বাবর আলীর মাকালু জয়ের মিশন

বাবর আলী
তীক্ষ্ণ, কালো, ভয়ংকর অথচ রহস্যময় এক পর্বত। পৃথিবীর পঞ্চম উচ্চতম শৃঙ্গ মাউন্ট মাকালু, আরোহীদের কাছে যেটি পরিচিত গ্রেট ব্ল্যাক ওয়ান নামে। যেন দূর আকাশে স্থির হয়ে থাকা এক বিশাল কালো পিরামিড। খাড়া ঢাল, উত্তাল বাতাস আর নির্দয় তুষারের রাজ্যে দাঁড়িয়ে থাকা এক অমানবিক পরীক্ষা। সেই পরীক্ষার মুখোমুখি হতে চলেছেন বাংলাদেশের পর্বতারোহণ ইতিহাসের অন্যতম সফল মুখ, বাবর আলী।বিশ্বে আট হাজার মিটার বা ততোধিক উচ্চতার পর্বত আছে মোট ১৪টি। এই ১৪টি পর্বতের চারটির চূড়ায় ইতোমধ্যেই নিজের পদচিহ্ন রেখে এসেছেন বাবর। এমন কৃতিত্ব আর কোনো বাংলাদেশির নেই। আর এবার তিনি পা ফেলতে চলেছেন তাঁর পঞ্চম আট-হাজারার মিশনে এক্সপিডিশন মাকালু: দ্য ফিফথ ফ্রন্টিয়ার। আয়োজন করেছে তারই পর্বতারোহণ ক্লাব ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স।
রবিবার ৫ মার্চ চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের হলরুমটি যেন মুহূর্তেই পরিণত হয়েছিল এক ক্ষুদে হিমালয়ে। সামনে বাবর, পাশে তার দল, আর দেয়ালে ঝুলন্ত মাকালুর ছবি। ক্লাব ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করছিলেন অভিযানের ব্যবস্থাপক ও ক্লাব সভাপতি ফরহান জামান। কথা বলেছেন উপদেষ্টা শিহাব উদ্দীন, পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান ভিজুয়াল নিটওয়ার্স লিমিটেডের এমডি আহমেদ নুর ফয়সাল। আরও সঙ্গে আছে স্যাম-বন্ড, মাই হেলথ, চন্দ্রবিন্দু প্রকাশন ও রহমান’স গ্রোসারিজ যারা এ অনুষ্ঠানের শেষ অংশে যখন বাবরের হাতে জাতীয় পতাকা তুলে দেওয়া হয়, তখন ক্ষণিকের জন্য হলেও মনে হচ্ছিল এই পতাকাই হয়তো মে মাসের তুষারমাখা কোনো ভোরে মাকালুর চূড়ায় উড়বে।বাবর সংবাদ সম্মেলনে বললেন ‘বিশ্বের ১৪টি আট হাজার মিটার পর্বত আরোহণের একটা সুতীব্র ও দীর্ঘ ইচ্ছা অনেকদিন ধরেই লালন করছি। মাকালু সে লক্ষ্যের দিকে আরেকটি দৃঢ় পদক্ষেপ।’ তাঁর ইচ্ছে ছিল এ বছর পাকিস্তানের কারাকোরাম হিমালয়ে অবস্থিত বিশ্বের নবম উচ্চতম শৃঙ্গ নাঙ্গা পর্বতের দিকে যাওয়া। কিন্তু অর্থের অপ্রতুলতা ও পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তের অস্থিরতার কারণে স্বপ্নের দিক মোড় নেয় মাকালুর দিকে।
মাকালুর খ্যাতি ভয়ংকর তার তীক্ষ্ণ ঢাল, ছুরি-ধার বাতাস আর চতুর্মুখী পিরামিড আকৃতির জন্য। এখানে প্রতিটি পদক্ষেপই যেন একটি নতুন পরীক্ষা। বাবরের ভাষায় ‘নতুন আর চ্যালেঞ্জিং কিছু করতে আমি সব সময়ই আনন্দ পাই।’
বাবরের পর্বতারোহণের যাত্রা শুরু ২০১৪ সালে। আর ট্রেকিং শুরু আরও আগে ২০১০ এ, চট্টগ্রামের পাহাড় বেয়ে বেয়ে। ২০১৭ সালে ভারতের উত্তরকাশীর নেহরু ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেনিয়ারিং থেকে মৌলিক প্রশিক্ষণ নেন তিনি। তারপর শুরু হয় বড় পর্বতগুলোর দিকে অগ্রযাত্রা ।
২০২২ — প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে আরোহণ করেন হিমালয়ের অন্যতম টেকনিক্যাল চূড়া আমা দাবলাম (২২,৩৪৯ ফুট)।
২০২৪ — একই অভিযানে আরোহণ করেন মাউন্ট এভারেস্ট (২৯,০৩৫ ফুট) ও মাউন্ট লোৎসে (২৭,৯৪০ ফুট)।
২০২৫ (এপ্রিল) — প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে আরোহণ অন্নপূর্ণা-১ (২৬,৫৪৫ ফুট)।
২০২৫ (সেপ্টেম্বর) — কৃত্রিম অক্সিজেন ছাড়া আরোহণ মানাসলু (২৬,৭৮১ ফুট)।
প্রথম কোনো বাংলাদেশি যিনি কৃত্রিম অক্সিজেন ছাড়া আট-হাজারার চূড়ায় উঠেছেন এখন তার সামনে দাঁড়িয়ে মাকালু ৮৪৮৫ মিটার (২৭,৮৩৮ ফুট)।
৭ এপ্রিল দেশ ছাড়বেন বাবর। কাঠমান্ডু থেকে যাবেন টুমলিংটার, তারপর দিনকয়েকের ট্রেকিং শেষে পৌঁছাবেন বেস ক্যাম্পে। সেখান থেকে শুরু হবে রোটেশন ক্লাইম্বিং উপরে ওঠা-নামার মাধ্যমে শরীরকে উচ্চতা সহনীয় করে তোলা।অভিযানের পুরো সময় লাগবে প্রায় এক মাসের বেশি। সবকিছু অনুকূলে থাকলে মে মাসের দ্বিতীয় বা তৃতীয় সপ্তাহেই হতে পারে চূড়ায় সফল আরোহণ। অভিযানের ব্যবস্থাপক ফরহান জামান জানালেন ‘মাকালু খুবই টেকনিক্যাল, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভুল এখানে জীবনঘাতী হয়ে উঠতে পারে। তবে বাবর প্রস্তুত।’
হিমালয়ের বাতাস কখনও কারও বন্ধু হয় না। রাতের শূন্যতার মধ্যে তুষার কাঁপিয়ে ওঠা ঝড়, দিনের আলোয় তীক্ষ্ণ বরফের সমুদ্রে হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত শরীরের বিরুদ্ধে লড়াই এই পথই এখন বাবরের সামনে।
কিন্তু একজন পর্বতারোহীর হৃদয়ের গভীরে লুকিয়ে থাকে এমন এক আকাঙ্ক্ষা যে স্বপ্ন পূরণের জন্য জীবনভর অপেক্ষা করা যায়। মাকালুর পথে বাবরের যাত্রা সেই স্বপ্নেরই আরেকটি ধাপ।
একদিন হয়তো গ্রেট ব্ল্যাক ওয়ানের চূড়ায় দাঁড়িয়ে বাবর আলী বাংলাদেশের পতাকাটি ছড়িয়ে দেবেন তুষারের বাতাসে আর হিমালয় আবারও সাক্ষী হবে মানুষের অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্পের।

