উচ্চশিক্ষায় বিদেশ গিয়ে ফেরে না ৭২ শতাংশ
- মেধাবীরা বিদেশ গিয়ে ফেরেন না আর
- ক্রমেই বাড়ছে না ফেরা শিক্ষার্থীর সংখ্যা
- দেশে নেই পর্যাপ্ত ল্যাব, ফান্ডিং বা গাইডেন্স
- উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাব দেশে

সংগৃহীত ছবি
দেশে পড়াশোনা শেষ করে ভিন্ন এক বাস্তবতার খোঁজে বিদেশে পাড়ি জমান অনেক তরুণ। কারও লক্ষ্য উচ্চশিক্ষা, কারও পেশাগত বিকাশ। কিন্তু এই যাত্রা অনেক সময় স্থায়ী হয়ে যায়— আর হয়ে ওঠে না ফিরে আসা।
নাফিস রহমান। ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে স্নাতক শেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের অস্টিন শহরে থাকছেন আড়াই বছর ধরে। তিনি বলেছেন, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করার আগ্রহ থেকেই তার বিদেশ যাওয়া। যুক্তি হিসেবে তিনি বলছিলেন, ‘বাংলাদেশে এই খাতে পড়াশোনা থাকলেও গবেষণার সুযোগ খুব সীমিত। বিশেষ করে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে গভীরভাবে কাজ করতে চাইলে পর্যাপ্ত ল্যাব, ফান্ডিং বা গাইডেন্স পাওয়া কঠিন। তাই বাইরে আসার সিদ্ধান্ত নিই।’
নাফিস মাস্টার্স করছেন অস্টিনের ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাসে। সাবজেক্ট ডাটা সায়েন্স। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি যুক্ত হয়েছেন একটি রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্টশিপে। ‘শুধু থিওরি নয়, এখানে ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত থেকে কাজ করার সুযোগ আছে। আমি এখন একটি গবেষণা দলের সঙ্গে মেশিন লার্নিং প্রজেক্টে কাজ করছি, পাশাপাশি একটি টেক কোম্পানিতে পার্টটাইম ইন্টার্নশিপও করছি। এতে একাডেমিক আর বাস্তব অভিজ্ঞতা দুটিই একসঙ্গে গড়ে উঠছে’— বলছিলেন তিনি।
নাফিসের মাস্টার্স শেষ হওয়ার কথা এ বছরই। দেশে ফেরার প্রসঙ্গ তুলতেই ‘এখনই না’ জানিয়ে তার ব্যাখ্যা— ‘এখানে যে ধরনের কাজের সুযোগ ও গবেষণার পরিবেশ পাচ্ছি, তার সঙ্গে এখনো দেশের বাস্তবতার বড় একটা পার্থক্য রয়েছে। তাই আপাতত যুক্তরাষ্ট্রেই থাকার কথা ভাবছি।’
নাফিসের মতো অনেক তরুণ এরকম চিন্তা করে শেষমেশ বিদেশেই থেকে যান। জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময়ই আলোচনায় আসে ‘রিভার্স ব্রেন ড্রেন’। অর্থাৎ মেধা পাচার নয়, বরং বিদেশে পড়াশোনা শেষে মেধাবীরা দেশে ফিরে এসে উন্নয়নে যুক্ত হবেন— এমন প্রত্যাশা করেন অনেকে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে মেধাবীদের দেশে ফিরে আসা বা তাদের ফিরিয়ে আনার সেরকম কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি।
বাংলাদেশ থেকে মেধা পাচার এখন ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে একটি গভীর কাঠামোগত সংকটে। অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ ও নীতিনির্ধারকদের মতে, এটি দীর্ঘমেয়াদে সরাসরি প্রভাব ফেলছে দেশের অর্থনীতি, গবেষণা ও উদ্ভাবনী সক্ষমতার ওপর।
ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড জাস্টিস (সিপিজে) ও বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশিপ সেন্টারের যৌথ উদ্যোগে ‘ইয়ুথ ম্যাটার্স সার্ভে-২০২৩’-এ ফেসবুকের মাধ্যমে ১৬ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ৫ হাজার ৬০৯ জন অংশগ্রহণকারীর ওপর জরিপ চালায়। এতে উঠে আসে, যুবসমাজের ৪২ দশমিক ৪ শতাংশ বিদেশে যেতে চান। কারণ হিসেবে দুর্নীতি, বেকারত্ব, অর্থনৈতিক সংকট, মুদ্রাস্ফীতি ও জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব বলা হয়। সমস্যাগুলো সমাধান করা গেলে ৮৫ দশমিক ৫ শতাংশ অংশগ্রহণকারী দেশে ফিরে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
ইউনেস্কোর ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে যাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের প্রায় ৭২ শতাংশ স্থায়ীভাবে থেকে যাচ্ছেন, ফিরছেন মাত্র ২৮ শতাংশ। একই বছরে প্রায় ৫২ হাজার ৭৯৯ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য বিভিন্ন দেশে গিয়েছেন। তাদের প্রধান গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি ও মালয়েশিয়া।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বেড়েছে সাত গুণ। ২০১১-১২ সালে ছিল ৩ হাজার ৩১৪ জন, ২০২৩-২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭ হাজার ৯৯ জনে। ‘ওপেন ডোরস ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টস ডেটা’ অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির হার বেড়েছে ২৬ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই প্রবণতা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে দেশে দক্ষ মানবসম্পদের বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ রহমানের কথায়, ‘বাংলাদেশে আমরা যে মানবসম্পদ তৈরি করছি, তার একটি বড় অংশ দেশের ভেতরে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। মেধাবীরা যদি ধারাবাহিকভাবে বাইরে চলে যায়, তাহলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।’
শিক্ষাবিদ ড. মুজিবুর রহমানের মতে, ‘মেধা পাচার কোনো এক দিনের সমস্যা নয়; এটি দীর্ঘদিনের নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার ফল। দেশে যদি মেধার মূল্যায়ন, স্বচ্ছ নিয়োগ এবং গবেষণার সুযোগ না বাড়ে, তাহলে এই প্রবণতা থামানো যাবে না।’
বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) প্রতি ব্যাচের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী বিদেশে চলে যান। তারা খুব কমই দেশে ফিরে আসেন। তাদের অনেকেই পরে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক হয়েছিলেন। তথ্য বলছে, ২০১২ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বুয়েটের ১১৮ জন শিক্ষক বিদেশে গেলেও ফিরেছেন মাত্র ৩৮ জন।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৩ জন শিক্ষক অবৈধভাবে দেশের বাইরে অবস্থান করছিলেন, পাশাপাশি ১০৩ জন শিক্ষক বিনা বেতনে বিদেশে ছিলেন। ২০১৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনুমতি ছাড়া বিদেশে অবস্থানের কারণে ৫২ জন শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করে।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশে অনেক ক্ষেত্রেই যোগ্যতার চেয়ে প্রভাব-প্রতিপত্তি বা স্বজনপ্রীতিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, যা মেধাবীদের মধ্যে হতাশা তৈরি করে। একই সঙ্গে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় সীমিত বিনিয়োগও বড় বাধা। বিশ্বের মধ্যে শিক্ষা খাতে বাংলাদেশে বিনিয়োগ তুলনামূলক খুবই কম। গত পাঁচ বছরে বাজেটের প্রায় ১২ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ হয়, আর জিডিপির মাত্র ০.৩ শতাংশ ব্যয় হয় গবেষণায়।
কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, তুলনামূলক কম বেতন এবং ক্যারিয়ার অনিশ্চয়তাও এ প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করছে। বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরামের সভাপতি মুহম্মদ সজীব প্রধান বলছিলেন, ‘আগামীর বাংলাদেশে বুদ্ধিবৃত্তিক সংকট আরও প্রকট হবে, যদি মেধা পাচারের এই হিড়িক থামানো না যায়৷’
পরিস্থিতি মোকাবিলায় করণীয় নিয়েও কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হানের মতে, ‘অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এমন বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করেন, যেগুলোর সঙ্গে দেশের চাকরির বাজারের চাহিদার বড় একটা অসামঞ্জস্য রয়েছে। ফলে পড়াশোনা শেষ করে তারা উপযুক্ত কাজ খুঁজে পান না।’
সমাধানের পথ হিসেবে তিনি যোগ করেন, ‘মেধা পাচার মোকাবিলায় অর্থনীতিকে আরও বহুমুখীকরণ করতে হবে। রপ্তানি খাত ও কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে নতুন প্রযুক্তি ও শিল্পোদ্যোগে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। বিদেশে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীরা যেন দেশে ফিরে আসেন, সে পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে।’
ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মূল্যায়ন, ‘বাংলাদেশে শিক্ষার মূল্য কমে গেছে। অর্থনৈতিক মূল্যের কাছে শিক্ষার মূল্য গৌণ হয়ে গেছে। শিক্ষা আমাদের অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা দিতে পারছে না, সম্মানও দিতে পারছে না। বেকারত্ব বাড়ছে। আমাদের উন্নয়নে কর্মসংস্থান বাড়েনি। পাশাপাশি শুধু অর্থ পাচার নয়, হয়েছে মেধারও পাচার। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণেই মেধাবীরা দেশ ছাড়ছে।’
মেধা পাচার রোধে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার বলে মনে করেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং শ্রম ও কর্মসংস্থানবিষয়ক মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তার মতে, ‘শ্রমিক অভিবাসন আর মেধাবীদের দেশত্যাগ এক বিষয় নয়। উচ্চশিক্ষিত মেধাবীরা দেশ ছেড়ে চলে গেলে দেশের ক্ষতি হয়, তাই তাদের জন্য দেশেই কর্মসংস্থান ও সুযোগ তৈরি করতে হবে।’
তিনি যোগ করেন, ‘দেশের মেধা যদি বিদেশেই থেকে যায়, তাহলে জাতীয় উন্নয়নে তার অবদান কীভাবে আসবে। তাই দ্রুত আমাদের এ বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।’




