ঝরা পাতার সংসার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
এ সপ্তাহে ভলনোভাখা থেকে একটা ভালো খবর এসেছে। বাবা মারিউপোলে একটা চাকরি পেয়েছে। একটা আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা সংস্থার হয়ে গাড়ি চালাবে। বেতন অবিশ্বাস্য রকমের ভালো। দোনেৎস্কে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যা পেত, তার প্রায় তিন গুণ। ভাবা যায়?
তবে একটা সমস্যাও আছে। মারিউপোলে খরচ দোনেৎস্কের চেয়ে অনেক বেশি। বেতন যত ভালোই হোক, সংসার চালাতে যদি সবটাই উড়ে যায় তাহলে আর লাভ কী? দোনেৎস্কে আমাদের নিজেদের একটা ফ্ল্যাট ছিল। এখন বাবাকে ভাড়া বাসায় থাকতে হবে। আর কে না জানে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মারিউপোলে বাড়িভাড়া আকাশ ছুঁয়েছে।
মা এরইমধ্যে তার মুরগির খামার গুটিয়ে আনার কাজ শুরু করেছে। মুরগির বাচ্চাগুলো পাশের বাড়ির এক আন্টিকে দিয়ে দিয়েছে। আন্টির স্বামী মানুষটা খাটতেও পারেন! দুই সপ্তাহে যতবার তাকে দেখেছি, একবারও গায়ে জামা দেখিনি। মনে হতে পারে কোমরের ওপরে কোনো দিন সুতোর ছোঁয়াই লাগেনি! আমরা প্রথম আসার পর দাচার পেছনের উঠোনের মরচে ধরা লোহালক্করসহ যাবতীয় জঞ্জালের পাহাড় পরিষ্কার করতে বাবাকে সাহায্য করেছিলেন ভদ্রলোক। খাবার-দাবারেও বিশেষ আগ্রহ নেই তার। মাঝে মধ্যে একটু করে সস্তা ভদকা পেটে পড়লেই হলো, দিব্যি কাজ চালিয়ে যেতে পারেন। দাদু একবার বলেছিলেন, সরকার মদ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছিল বলেই সোভিয়েত ইউনিয়ন এত দ্রুত ভেঙে পড়েছিল। দেশের লোক নাকি শাসকদের এই ‘অপরাধ’ ক্ষমা করতে পারেনি। দাচার পাশের এই কর্মবীর আঙ্কেলকে দেখার পর দাদুর কথায় সন্দেহ করার কোনো কারণই আমি আর দেখছি না।
মা বড় হয়ে যাওয়া মুরগিগুলো একটা একটা করে বিক্রি করছে। এ থেকে তেমন একটা টাকাপয়সা আসছে না, কিন্তু অল্পসল্প হলেও কিছু জমানো যাচ্ছে। মারিউপোলের নতুন ফ্ল্যাটের জন্য কিছু টুকিটাকি জিনিস কিনতে হবে। মা বলছে, এমন অবস্থায় ওগুলো কিনতে বাবা কখনোই নিজের পকেট থেকে খরচ করতে রাজি হবে না। তাই নিজের জমানো টাকাই ভরসা মা’র জন্য।
ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া বাবাকেই যেখানে ড্রাইভারি করতে হচ্ছে, সেখানে মারিউপোলে মা ভালো বেতনের কোনো কাজ পাবে— তার আশা খুবই কম। মা বলছে, সামান্য কিছু টাকার জন্য বেকারিজাতীয় দোকানপাটে ঢোকার চেয়ে নিজের টুকটাক সেলাইয়ের কাজ চালিয়ে যাওয়াই ভালো। আমরা সবাই এ ব্যাপারে একমত।
কাতিয়া আর আমি মা’র জন্য একটা অনলাইন দোকান খোলার কথা ভাবছি। কোনো একটা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সাইটে করব সেটা। শুরুতে থাকবে শুধু ঘরের পোষা প্রাণীদের পোশাক। পাশাপাশি মা যেগুলো ভালো বানাতে পারে সেগুলোও থাকবে। প্রতিবন্ধী মানুষ বা প্রেগন্যান্ট মহিলাদের প্রয়োজন মতো বিশেষ ধরনের পোশাক, ব্যতিক্রমধর্মী বেবি ক্যারিয়ার আর র্যাপ বানাতে মার হাত বেশ ভালো। শাসা মারিউপোলের স্কুলে একটু মানিয়ে নিলে আর বাবার চাকরিটা শুরু হয়ে গেলে মা ব্যবসাটা এগিয়ে নিতে পারবে ধীরে ধীরে।
আজ ট্রেন স্টেশনে গিয়ে নববর্ষ আর বড়দিনের ছুটিতে মারিউপোল যাবার টিকিট কিনেছি। মন প্রাণ দিয়ে চাইছি, ততদিনে বাবা যেন মাকে নিয়ে সেখানে চলে যায়। ভলনোভাখায় গিয়ে তাদের সঙ্গে দেখা করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নাই আমার। দাচার ওই টয়লেটটার কথা মনে হলেই এখনো গা ঘিনঘিন করে।
ফেরার পথে একটা কসমেটিক্সের দোকান থেকে কাতিয়ার জন্য গিফট কার্ড কিনলাম। এটাই ওর বড়দিনের উপহার। কার্ডটা মাত্র কয়েক ডলারের। তবু উপহার তো!
আজ সেন্ট নিকোলাস ডে। কাতিয়া বড়দিনের কেনাকাটা করতে চেয়েছিল। আমি ওর সঙ্গে গেলাম। ঠিক করলাম, ফেরার পথে আমরা সেন্ট সোফিয়া’স স্কয়ারে ওকেলোর সঙ্গে চট করে একটু দেখা করে নেব। আগাম ক্রিসমাস আর নববর্ষের শুভেচ্ছা জানাব তাকে। ছুটির সময় আমরা কেউই কিয়েভে থাকছি না। ওকেলো যাচ্ছেন লন্ডনে, আর কাতিয়া যাবে রিভনেতে।
রিভনেতে থাকা পরিবার আর বয়ফ্রেন্ড মিকিতার জন্য রাজ্যের উপহারের পাশাপাশি আমার জন্য দারুণ একজোড়া গরম গ্লাভস কিনল কাতিয়া। জিনিসটা সত্যিই আমার খুব দরকার ছিল। তারপর পুরো বিকেলটা আমরা কাটালাম সাশার পছন্দের কিছু একটা খুঁজতে। শেষ পর্যন্ত কাতিয়া পেয়েও গেল জিনিসটা। শাখতার দোনেৎস্কের ২০ নম্বর লেখা জার্সি! পেছনে বড় করে লেখা ডগলাস কস্তা! কোচিং সেন্টারে পার্টটাইম কাজ করে কাতিয়া যা পায় তা থেকে এমন খরচ ও উৎসব-আনন্দে করতেই পারে।
এবার একটা গ্রিটিং কার্ডের দোকানে থেমে ওকেলোর জন্য একটা কার্ড নিলাম আমরা। কার্ডের সামনের দিকে তিনটা হলুদ রঙের মিনিয়ন চরিত্র দাঁত বের করে হাসছে। কাতিয়া আর আমি দুজনেই সই করলাম কার্ডে। তারপর ওকেলোর সঙ্গে দেখা করতে হাঁটা দিলাম সেন্ট সোফিয়া’স স্কয়ারের দিকে। বেশ অনেকটাই হাঁটতে হবে এখান থেকে।
সেন্ট সোফিয়া’স স্কয়ারের কাছে পৌঁছাতেই দেখলাম, মাঝখানে বিশাল ক্রিসমাস ট্রি। গাছটা জুড়ে ছড়িয়ে আছে চকচকে, বর্নিল তারার মতো দেখতে নানা সজ্জার জিনিস। পুরো স্কয়ারটাকে মনে হচ্ছিল শীতের রূপকথার জগৎ। মাথার ওপর নরম আলোর মালা ঝুলছে। এদিক-ওদিক আড়াআড়ি ছড়ানো বাতিগুলো ঝিকমিক করছে। মানুষজন মেতেছে হাসিঠাট্টায়। খাবার ও উপহারের স্টলগুলো থেকে ভেসে আসছে বড়দিনের গান। চারদিক ম ম করছে গ্রিল করা মাংস আর পেস্ট্রির ঘ্রাণে। তুলতুলে গোলাপি গালের বাচ্চারা ছুটছিল সেইসব দোকানের দিকে। ওদের মাথায় উজ্জ্বল রঙের শীতের টুপি।
ওকেলো মেসেজ করে জানালেন, কাছাকাছিই কোথাও আছেন। ভিড়ের মধ্যে চোখ চালিয়ে তাকে খুঁজতে লাগলাম। প্রথমে কাজটা বেশ কঠিনই মনে হচ্ছিল। এত মানুষ! তবে সত্যি কথা বলতে কী, গায়ের রঙের কারণে তাকে খুঁজে বের করা আসলে শেষ পর্যন্ত সহজই হয়েছিল। পরে কথাটা শুনে ওকেলো নিজেও হেসেছিলেন।
আমরা মাল্ড ওয়াইনের একটা স্টলের সামনে থামলাম। বড় পাত্রে মৃদু আঁচে ফুটছিল ওয়াইনটা। ছড়াচ্ছে লবঙ্গ আর দারুচিনির গন্ধ। তিনটা মাঝারি কাপ নিলাম আমরা। তারপর ওয়াইনে চুমুক দিতে দিতে স্কয়ারের এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি চলল। চলছিল গল্পও।
একটু পরেই খেয়াল করলাম, ওকেলো যথেষ্ট গরম কাপড় পরে আসেননি। তবে এমন ভাব করছিলেন যেন কোনো সমস্যাই হচ্ছে না। আসলে কিন্তু বোঝাই যাচ্ছিল যে তার ঠান্ডায় জমে যাওয়ার অবস্থা। আমরা জোর দিয়ে বললাম, জমে বরফ হতে না চাইলে তার উচিত এক্ষুণি বাড়ি ফেরা।
ওকেলোর ট্যাক্সি এসে গেল। উনি গাড়িতে উঠতে যাবেন, ঠিক এমন সময় কাতিয়া হাতে গ্রিটিংস কার্ডটা তুলে দিল। ওকেলো থেমে গেলেন। তিনটা হলুদ কার্টুন চরিত্র তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। কার্ডের ভেতরের কথাগুলো পড়লেন ওকেলো। ধীরে ধীরে তার মুখেও একটা হাসি ফুটল— নীরব, লাজুক গোছের একটা হাসি।
কার্ডের ভেতরে লেখা ছিল:
‘ইউ আর ওয়ান ইন আ মিলিয়ন!’
ঝরা পাতার সংসার
০৯ অক্টোবর ২০২৬




