ভ্রমণে মোশন সিকনেস এড়াবেন যেভাবে

সংগৃহীত ছবি
যেকোনও ভ্রমণ আনন্দের হলেও অনেকের জন্য সেটাই যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। চলন্ত বাস, ট্রেন কিংবা নৌকায় হঠাৎ মাথা ঘোরা কিংবা বমি ভাব শুরু হওয়া মোশন সিকনেস তথা ভ্রমণকালীন অসুস্থতার লক্ষণ। মজার বিষয় হলো, একই পরিবেশে কেউ প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়েন, আবার কেউ দিব্যি সুস্থ থাকেন। কেন এমন হয়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রত্যেক মানুষেরই এই সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা থাকে। তবে কার শরীর কতটা চাপ নিতে পারে তার ওপর ভিত্তি করেই এই ভিন্নতা দেখা দেয়। কারও জন্য হয়তো চলন্ত অবস্থায় মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকাই অসুস্থ হওয়ার জন্য যথেষ্ট। আবার কেউ হাজারো দুলুনির মধ্যেও থাকতে পারেন স্বাভাবিক।
মোশন সিকনেস একটি সাময়িক শারীরিক অবস্থা, যা মানুষকে দ্রুত অসুস্থ করে দেয়। সাধারণত বাস, ট্রেন, জাহাজ বা বিমানে ভ্রমণের সময় এটি বেশি দেখা যায়। এমনকি দোলনা বা নাগরদোলায় চড়লেও অনেকের একই অভিজ্ঞতা হয়। এর প্রধান লক্ষণগুলো হলো- মাথা ঘোরা এবং বমি বমি ভাব হওয়া। এছাড়া শরীর ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া ও অতিরিক্ত ঘামানোর মতো সমস্যা দেখা দেয়।
মানুষের শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করতে চোখ-কানের পাশাপাশি পেশিগুলো একযোগে কাজ করে। একে বলা হয় ইন্দ্রিয়গত সমন্বয়। যেমন না দেখে টাইপ করলেও আঙুল ঠিক জায়গায় পড়ে, কারণ পেশিগুলো জানে ঠিক কোথায় চাপ দিতে হবে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে একে বলা হয় প্রোপ্রিওসেপশন। চোখ যা দেখে এবং কানের ভেতরের ভারসাম্য রক্ষাকারী অঙ্গ যা অনুভব করে, সেসবের মধ্যে অমিল দেখা দিলেই মস্তিষ্ক বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। এ কারণেই মূলত স্নায়ুতন্ত্রে চাপ পড়ে এবং অসুস্থতা বোধ হয়।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি তিন জনের মধ্যে একজনের মোশন সিকনেস হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, মোশন সিকনেসের প্রায় ৭০ শতাংশ কারণ মানুষের জিনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। অর্থাৎ পরিবারে অভিভাবকদের এই সমস্যা থাকলে সন্তানদের মধ্যে এটি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
সাধারণত ৭-১২ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে এই সমস্যা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। তবে বয়স বৃদ্ধি হলে অনেকে এই সমস্যার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেন। নারীদের ক্ষেত্রে ঋতুচক্রের সময় কিংবা গর্ভাবস্থায় হরমোনের পরিবর্তনের কারণে এমন ঝুঁকি বেড়ে যায়। এমনকি বয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রেও এই সমস্যা ফিরে আসতে পারে। কারণ বয়সের সঙ্গে কানের ভেতরের গতি শনাক্তকারী সেন্সরগুলো দুর্বল হতে থাকে।
অনেকে আবার সোপাইট সিনড্রোম নামের এক বিশেষ সমস্যায় ভোগেন। এতে সরাসরি বমি না হলেও শরীরে চরম অবসাদ দেখা দেয় এবং মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় একঘেয়ে গতির মধ্যে থাকলে এই সমস্যায় বেশি আক্রান্ত হন নাবিক বা মহাকাশচারীরা।
মোশন সিকনেস যন্ত্রণাদায়ক হলেও কিছু সতর্কতা অবলম্বন করলে এর তীব্রতা কমানো সম্ভব। অনেকে মনে করেন, খালি পেটে থাকলে বমি হবে না। কিন্তু এটি একটি ভুল ধারণা। খালি পেটে ভ্রমণ করলে অসুস্থতা আরও বাড়তে পারে। তাই যাত্রার আগে হালকা কিছু খাবার খাওয়া উচিত। তবে অবশ্যই অতিরিক্ত ঝাল বা মসলাযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। এছাড়া ভ্রমণের সময় অ্যালকোহল পান করা মোটেও উচিত নয়। কারণ এটি শরীরকে পানিশূন্য করে দেয়।
ভ্রমণের সময় জানালার বাইরে কোনও স্থির বস্তুর দিকে তাকিয়ে থাকার চেষ্টা করুন। এতে কানের অনুভূতি ও চোখের দেখার মধ্যে সমন্বয় ঠিক থাকে। পরিবহনের ভেতরে সঠিক আসন নির্বাচন করাও খুব জরুরি। গাড়ির ক্ষেত্রে পেছনের আসনে বেছে না নিয়ে সামনের দিকে বসার চেষ্টা করুন। বিমানে ভ্রমণের সময় ডানার ওপরের দিকের আসন বেছে নিন, কারণ ওই অংশ স্থির থাকে বেশি। জাহাজে যাতায়াত করলে নিচের দিকের ডেক এবং জাহাজের মাঝখানের অংশ বেছে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
যদি ওষুধের প্রয়োজন হয় তাহলে অবশ্যই ভ্রমণের এক থেকে দুই ঘণ্টা আগে খেয়ে নিতে হবে। কারণ অসুস্থ হয়ে পড়ার পর ওষুধ সেবন করলে সেসব কার্যকর হয় না। প্রাকৃতিক উপাদান হিসেবে আদা খুব ভালো কাজ করে। আদার কুচি চিবিয়ে খেলে মস্তিষ্কের বমি সৃষ্টিকারী সংকেতগুলো বাধা পায়। এছাড়া জানালার খোলা বাতাস ও হালকা মেজাজের গান শুনলে এই অসুস্থতা প্রায় অর্ধেক কমে যেতে পারে।
কেউ চাইলে মস্তিষ্ককে এই পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে প্রশিক্ষণ দিতে পারেন, যাকে হ্যাবিচুয়েশন বলা হয়। যেমন চলন্ত গাড়িতে অল্প সময়ের জন্য বই পড়ার চেষ্টা করা এবং ধীরে ধীরে সেই সময় কাটানো। এভাবে বারবার চেষ্টার ফলে গতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে শেখে মস্তিষ্ক।
সঠিক পরিকল্পনা আর একটু সতর্কতা অবলম্বন করলে মোশন সিকনেস ভ্রমণের আনন্দ কেড়ে নিতে পারবে না। পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং সঙ্গে প্রয়োজনীয় ওষুধ কিংবা আদা রাখলে দুশ্চিন্তামুক্ত থাকা সগজ। সুস্থ মন আর সঠিক অভ্যাসই পারে দীর্ঘ ভ্রমণের প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করতে সাহায্য করতে।




