কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
দূরে গেলে দূরে থাকা হয় কাছে এলে কাছে

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী (১৯ অক্টোবর ১৯২৪ - ২৫ ডিসেম্বর ২০১৮)
কবিতার সঙ্গে বসবাস বললে নিজের সম্পর্কে খুব একটা বাড়িয়ে বলা হবে না। গান এবং কবিতা সমান মনোযোগ কেড়েছিলো আমার শৈশবেই। সে আমি অনেক লেখাতেই বলেছি।
বিখ্যাত কবিদের কবিতা আমি দু’চার লাইন বলতে পারবো। কিন্তু এমন অনেকে আছেন, বিখ্যাত, তবে ওঁর নামটিই প্রথমে আসবে না-তেমন কবির কবিতাও অনেক আছে, যা আমার স্মৃতিতে, সঙ্গে রয়েছে।
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী তেমনই একজন কবি। বাংলাদেশের ফরিদপুরের ছেলে। অথচ আমরা বলতে পারি না তিনি বাংলাদেশের কবি। দুর্ভাগ্যই বটে! দেশভাগ আমাদের মাটি কেড়ে নেয়নি। মানুষ কেড়ে নিয়েছে। দুই বাংলার ভাষা এক। ভাষা নিয়ে ভালোবাসা এক। এটুকুই কম কি? ধেড়ে খোকারা ভারত ভেঙে ভাগ করেছে সত্যি, তবে সত্যিকারের সাহিত্যের কোনো দেশকাল থাকতে নেই। পাবলো নেরুদাকে যেমন কাছের মানুষ মনে হয়, যখন তাঁর আত্মজীবনী ‘অনুস্মৃতি’ পড়েছি তেমনি জ্যাক লন্ডনের ‘সমুদ্রের স্বাদ’-এর স্বাদ নিতে একটুও অসুবিধে হয়নি। ওরহান পামুকের ‘ইস্তামবুল’ পড়ে আমি কতদিন যে ঘোরের মধ্যে ছিলাম, আর ‘দ্যা আলকেমিস্ট’! পাওলো কোয়েলহোর। তাঁরা কেউ-ই বাঙালি নন। বাংলাতেও লেখেননি। আমার যথাযথ ইংরেজি জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে আমি অবশ্য এসবই অনুবাদে পড়েছি। আর কতকত জায়গায় নিজেকে খুঁজে পেয়েছি! ওরা কেউ আমার সংস্কৃতির মানুষ নন, তবুও।
আজকে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীকে নিয়ে লিখতে বসেছি কবির কোনো কবিতা নিয়ে গাঢ় কোনো আলোচনার জন্য নয়।
আসলে এই জীবনে কত বিশিষ্টজনের, সংস্কৃতিজনের সঙ্গে পরিচয় ঘটেছে, গল্প হয়েছে সেসবই আমার পাঠকদের কাছে বলতে অনুরুদ্ধ হয়েছি। সেইরকমই একটি ঘটনা বলি। মনে আছে, কারণ এমন সুযোগ, অসাধারণ যোগ আমার মতো সাধারণের ভাগ্যে সব সময় ঘটে না! আমরা তখন নিউইয়র্ক শহরে থাকি। মাঝেঝাঝে আড্ডা হয় আমাদের বাসায়, হাসান ফেরদৌস ভাই-রানুভাবী, দুলুভাই-বেবীভাবী, শহীদ কাদরী-নীরা আপার বাসায়। কখনও মোমেনভাই-ডেইজিভাবীর বাসায়। কখনও আমার বড়বোন নীলু-আশরাফ ভাইয়ের আপস্টেট নিউইয়র্কের বাসায়।
নিউইয়র্কের ব্যস্ত জীবনে আমরা তখন ছুটির দিনের জন্য অধীর অপেক্ষা করতাম কোন দিন কোন বন্ধুর বাসায় আড্ডা হবে। সেদিন আড্ডাস্থল ছিলো হাসান ফেরদৌস ভাইদের বাসা। গিয়ে দেখি আড্ডাবাজরা প্রায় সবাই এসে হাজির। আড্ডা জমে ক্ষীর! মূল গল্পে যাওয়ার আগে একটু পেছন ফিরে দেখতে ইচ্ছে করছে। আমাদের ছাত্রজীবনে একটি বিশেষ কাণ্ড আমরা করতাম জন্মদিনগুলোতে।
বিশেষ করে আমরা যে পাঁচজন হরিহর-আত্মা বন্ধু ছিলাম। কী কাণ্ড করতাম? হয়তো আজকে আলম খোরশদের জন্মদিন, আমি স্মৃতি থেকে একটি কবিতা পড়ে আলম খোরশেদকে না- ওর প্রিয় অন্য বন্ধু প্রভা, মঞ্জুলি কিংবা ইকবালকে কবিতাপাঠটি উৎসর্গ করতাম। তেমনি গানের ক্ষেত্রেও হতো। ইকবালের জন্মদিনে হয়তো মঞ্জুলি আমাকে গান উৎসর্গ করতো! তো হাসান ফেরদৌস ভাইয়ের বাসায় সেদিন লেখক জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, পূরবী বসুসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন। মূল আকর্ষণ ছিলেন বিশিষ্ট কবি, কলকাতা থেকে আগত নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। সেদিন ছিলো জ্যোতিদার জন্মদিন। হঠাৎ মনে হলো ছাত্রজীবনের সেই খেলাটা (খেলা? খেলাই) এখানেও হতে পারে।
আমি জ্যোতিদাকে উদ্দেশ্য করে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর একটি কবিতা স্মৃতি থেকে আবৃত্তি করি। এটা আমার তরফ থেকে জ্যোতিদার জন্য ছিলো জন্মদিনের উপহার। সবাই বোধকরি একটু চমকে ছিলেন এমন যথাযথ একটি কাণ্ড ঘটানোর জন্য। কিন্তু সবচেয়ে বেশি বিস্মিত এবং আবেগাপ্লুত হয়েছিলেন কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী স্বয়ং।
আমি তখন এতই কবিতার খোঁজ-খবর রাখতাম এবং পড়তাম যে আমার স্মৃতিতে এমন অনেকের কবিতা জমা ছিলো। বন্ধুরা মিলে ম্যারিয়েটায় যেতাম স্টেডিয়ামের দোতলায়। হাক্বানী পাবলিশার্সে যেতাম, তোপখানা রোডে। কবিতার পাশাপাশি বুদ্ধদেব বসুর গদ্য আমার ভীষণ প্রিয় ছিলো বলে পুরো রচনাবলীই কেনা হয়ে গিয়েছিল।
আমাদের দুইবোনকে আব্বা ঈদের কাপড় কেনার টাকা দিয়েছিলেন বেশকিছু। আমরা গিয়ে বুদ্ধদেব বসুর ৮ খন্ড রচনাবলীই কিনে ফেলি সেই টাকা দিয়ে। নবম খণ্ড বেশ পরে প্রকাশিত হয়েছিল। যাই হোক, সেদিনের কথায় ফিরে যাই। ফিরে যাই সুদর্শন নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কাছে।
আমার কবিতা পাঠের পরে সেদিন কী চমৎকার করে আমাকে কাছে ডেকে বললেন, মেয়ে, আমি তো শক্তি-সুনীলের মতো কোনো পপুলার কবি না। এই দূর দেশে, অচেনা শহরে বসে তুমি স্মৃতি থেকে আমার কবিতা আবৃত্তি করলে, এ দারুণ বিস্ময়ের। শোনো কলকাতার আগামী অনুষ্ঠানে (কবিতাবিষয়ক আর্ন্তজাতিক কোনো সম্মেলন হবে বোধ করি, ভুলে গেছি) তুমি আমার আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে কবিতা পড়বে। হয়তো ওঁর কবিতা পাঠের কথাই বলেছিলেন। যাওয়া হয়নি। তবে কথাটি ভুলিনি। এরকম একটি স্মৃতি ভুলে যাওয়া সম্ভব! পাঠকদের সঙ্গে ভাগাভাগি করলাম। এসবই সুখস্মৃতি। আমরা তো জানি, কষ্ট ভাগ করলে কমে আর সুখভাগ করলে বাড়ে। এই আকালের দিনে একটু ভাগাভাগিতে বাড়ুক না একটু সুখ। কবিতার শিরোনামটি মনে নেই। স্মৃতি থেকে তুলে দিচ্ছি। ভুলে গেছি কোন্ কাব্যগ্রন্থে ছিলো, সে কথাও।
আশ্চর্য কবিতাটি ভুলিনি।
দূরে গেলে দূরে থাকা হয়
কাছে এলে কাছে
হারিয়েছি অনেক সময়
এখন যেটুকু বাকি আছে
সেইটুকু কাছাকাছি থাকি
হাতের ওপরে হাত রাখি
কাছে থেকে মুছে দিতে চাই
না থাকার ভয়
যেন বুঝি দূরে থাকাটাই
তোমার আমার পরাজয়
যেন বুঝি, যে বলেছে যাই
আসলে সে বলেনি কিছুই
ঘরে তার বাজেনি সানাই
উঠোনে ফোটেনি তার জুঁই
তাহলে যেওনা আর দূরে
তাহলে সকল বুক জুড়ে থাকো তুমি
চিরকাল থাকো
ভেঙে দাও ভুল
হৃদয়ে সুরের ছবি আঁকো
উঠোনে ফোটাও কিছু ফুল।






