মহিষ নিয়ে যত কাণ্ড

ছবি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি
গায়ের রং গোলাপি, মাথায় সোনালি চুলের ঝুঁটি- দেখলে মনে হয় যেন কেউ মহিষের মুখে হলিউডের মেকআপ লাগিয়ে দিয়েছে। খামারমালিক জিয়াউদ্দিন মৃধার ছোট ভাই এই চুল দেখেই বলেছিলেন- ‘এটা তো একদম ট্রাম্প!’ নাম হয়ে গেল 'ডোনাল্ড ট্রাম্প'।
এরপরের ঘটনা তো সবার জানা।
বিরল অ্যালবিনো প্রজাতির গোলাপি রঙয়ের এই মহিষটি রাতারাতি আন্তর্জাতিক সেলিব্রিটি হয়ে যায়। দূর-দূরান্ত থেকে প্রতিদিন শত শত মানুষ ছুটে আসেন সেলফি তুলতে। রয়টার্স ছাড়াও ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট, টেলিগ্রাফ, ভারতের হিন্দুস্তান টাইমস- সবাই ছুটে গেল এই 'ভিআইপি' মহিষের সাক্ষাৎকার নিতে।
মহিষের ভাগ্যও হলো অদ্ভুত। প্রথমে বিক্রি হলো ৩ লাখ ৮৫ হাজার টাকায় কোরবানির জন্য। কিন্তু তখনই বাংলাদেশ সরকার তাকে কিনে নিয়ে ঢাকার মিরপুর জাতীয় চিড়িয়াখানায় রাখল।
কিন্তু ঘটনা এখানেই শেষ নয়। ২২ মে ইরানের এক দূতাবাস অফিশিয়াল এক্স অ্যাকাউন্টে পোস্ট করল: "বেচারা! ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তুলনার পর বাংলাদেশের মহিষটি মন খারাপ করে খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে।"
ঠিক সেই সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে তীব্র কূটনৈতিক উত্তেজনা চলছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মাথা চুলকালেন- এই কি সেই আধুনিক কূটনীতি, যেখানে একটি মহিষের ছবি দিয়ে দুই দেশের শত্রুতা প্রকাশ পায়?
বর্তমানে মহিষটি আছে সাভারের প্রাণী সম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটে। ১৪ থেকে ২১ দিনের মতো তাকে কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে।
শুধু এই ট্রাম্প মহিষই নয়। বিশ্ব জুড়ে মহিষকে নিয়ে ঘটেছে আজব সব ঘটনা।
থানায় হাজির ‘অভিমানী’ মহিষ ও তার মালিক
এবার আসা যাক আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের মধ্যপ্রদেশের একটি ঘটনায়। এক কৃষক থানায় হাজির হলেন এক অদ্ভুত অভিযোগ নিয়ে। তার অভিযোগ? তার পোষা মহিষটি তাকে দুধ দোয়াতে দিচ্ছে না! কৃষকের ধারণা ছিল, কেউ হয়তো মহিষটির ওপর কোনো জাদুটোনা করেছে। থানার পুলিশ অফিসাররাও দমে যাওয়ার পাত্র নন।
টাইমস অফ ইন্ডিয়া জানায়, পুলিশ পরে কৃষককে সান্ত্বনা দেন এবং পশু চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার কথা বললেন। মজার ব্যাপার হলো, পুলিশি হস্তক্ষেপে (নাকি চিকিৎসকের টোটকায়) দিন চারেক পর মহিষটি আবার শান্ত হয়ে দুধ দেওয়া শুরু করে। এরপর সেই কৃষক আবার থানায় গিয়ে পুলিশকে ধন্যবাদ জানিয়ে আসেন।
সুইমিং পুলে মহিষের ‘পুল পার্টি’
গরমের দিনে সুইমিং পুলে গা ভাসিয়ে আরাম করার শখ কার না থাকে! বিবিসির প্রতিবেদন বলছে, যুক্তরাজ্যের একটি বিলাসবহুল রিসোর্টের সুইমিং পুলে গভীর রাতে চুপিচুপি হানা দিয়েছিল এক দল মহিষ। ফার্ম থেকে পালিয়ে আসা এই মহিষগুলো রিসোর্টের নীল টলটলে পানির পুল দেখে লোভ সামলাতে পারেনি।
তারা সোজা পুলে নেমে রীতিমতো ‘পুল পার্টি’ শুরু করে দেয়। সকালে রিসোর্টের কর্মীরা এসে দেখেন, মানুষ নয়— এক দল মহিষ মনের সুখে পুলে সাঁতার কাটছে এবং পানি ছিটাচ্ছে। তাদের পুল থেকে তুলতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল উদ্ধারকারীদের।
মাতাল লোক, ঘুষি মারল মহিষকে- জবাবও পেল
২০২৪ সালের এপ্রিল মাস। যুক্তরাষ্ট্রের আইডাহো অঙ্গরাজ্যের ৪০ বছর বয়সী ক্লারেন্স ইয়োডার সপরিবারে ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্কে বেড়াতে এলেন। ভেতরে ঢোকার মাত্র সাত মাইল পর পার্কের নিয়ম হলো, মহিষের কাছ থেকে অন্তত ২৫ গজ দূরে থাকতে হবে। ইয়োডারের মনে হলো, এই নিয়ম বোধহয় তার জন্য নয়।
মদে চুর হয়ে তিনি এগিয়ে গেলেন মহিষের দলের দিকে এবং একটি মহিষকে লাথি মারলেন পায়ে।
সিবিএস নিউজ জানিয়েছে, মহিষটিও কোনো সভ্যতার ধার ধারেনি- সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা আক্রমণ করল। ইয়োডার সামান্য আহত হয়ে পার্ক রেঞ্জারদের হাতে ধরা পড়লেন। চারটি অভিযোগ- মদ্যপ হয়ে নিজের বিপদ ডেকে আনা, অশালীন আচরণ, বন্যপ্রাণীকে বিরক্ত করা এবং কাছে যাওয়া। পাঁচ হাজার ডলার জরিমানা ও ছয় মাসের জেলের ভয় দেখানো হলো।
এর সবচেয়ে মজার অংশ? যে গাড়িতে তিনি ছিলেন, সেই গাড়ির চালক ম্যাকেনা বাস মাতাল অবস্থায় গাড়ি চালাচ্ছিলেন এবং জরুরি আলো জ্বলা থাকলেও থামাননি- তাকেও গ্রেপ্তার করা হলো।
ইয়েলোস্টোন পার্কের সোশ্যাল মিডিয়া পেজের কিউরেটর জেন মিগনার্ড মন্তব্য করলেন: "অনেক বোকামো দেখেছি। কিন্তু এটা আমার তালিকায় ছিলই না।"
থাইল্যান্ডে মহিষের সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা
মানুষের মিস ওয়ার্ল্ড আছে, মহিষেরও সে অধিকার আছে- থাইল্যান্ড অন্তত তাই মনে করে। ব্যাংকক থেকে এক ঘণ্টার দূরত্বে চনবুরি শহরে প্রতি বছর চন্দ্র ক্যালেন্ডারের ১১তম মাসের শেষে বসে ঐতিহ্যবাহী মহিষ দৌড় উৎসব। আর সেই উৎসবের সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে রীতিমতো মহিষের সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা!
২০২৪ সালে একটি অ্যালবিনো থাই মহিষ একাধিক সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় জেতার পর ১ কোটি ৮০ লাখ থাই বাথ, অর্থাৎ প্রায় ৬ লাখ ৭২ হাজার মার্কিন ডলারে বিক্রি হয়। বাংলাদেশি টাকায় যা প্রায় সাড়ে সাত কোটি টাকা। যে দেশে একটি মহিষের দাম কয়েক হাজার টাকা, সেখানে সৌন্দর্যের জোরে একটি মহিষ কোটিপতি বানিয়ে দিল মালিককে।
পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে 'মহিষ' বলে গালি, অতঃপর
১৯৯৩ সালের এই ঘটনাটি আজও আলোচিত। পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইডেন জেকোবোউইৎজ রাত দুইটায় পড়াশুনা করছিলেন। নিচের তলার এক শোরগোলে বিরক্ত হয়ে জানালা থেকে চিৎকার করলেন: " শাটআপ ইউ বাফেলো" — মানে, 'চুপ করো, তোমরা মহিষের দল!'
সেই কারণে তার বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্ণবিদ্বেষ নীতি লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হলো। পুরো আমেরিকায় হইচই পড়ে গেল।
জেকোবোউইৎজ বললেন, হিব্রু ভাষায় 'বেহেমা' অর্থাৎ মহিষ শব্দটি বোকামানুষ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, এখানে জাতিগত কোনো ইঙ্গিত নেই। মামলা শেষ পর্যন্ত খারিজ হলো, কিন্তু 'ওয়াটার বাফেলো ইনসিডেন্ট' হয়ে উঠল আমেরিকায় 'পলিটিক্যাল করেক্টনেস' নিয়ে বিতর্কের এক ঐতিহাসিক দলিল।
একটি নিরীহ 'মহিষ' শব্দ কীভাবে একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে তোলপাড় করতে পারে, ১৯৯৩ সালের আমেরিকা তার প্রমাণ রেখে গেছে।
মহিষের এই কীর্তিকলাপ দেখলে বোঝা যায়, বিনোদন দিতে এরা মানুষের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। আপনার আশেপাশে কি এমন কোনো ‘মহিষের কাণ্ড’ জানা আছে?







