মজিদবাড়িয়া মসজিদে

মজিদবাড়িয়া শাহি মসজিদ
পটুয়াখালী শহর তখনো আড়মোড়া ভেঙে পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। চায়ের দোকানগুলোর শাটার তোলা হচ্ছে কেবল। এ সময়ই ইতিহাসের টানে বেরিয়ে পড়লাম মির্জাগঞ্জ উপজেলার প্রায় ছয় শতকের পুরনো মজিদবাড়িয়া শাহি মসজিদের উদ্দেশে।
অটোরিকশায় শহরের চৌরাস্তা হয়ে পৌঁছে গেলাম পায়রাকুঞ্জ ফেরিঘাটে। শহরের কোলাহল পেছনে ফেলে যত সামনে এগোচ্ছিলাম, ততই কংক্রিটের দালানের জায়গা দখল করে নিচ্ছিল বিস্তীর্ণ সবুজ ধানক্ষেত, ছোট ছোট খাল, তাল-নারকেল আর সুপারিগাছের সারি।
ঘাটে পৌঁছাতেই সামনে বিশাল পায়রা নদী। দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ এই নদী শুধু তার বিস্তৃত জলরাশির জন্য নয়; সুস্বাদু ‘পায়রার ইলিশ’-এর জন্যও দেশ জুড়ে খ্যাত। ফেরিতে উঠে দাঁড়াতেই মুখে এসে লাগল নদীর শীতল বাতাস। দূরে মাছধরা ট্রলার, কোথাও জেলেরা জাল গুছিয়ে নিচ্ছেন, আবার কোথাও ইলিশভর্তি নৌকা ঘাটের দিকে ফিরছে।
পায়রা নদী পার হয়ে আবার অটোরিকশায় উঠলাম। প্রায় ছয় কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছালাম সুবিদখালী বাজারে। ভাড়া নিল ২০ টাকা। মির্জাগঞ্জ উপজেলার প্রাণকেন্দ্রের এই বাজার থেকেই মজিদবাড়িয়া শাহি মসজিদে যাওয়ার জন্য মোটরসাইকেল ভাড়া করলাম ২২০ টাকায়। সামনে আরও প্রায় ১৫ কিলোমিটারের পথ।
মোটরসাইকেল ছুটে চলল গ্রামের আঁকাবাঁকা সড়ক ধরে। কোথাও পাকা ধানের ক্ষেত, কোথাও খালপাড়ে বাঁধা নৌকা, কোথাও তালগাছের ফাঁক দিয়ে দেখা মিলছে টিনের চালের ছোট ছোট বাড়ি। একসময় পৌঁছে গেলাম মজিদবাড়িয়া গ্রামে। দূর থেকেই চোখে পড়ল লালচে পোড়ামাটির ইটের তৈরি এক গম্বুজবিশিষ্ট প্রাচীন স্থাপনা। মসজিদের পাশে বিশাল দিঘি, চারদিকে পুরনো গাছ। স্থানীয়রা জানালেন, এই মসজিদের নাম থেকেই এই গ্রামের নাম হয়েছে মজিদবাড়িয়া। শুধু গ্রামই নয়, ইউনিয়নের নামও মজিদবাড়িয়া।
প্রায় সাড়ে পাঁচশ থেকে ছয়শ বছরের ইতিহাস বহনকারী এই মসজিদ বাংলার সুলতানি স্থাপত্যেরও এক অনন্য স্মারক। মসজিদের শিলালিপি থেকে জানা যায়, ১৪৬৫-৬৬ খ্রিস্টাব্দে সুলতান রুকনউদ্দিন বারবক শাহের শাসনামলে তার মন্ত্রী খান-ই-আজম উজায়ের খান এই এক গম্বুজের মসজিদটি নির্মাণ করেন। এই মুসলিম স্থাপত্যের ঐতিহাসিক মূল শিলালিপিটি আজ সংরক্ষিত রয়েছে কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটি জাদুঘরে।
ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর মগ-পর্তুগিজ জলদস্যুর উৎপাতে একসময়ের জনবহুল এই জনপদ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলে শতাব্দীর পর শতাব্দী তা রূপ নেয় গহিন অরণ্যে। বহু বছর মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা এই সুলতানি বিস্ময় ১৮৬০-এর দশকে ব্রিটিশ আমলে বন পরিষ্কারের সময় হঠাৎ আত্মপ্রকাশ করে। ১৯০৪ সালে বাকেরগঞ্জের তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নিকোলাস বিটসন-বেলের উদ্যোগে এটি সংস্কার করা হয়। লোকমুখে ‘মসজিদবাড়ি’ থেকে নাম দাঁড়িয়েছে ‘মজিদবাড়িয়া’।
প্রায় সাড়ে ছয় ফুট পুরু শক্ত প্রাচীরের ওপর দাঁড়িয়ে আছে চুন-সুরকি ও পোড়ামাটির ইটে তৈরি এই স্থাপনা। মূল বর্গাকার নামাজঘরের ওপর অর্ধগোলাকার সুবিশাল গম্বুজ, সামনের চৌচালা আকৃতির সুন্দর বারান্দা এবং মিনার ও মেহরাবের কারুকার্য দর্শনার্থীদের আজও মুগ্ধ করে। মসজিদের ঠিক পাশেই ছড়িয়ে আছে ইয়াকিন শাহ ও কালা শাহের মাজার এবং বিশাল এক দিঘি।
আজও এই ঐতিহাসিক মসজিদে নিয়মিত আজান ধ্বনিত হয়। দূর-দূরান্ত থেকে ইতিহাসপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুরাও আসেন পুরনো এই ইতিহাসের স্পর্শ পেতে। মসজিদ প্রাঙ্গণে কিছু সময় কাটিয়ে ফিরতি পথ ধরলাম।
যেভাবে যাবেন: ঢাকা থেকে বাসে পটুয়াখালী হয়ে কিংবা সরাসরি মির্জাগঞ্জ চলে যাবেন। সেখানকার সুবিদখালী বাজার থেকে অটোরিকশা বা মোটরসাইকেলে পৌঁছাবেন মজিদবাড়িয়া মসজিদে।







