রিভিউ
‘হাইপারপলিটিকস’ কেন বামদের নয়া পাঠ্য

ভার্চুয়াল ক্ষোভ দিয়ে কোনো পরিবর্তন হয় না। তবে অতিরাজনীতি অন্তত মানুষকে এটা বোঝাতে পারছে যে, রাজনীতি জিনিসটা ফেলে দেওয়ার মতো নয়
অ্যান্টন জেগার বই লিখছেন। বইয়ের নাম ‘হাইপারপলিটিকস’। নামটা শুনতে একটু শক্ত লাগে, কিন্তু বিষয়টা বেশ সরল। আবার জটিলও। সহজ কথায়— রাজনীতি আছে, উত্তাপ আছে, রাজপথে চিল্লাচিল্লি আছে, কিন্তু দিনশেষে আউটপুট শূন্য। কোনো ফলাফল নাই।
জেগার। বয়স মাত্র বত্রিশ। থাকেন অক্সফোর্ডে, পড়ান রাজনীতি। কিন্তু কথা বলছেন সারা পৃথিবীর রাজনীতি নিয়ে। বামপন্থীরা নাকি তার বই গোগ্রাসে গিলছে। দুনিয়ার প্রগতিশীলরা এখন হতাশ হওয়ার মতো নতুন তত্ত্ব খোঁজে। জেগার তাদের সেই তত্ত্বই বাটি চালান দিয়ে বের করে জোগান দিচ্ছেন।
তিনি ইতিহাসকে চার ভাগে ভাগ করেছেন। ভাগগুলো বুঝতে রকেট সায়েন্স জানা লাগে না।
১. একসময় ছিল গণরাজনীতির যুগ। মানুষ দল করত, ইউনিয়ন করত, ক্লাবে যেত, আবার আন্দোলনেও নামত। সেখান থেকে কিছু অর্জিতও হতো। রুটি-রুজির সমাধান হতো।
২. তারপর এলো উত্তর-রাজনীতি। মানুষ বলল, ‘আরে ভাই, রাজনীতি দিয়া কী হইব? চলো নাইট ক্লাবে যাই, ডিজে পার্টি করি।’ আমলারা দেশ চালাল, ইতিহাস থমকে গেল।
৩. তারপর ২০০৮-এর মন্দার পর এলো বিরোধী-রাজনীতি। মানুষের রাগ বাড়ল। ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ হলো, আরব বসন্ত হলো। লোকে ভাবল, এবার বুঝি পুরনো দলগুলোরে সাইজ করা যাবে!
৪. আর এখন চলছে হাইপারপলিটিকস বা অতিরাজনীতি।
এই অতিরাজনীতি জিনিসটা কী? জেগার বলছেন, এটা হলো এমন এক অবস্থা, যেখানে রাজনীতি নিয়ে উত্তেজনা তুঙ্গে, ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে পোস্টের বন্যা, রাজপথে হঠাৎ বিশাল ভিড় কিন্তু কোনো দল নেই, সংগঠন নেই, সদস্যপদ নেই। অনেকটা পাওলো জেরবাউডোর কথার মতো— ‘অঙ্গবিহীন শরীর’। শরীরে প্রচুর শক্তি আছে, কিন্তু পেটে হজম করার মেটাবলিজম নেই।
ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার বলেন আর ট্রাম্পের সমর্থকদের ক্যাপিটল হিল দখলই বলেন— ঘটনা ঘটে, ধামাকা হয়, কিন্তু পরদিন সকালে সবাই যার যার ঘরে ফিরে যায়। ক্ষমতার কাঠামো যা ছিল, তাই থেকে যায়। কোনো ভূখণ্ড দখল হয় না।
জেগারের মতে, মার্গারেট থ্যাচার আর রোনাল্ড রেগান যখন ইউনিয়নগুলোরে সাইজ করলেন, মানুষ সংগঠিত হওয়ার ক্ষমতাটাই হারাইয়া ফেলল। এখন মানুষ পডকাস্ট শোনে, টেলিগ্রাম গ্রুপে থাকে, কিন্তু কারও পকেটে রাজনৈতিক দলের মেম্বারশিপ কার্ড নেই।
ডানপন্থীরাও কিন্তু এ জায়গায় একইরকম অসংগঠিত। কিন্তু তাদের হাতে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার আছে। ইলন মাস্কের মতো লোক চাইলেই হাওয়া ঘুরিয়ে দিতে পারে। টাকা থাকলে সংগঠন না থাকলেও চলে। বামপন্থীদের তো টাকাও নেই, সংগঠনও নেই। তাদের আছে শুধু হাহুতাশ আর ডিজিটাল চিৎকার।
ট্রাম্পকে নিয়ে জেগার যা বললেন, সেটাও ভাবার মতো। প্রগতিশীলরা ট্রাম্পকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলে গালি দিয়ে নিজেদের বিশাল বীর ভাবে। জেগার বলছেন, ‘ভাই থামেন। আপনারা নিজেদের এত ক্ষমতাশালী ভাবিয়েন না। ট্রাম্পের উত্থান আপনার শক্তির কারণে না, লিবারেলদের ফালতু ব্যবস্থার দেউলিয়াপনার কারণে।’ এটাকে ফ্যাসিবাদ না বলে উনি বলছেন ‘বোনাপার্টিজম’— জোটবদ্ধ কোনো শক্তি ছাড়া কেবল ক্ষুব্ধ ও বিচ্ছিন্ন কিছু মানুয়ের সমর্থন নিয়ে টিকে থাকা।
বইয়ের সার-সংক্ষেপটা কী দাঁড়াল তাহলে?
আজকের দিনে সংগঠনে ঢুকতেই মানুষের অলসতা লাগে। কিন্তু বের হয়ে আসার হাজারটা অজুহাত রেডি। ভার্চুয়াল ক্ষোভ দিয়ে কোনো পরিবর্তন হয় না। তবে জেগার আশা ছাড়েন না। উনি মনে করেন, অতিরাজনীতি অন্তত মানুষকে এটা বোঝাতে পারছে যে, রাজনীতি জিনিসটা ফেলে দেওয়ার মতো নয়।
গল্পটা তো মন্দ নয়। তবে শেষ বিচারে, বই পড়ে বামপন্থীরা যদি ভাবেন সমাজ বদলে যাবে— তাহলে জেগারের বই পড়াটাই হবে আরেকটা ‘হাইপারপলিটিক্যাল’ ঘটনা! কথা কি ভুল বললাম?




