সবুজ পাহাড়ে আদিম পাড়া

আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা পেরিয়ে দূরে দেখা যাচ্ছে সুনসংপাড়া
মেঘের রাজ্যে চোখ জুড়ানো এক টুকরো স্বর্গ যেন সুনসংপাড়া। বান্দরবানের গহিন পাহাড়ে লুকিয়ে থাকা এই ছোট্ট, ছিমছাম গ্রামসহ কেওক্রাডং-বগা লেক ভ্রমণের গল্প লিখেছেন তৌহিদুল আজম মিশুক
সুনসংপাড়া যে আমাদের ভ্রমণের সবচেয়ে বড় বিস্ময় হয়ে উঠবে, তা কে জানত! অথচ মূল পরিকল্পনায় এই গন্তব্যের নামই ছিল না। সহকর্মী সাইদকে নিয়ে আমি যখন বর্ষায় বান্দরবানের রূপ দেখার ছক আঁকছিলাম, তখন ভাবনায় ছিল কেবল বগা লেক আর কেওক্রাডং।
বাসস্টেশনে আমাদের দুজনের সঙ্গে যোগ দিলেন আরও তিন ভ্রমণসঙ্গী আশিক ভাই, নাজিম ও কামরুজ্জামান। যাত্রার রাত মানে ২ জুলাই মনে হলো পুরো ঢাকা শহরই ঘরের মায়া ত্যাগ করে পাহাড়ে ছুটেছে। তীব্র যানজটের কবলে পড়ে আমাদের বাস নির্ধারিত সময়ের দুই ঘণ্টা বিলম্বে এলো। যখন বান্দরবান পৌঁছালাম, ঘড়ির কাঁটা অনেকটাই এগিয়ে গেছে। চটজলদি সকালের নাশতা সেরে চেপে বসলাম চাঁদের গাড়িতে। গন্তব্য বগা লেক।
পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ ধরে গাড়ি ছুটল। নিরাপত্তার স্বার্থে কয়েক জায়গায় নেমে আমাদের নাম ও জাতীয় পরিচয়পত্র এন্ট্রি করতে হলো। সুযোগ বুঝে আমরাও স্থানীয় বাজারের টাটকা ফলমূল আর হালকা নাশতা পেটে চালান করে দিলাম! অবশেষে পৌঁছালাম রুমা বাজার। সেখান থেকে সঙ্গে যোগ দিলেন আমাদের গাইড। চাঁদের গাড়ি আবার ছুটল বগা লেকের উদ্দেশে।
যতদূর চোখ যায়, শুধু নীল আর সবুজের ঢেউখেলানো পাহাড়ের সারি। মেঘের দল সেই পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে আলতো করে চুমু খেয়ে যাচ্ছে
গাড়ির উইন্ডশিল্ড দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে বুকটা ভরে উঠল। কী মসৃণ, কী চমৎকার পিচঢালা রাস্তা! স্মৃতির পাতায় তখন সজোরে কড়া নাড়ল ১৫ বছর আগের সেই বগা লেকযাত্রা। একটা কাঁচা, কর্দমাক্ত রাস্তা দিয়ে চাঁদের গাড়ি যতটুকু সম্ভব যেত, তারপর আর চাকা ঘুরত না। পায়ে হাঁটাই ভরসা। পাহাড়ি চড়াই-উতরাই ভেঙে প্রায় দুই-তিন ঘণ্টার সেই ক্লান্তিকর হাঁটাপথ আজ ইতিহাস। এখন কোনো কষ্টই নেই, সরাসরি চাঁদের গাড়িতে চড়ে পৌঁছে যাওয়া যায় বগা লেক এমনকি কেওক্রাডংয়ে।
বগা লেকে পা রাখার ঠিক আগে আমাদের দুপুরের খাবারের বিরতি হলো মুনলাইপাড়ার চুনচুম রেস্টুরেন্টে। পাহাড়ি মসলায় রান্না করা মজাদার সব খাবারের মধ্যে কাঁচা আমের ভর্তা যেন অমৃতের স্বাদ নিয়ে এলো! খাওয়া শেষে বগা লেকে রাতের আড্ডার রসদ হিসেবে মুনলাইপাড়া থেকে কিছু টাটকা ফলমূল কিনে আবার যাত্রা শুরু করলাম।
ভেবেছিলাম, বর্ষার রিনিঝিনি বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে বগা লেক যাব; কিন্তু প্রকৃতি আমাদের কপালে জুটিয়ে দিল কাঠফাটা রোদ্দুর আর অসম্ভব গরম।
বগা লেকে যখন পৌঁছালাম, ক্লান্তিতে সবার তখন ত্রাহি দশা! কিন্তু নীল জলের সেই সুবিশাল হ্রদ দেখামাত্রই জাদুমন্ত্রের মতো ক্লান্তি উধাও। ঝটপট পোশাক বদলে সবাই নেমে পড়লাম বগা লেকের শীতল জলে।
১৫ বছর আগে যখন প্রথম এখানে এসেছিলাম, থাকার জায়গা বলতে ছিল মাত্র দুটো কাঠের কটেজ। আর আজ? লেকের চারপাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য কটেজ ও রিসোর্ট। আধুনিক বাথরুমের সুব্যবস্থা, উন্নত পরিবেশ। তবে এই উন্নয়নের ভিড়ে বগা লেকের সেই আদিম, শান্ত ও নিরিবিলি পরিবেশটা কোথাও যেন হারিয়ে গেছে; পর্যটকের কোলাহলে আগের সেই নির্জনতা এখন খুঁজে পাওয়া ভার। তবুও বিকালের মরে আসা আলোয় যখন লেকের পাড়ে বসলাম, ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক আর পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা গোধূলির আলো আমাদের মুগ্ধ করল। রাতে তারার আলোর নিচে গল্প-গুজব আর পাহাড়ি খাবারে পেটপূজা সেরে আমরা দ্রুতই ঘুমিয়ে পড়লাম।
পরের দিন সকালে গাইডের ডাকে আমাদের ঘুম ভাঙল। কুয়াশা আর ভোরের আলো-আঁধারির মাঝে আবার চড়ে বসলাম চাঁদের গাড়িতে। বগা লেক থেকে কেওক্রাডং যাওয়ার রাস্তাটি যেন এক রোমাঞ্চকর রোলার কোস্টার! খাড়া উঁচু আর অতলান্তিক নিচু পথ পাড়ি দেওয়ার সময় আমাদের সবার বুক দুরুদুরু করছিল। কিন্তু কেওক্রাডংয়ের চূড়ায় পৌঁছানো মাত্রই প্রকৃতি তার রূপের ডালি মেলে ধরল। হঠাৎ করেই আবহাওয়া বদলে গেল। চারপাশে মেঘের ওড়াউড়ি আর এত তীব্র বাতাস যে চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকাই দায়! সেখানে স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে কিছু দারুণ ছবি ক্যামেরাবন্দি করে আমরা রওনা হলাম সুনসংপাড়ার দিকে।
এবার আমাদের চোখ ধাঁধিয়ে দিল সদ্য নির্মিত সীমান্ত সড়ক। রাস্তাটি একদম খাড়াভাবে নিচে নেমে গিয়ে পরক্ষণেই খাড়া দেয়ালের মতো উঁচুতে উঠে যায়। একেকটি হেয়ারপিন বাঁক যখন চাঁদের গাড়িটি পার হচ্ছিল, শিরদাঁড়া দিয়ে ভয়ের সঙ্গে সঙ্গে এক তীব্র রোমাঞ্চের স্রোত বয়ে যাচ্ছিল। পথে একটি ভিউ পয়েন্টে গাড়ির ব্রেক কষলেন চালক। যতদূর চোখ যায়, শুধু নীল আর সবুজের ঢেউখেলানো পাহাড়ের সারি। মেঘের দল সেই পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে আলতো করে চুমু খেয়ে যাচ্ছে। তারপর রোমাঞ্চকর উঁচু-নিচু পিচঢালা পথ পেরিয়ে আমরা প্রবেশ করলাম সুনসংপাড়ায়।
পা রাখতেই মন জুড়িয়ে গেল। এত পরিপাটি, সুন্দরভাবে সাজানো এই পাড়া! পাহাড়ের ঢালে ঢালে মাচাং ঘরগুলো পরম মমতায় দাঁড়িয়ে আছে। পাড়ার ভেতর দিয়ে হাঁটার সময় আমাদের চোখে পড়ল পাহাড়ের বুকেই তৈরি করা চমৎকার একটি বড় ফুটবল মাঠ, যেখানে হয়তো বিকালের আলোয় স্থানীয় তরুণরা মেতে ওঠেন খেলায়।
ফেরার পথে আমরা থামলাম সুনসংপাড়ার একমাত্র রিসোর্টে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পরিচালনা করা এই রিসোর্টে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিয়ে গেলাম আরেকটি ভিউ পয়েন্টে, যেখান থেকে পুরো উপত্যকার রূপ অন্য এক কোণ থেকে ধরা দিল।
সুনসংপাড়ার এই আদিম ও শান্ত রূপটি বগা লেকের বর্তমান বাণিজ্যিক রূপের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। এর মিল পাবেন ১০-১৫ বছর আগের বগা লেকের সঙ্গে। এই মায়াবী রূপ হৃদয়ে মেখে আমরা আবার কেওক্রাডং হয়ে বগা লেকের পথ ধরলাম।
যেভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে বাসে সরাসরি বান্দরবান। সেখান থেকে চাঁদের গাড়িতে বগা লেক। তারপর আবারও চাঁদের গাড়িতে কেওক্রাডং। সেখান থেকে আবারও চাঁদের গাড়িতে সুনসংপাড়া।





