বিসিএস ক্যাডারে ৬৭ শতাংশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
- রাবি, জাবি ও চবির ক্যাডার ১৮ শতাংশ
- দেশের সেরা মেধাবিতে এগিয়ে ঢাবি
- কোচিংসহ নানা সুবিধা বেশি
- ঢাকায় প্রাইভেটের শিক্ষা করপোরেটমুখী

সরকারি চাকরিতে সবচেয়ে বেশি প্রতিযোগিতা বিসিএস পরীক্ষায়। একটি পদের বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামেন গড়ে ৪৫৬ প্রার্থী। সেই দৌড়ে একক আধিপত্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি)। ক্যাডার হওয়ার দৌড়ে এ উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশপাশে নেই কেউ। সর্বশেষ ৪৯তম বিসিএসে সুপারিশ পাওয়া ৬৭ শতাংশই ঢাবির। বিপরীতে রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগর ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পেয়েছে ১৮ শতাংশ। সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সদ্য প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে মিলল এসব তথ্য।
প্রতিবেদনটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিভাগ হিসেবে বিসিএসে শীর্ষে ঢাকা, পিছিয়ে সিলেট। আর বয়সের পরিসংখ্যানে ২৪ থেকে ২৬ বছরের প্রার্থীরা দেখাচ্ছেন দাপট। সর্বশেষ চার বিসিএসে চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়া ৭ হাজার ৬৫১ জনের মধ্যে বয়স ৩০ ঊর্ধ্ব ৫ দশমিক ২ শতাংশ। বাকি সবার গণ্ডি ২৪ থেকে ২৬-এর মধ্যে।
সর্বশেষ ৪৯তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে ৬৬৮ জনকে চূড়ান্ত সুপারিশ করে পিএসসি। এর মধ্যে ৪৪৪ শিক্ষার্থী ঢাবির। এর বাইরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ৪৫, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ৩৮, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) আছেন ৩৮ জন। পুরনো এই তিন উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সুযোগ পাওয়ার হার ১৮ শতাংশ।
অন্যদিকে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) থেকে ১০, বুয়েটের ৯, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সুপারিশ পেয়েছেন আট শিক্ষার্থী। এভাবে দেশের ১৭১টি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলেও বিসিএসে এগিয়ে ঢাবিসহ ১০ থেকে ১২টি বিশ্ববিদ্যালয়।
বিসিএসে ঢাবির একচ্ছত্র আধিপত্যের পেছনে কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা আছে বলে মনে করেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ এবং প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। প্রথমত ঢাবিতে দেশের সেরা মেধাবী শিক্ষার্থীরা ভর্তি হন, যা স্বাভাবিকভাবেই এগিয়ে রাখে বিসিএসের মতো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায়। দ্বিতীয়ত ঢাবিতে গড়ে উঠেছে বিসিএসকেন্দ্রিক প্রস্তুতির দীর্ঘদিনের সংস্কৃতি। এ ছাড়া সিনিয়র-জুনিয়রদের মধ্যে নোট শেয়ার, গ্রুপ স্টাডি, মক টেস্ট— এসব গ্রুপভিত্তিক পরিবেশে হয়, যা ততটা শক্তিশালী হয়ে ওঠেনি অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে, যোগ করেন তিনি।
নগরায়ণ অন্যতম কারণ বলে উল্লেখ করলেন ঢাবির সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক ড. তৌহিদুল হক। তার মতে, প্রতিষ্ঠানটির পাঠদান, পরীক্ষা পদ্ধতি ও মূল্যায়ন প্রতিযোগিতামূলক হওয়ায় শিক্ষার্থীরা শুরু থেকেই বিশ্লেষণধর্মী চিন্তায় অভ্যস্ত হন, যা বিসিএসে এগিয়ে রাখে তাদের। এ ছাড়া রাজধানীকেন্দ্রিক সুযোগ-সুবিধা, কোচিং সেন্টার, লাইব্রেরি, তথ্যপ্রাপ্তি ও নেটওয়ার্কিংয়ের সুবিধা বেশি পান ঢাবির ছাত্র-ছাত্রীরা। বিপরীতে এসব সুবিধা থেকে অনেকটা বঞ্চিত দূরবর্তী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা, যা তাদের পিছিয়ে রাখছে প্রতিযোগিতায়।
শীর্ষে ঢাকা, পিছিয়ে সিলেট
সর্বশেষ চার বিসিএসে সুপারিশ পাওয়া ৭ হাজার ৬৫১ প্রার্থীর মধ্যে ঢাকা বিভাগের ১ হাজার ৫৬৫ জন। তালিকার দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে চট্টগ্রাম ও রাজশাহী। চতুর্থ অবস্থানে খুলনা, পঞ্চম রংপুর, ষষ্ঠ ময়মনসিংহ, সপ্তম বরিশাল। সবার পেছনে সিলেট বিভাগ। কিছুটা ব্যতিক্রম ছিল ৪৮তম বিশেষ (স্বাস্থ্য) বিসিএসে; চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে সুপারিশ পেয়েছিলেন সর্বোচ্চ ৭৭৮ জন।
সিলেট কেন তলানিতে
প্রবাসমুখী প্রবণতা এবং উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার ঝোঁক সিলেটে বিসিএসের প্রতি অনাগ্রহের মূল কারণ বলে মনে করছেন সমাজ বিজ্ঞানী ড. তৌহিদুল। সব অঞ্চলের মানুষের প্রাকৃতিক কিছু বিষয় থাকে; সিলেটে আছে প্রবাস প্রবণতা।
তরুণদের সাফল্য
পিএসসির বার্ষিক প্রতিবেদনের সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য প্রার্থীদের বয়স। বিসিএসে ২৪ থেকে ২৬ বছর বয়সীরা সবচেয়ে বেশি সফল। সর্বশেষ চারটি বিসিএসে এ গণ্ডি থেকে সুপারিশ পেয়েছেন ৩ হাজার ৮৮৪ জন।
বিপরীতে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর আন্দোলন চললেও সাফল্যের পরিসংখ্যানে ৩০ ঊর্ধ্ব নগণ্য। মোট সুপারিশপ্রাপ্তদের মধ্যে এই সংখ্যা ৫ দশমিক ২ শতাংশ।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও কেন পিছিয়ে
দেশে ১০৭টির বেশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন থাকলেও পাঠদানে আছে ১০৩টি। এসব উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ছেন ৩ লাখ ৫৮ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী, যা দেশের মোট শিক্ষার্থীর ৩০ শতাংশ। এর মধ্যে বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয় বা কোয়াককোয়ারেলি সায়মন্ডস (কিউএস) তালিকায় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে ছাড়িয়ে বাংলাদেশ অংশে শীর্ষস্থান দখল করেছে বেসরকারি নর্থ সাউথ। এ ছাড়া ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি, আমেরিকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (এআইইউবি), ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির মতো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অন্যতম।
এরপরও বিসিএসে পিছিয়ে কেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এর পেছনে প্রধান তিনটি কারণ চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রথমত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস মূলত করপোরেট জগৎ বা বিদেশের বাজারের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। বিসিএসের প্রথাগত সিলেবাসের সঙ্গে তাদের মিল নেই অ্যাকাডেমিক পড়াশোনার।
দ্বিতীয়ত করপোরেটমুখী মানসিকতা; শিক্ষার্থীদের বড় অংশের লক্ষ্য থাকে বহুজাতিক কোম্পানিতে চাকরি বা বিদেশগমন। সর্বশেষ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসায় তাদের কাছে সরকারি চাকরির নিরাপত্তার চেয়ে করপোরেট ক্যারিয়ারের দ্রুত প্রবৃদ্ধি বেশি আকর্ষণীয়।

