে অনেকে মনে করেন। শিশুসাহিত্যেও তিনি অতুলনীয়— ‘পাখির বাসা’, ‘হরফের ছড়া’, ‘চাঁদের আসর’ প্রভৃতি তার বিচিত্র প্রতিভার সাক্ষ্য। আরবি-ফারসি শব্দ তার কাছে শুধু অলংকার নয়, এক সাংস্কৃতিক স্মৃতি; সেই স্মৃতিকে তিনি বাংলা ভাষার নিজস্ব ছন্দ ও মর্মবস্তুর সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছেন। কলকাতার ২০ কর্নেল বিশ্বাস রোডের আড্ডায় ফররুখ আহমদ, আবু রুশদ, শওকত ওসমান, আহসান হাবীব, আবুল হোসেন, গোলাম কুদ্দুস প্রমুখ ‘আধুনিক’ কবি-সাহিত্যিকরা বাংলা সাহিত্যে মুসলমানদের মধ্যে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তি স্থাপন করেন; সেই গোষ্ঠীর সেরা কবি ছিলেন ফররুখ আহমদ। আবদুল কাদির ‘নবীন কবি ফররুখ আহমদ’ প্রবন্ধে তাকে ‘বাংলার নবীন মুসলমান কবিদের মধ্যে নিঃসন্দেহে সর্বশ্রেষ্ঠ’ বলেছেন।
তবে রাজনৈতিক বিতর্কও তাকে ছায়া করেছে। শওকত ওসমানের স্মৃতিতে ‘কানমে বিড়ি মুমে পান / লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ স্লোগানের মালিকানা নিয়ে বিতর্ক আছে। আবদুল হক বলেছেন, ফররুখ ‘একান্তভাবে পাকিস্তান আন্দোলনের সৃষ্টি’, তবে আন্দোলনের ‘যাবতীয় তাৎপর্য সম্বন্ধে তিনি সচেতন ছিলেন’ বলা কঠিন। ১৯৭১-এ স্বাধীনতার পর কেউ তাকে প্রশ্ন করলে তিনি বলেছিলেন— ‘আমার ব্যক্তিগত খুশি-অখুশিতে কী আসে যায়! আমি আগে যা ভাবতাম, এখনো তাই ভাবি। আমি মুসলমান, এ কথাটাই আমার কাছে বড়।’ আবার আবু রুশদ জানিয়েছেন, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকার তার প্রতি অনুদার ছিল না; তাকে চাকরিতে বহাল রাখা হয়, ফ্ল্যাট বরাদ্দ ছিল, এমনকি পরে দুটি সর্বোচ্চ সাহিত্যিক পুরস্কারও দেওয়া হয়। এসব বৈপরীত্য না দেখে ফররুখকে বিচার করা অসম্পূর্ণ। সৈয়দ হাসান ইমামের স্মৃতিচারণা থেকে জানা যায়, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বেতারের পদ থেকে তাকে চ্যুত করতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অনেকে বঙ্গবন্ধুর কাছে গেলে, বঙ্গবন্ধু, ‘এত বড় কবি, থাক উনি ওনার মতোন’, বলে এড়িয়ে যান। ওনাকে অসম্মান করার মুক্তিযোদ্ধাদের পরিকল্পনায় শেখ মুজিব সায় দেননি।
জীবনের শেষ পর্বে দারিদ্র্য, চিকিৎসার অভাব ও ব্যক্তিগত শোক তাকে গভীরভাবে আঘাত করে। বেতারের চাকরি শেষ হওয়ার পর তার ছেলে ডাক্তারি পড়া ছেড়ে দেয়, চিকিৎসার অভাবে মেয়ে মারা যায়; রমজানে না খেয়েই রোজা রাখেন, এমন কথা তিনি স্মৃতিচারণায় লিখেছেন। ১৯৭৪ সালের ১৯ অক্টোবর ঢাকায় তার মৃত্যু হয়; কোথায় দাফন করা হবে তা নিয়ে সমস্যা হলে কবি বেনজীর আহমদ নিজের পারিবারিক গোরস্তানে দাফনের জায়গা দেন। মৃত্যুর পর তিনি একুশে পদক (১৯৭৭) ও স্বাধীনতা পদক (১৯৮০) পান। কিন্তু পুরস্কারের আগেই তিনি বাংলা কবিতায় যে স্থায়ী আসন তৈরি করেছেন, তা কোনো স্বীকৃতির অপেক্ষা রাখে না। ফররুখ আহমদ রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে একজন কবি— যিনি অন্ধকারের মাঝি হয়ে ভোরের পাঞ্জেরীর প্রতীক্ষা করেছেন, দুর্ভিক্ষের লাশের পাশে দাঁড়িয়েছেন, ভাষার অধিকারে সোচ্চার হয়েছেন, আর আরবি-ফারসি ঐতিহ্যকে বাংলা কবিতার নিজস্ব প্রশ্বাস দান করে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। তাকে খণ্ডিতভাবে নয়, সামগ্রিকভাবে পড়লেই তার কাব্যপ্রতিভার সত্যিকার উচ্চতা প্রস্তুত পাঠকের চোখে ধরা পড়ে।
লেখক: সাহিত্য সম্পাদক, আগামীর সময়



