মাকালুর চূড়ার দিকে তাকিয়ে বাবর

মাকালু জয় করলে এটা হবে বাবরের পঞ্চম আট হাজারি। ছবি: ভার্টিকেল ড্রিমারস
এপ্রিলের ১৩ তারিখ। হোয়াটসঅ্যাপ কলে হঠাৎ ভেসে উঠল একটি নাম, বাবর আলী। নামটি দেখে সত্যিই চমকে উঠেছিলাম। কারণ তিনি তখন বাংলাদেশের শহুরে ব্যস্ততায় নন, ছিলেন পৃথিবীর অন্যতম কঠিন এক পর্বতের কোলঘেঁষে। নেপালের মাকালু জয়ের অভিযানে নেমেছেন প্রিয় এই পর্বতারোহী।
ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো চনমনে কণ্ঠ। উচ্চতার ক্লান্তি, ঠান্ডা, দুর্ভোগ কিছুই যেন তাকে দমাতে পারেনি। জানালেন, আগের দিন ১২ এপ্রিল দুপুরে তিনি পৌঁছেছেন মাকালুর ৫ হাজার ৭০০ মিটার উচ্চতার অগ্রবর্তী বেস ক্যাম্পে। সেখান থেকেই শুরু হবে আসল লড়াই। এখন শরীরকে পাতলা বাতাসের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। ওপরে উঠবেন, আবার নিচে নামবেন। শরীরকে ধাপে ধাপে অভ্যস্ত করে তারপরই শুরু হবে চূড়ান্ত শিখর আক্রমণ।
কথার ফাঁকে জানালেন, ছয় সদস্যের আন্তর্জাতিক দলে তিনি ছাড়াও আছেন রাশিয়া, ইউক্রেন ও দক্ষিণ আফ্রিকার একজন করে আরোহী, সঙ্গে ফ্রান্সের দুজন। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা মানুষ, কিন্তু সবার চোখ এক শৃঙ্গের দিকে। টিম লিডার বাবর। অবাক কাণ্ড রুশ ভাষাভাষী দুইজনের একজন রাশিয়ার, অন্যজন ইউক্রেনের—যাদের দেশের মধ্যে যুদ্ধ চলছে—তাদেরও সেখানে পাশাপাশি বসে চা খেতে দেখা গেছে। পাহাড় মানুষকে ছোট করে দেয়, সীমান্তকে আরও ছোট।
বাবরের পঞ্চম আট-হাজারি মিশনের নাম এক্সপিডিশন মাকালু: দ্য ফিফথ ফ্রন্টিয়ার। আয়োজন করেছে তারই পর্বতারোহণ ক্লাব ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স।
তারপর আর বাবর আলীর সঙ্গে কথা হয়নি। তবে তার খবর থেমে থাকেনি। সামাজিক মাধ্যমে নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে তাঁর লেখা ‘মাকালু ডায়েরি’। সেই দিনলিপিতে শুধু এক অভিযানের অগ্রগতি নয়, ধরা পড়ছে হিমালয়ের কঠিন সৌন্দর্য, মানুষের মন, ক্লান্তি, রসিকতা, ভয়, সাহস আর বেঁচে থাকার গভীর অনুভূতি।
ডায়েরির প্রথম দিকের পাতাগুলোতে দেখা যায়, তিনি তখনো মূল আরোহনপথে ওঠেননি। পথ চলছে ডোবাটে, মুম্বুক, ইয়াংলে খারকা হয়ে। এক পাহাড়ি লজে দশ মাস বয়সী ডোলমা শেরপা নামের শিশুকে দেখে বিস্মিত হয়েছেন তিনি। এত উঁচুতে, এমন নির্জন পরিবেশে, অথচ শিশুটি নাকি একবারও কাঁদেনি। বাবর আলীর মনে হয়েছে, পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ কোনোদিন ৩ হাজার ৮০০ মিটার উচ্চতায় ওঠার সুযোগও পাবে না, আর এই শিশুর জন্মই যেন মেঘের দেশে।
পথে নেমেছে তুষার। কোথাও রডোডেনড্রনের লাল ফুল, কোথাও গোলাপি ফুল দেখে থমকে যাওয়া। কোথাও পাইন বন, কোথাও বরুণ নদীর গর্জন। তিনি লিখেছেন, নদীটি যেন মাকালুর বুক চিরে নেমে আসা এক বুনো স্রোত। কালো পাথরের ফাঁক দিয়ে নীলাভ জল ছুটছে। নদীর শব্দ এত প্রবল, পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলাও দায়।
ফেমাতাং নামের এক স্থানে গিয়ে দেখেছেন আগুনে পুড়ে যাওয়া একটি লজের ধ্বংসাবশেষ। কয়েক মাস আগের আগুনের ক্ষত তখনো চারদিকে ছড়িয়ে। পুড়ে গেছে পাশের বাঁধাকপির ক্ষেতও। হিমালয়ের রূপ যত সুন্দর, জীবনযাপন ততই অনিশ্চিত, ডায়েরির এমন ছোট ছোট বর্ণনায় তা স্পষ্ট।
ইয়াংলে খারকায় পৌঁছে তিনি যেন কিছুটা স্বস্তি পেয়েছিলেন। সেখানে একটিমাত্র লজ, কিছু ইয়াকপালকের কুটির, ছোট দুটি বৌদ্ধ উপাসনালয়। একটির তালা নাকি বুদ্ধের মুখাবয়বের মতো, কপালের মাঝখানে চাবি ঢোকানোর জায়গা। এমন সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণই বাবর আলীর লেখাকে আলাদা করে।
সেখানে বসেই তিনি দেখেছেন মালবাহকদের ক্যারম খেলা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলা সেই খেলায় তাদের দক্ষতায় মুগ্ধ হয়েছেন। পাহাড়ের কঠিন জীবনের মাঝেও মানুষ কী সহজে আনন্দ খুঁজে নেয়, সেই দৃশ্য যেন তার মনে দাগ কেটেছে।
আরেক রাতে আগুন ঘিরে বসে শুনেছেন রুশ আরোহী কনস্ট্যান্টিনের অভিজ্ঞতা। পামির পর্বতমালার পিক লেনিনে ভয়াবহ ক্লান্তির মধ্যে নাকি তার মনে হয়েছিল, সে একা নয়, বিশাল এক দলের সঙ্গে হাঁটছে। এমনকি নিজের ব্যাগটিও অন্য কারও মনে হয়েছিল। অতিরিক্ত ক্লান্তি আর উচ্চতার কারণে এমন বিভ্রমের কথা পরে অন্য আরোহীরাও নাকি স্বীকার করেছেন।
হিমালয়ের পূর্ব প্রান্তে, নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে দাঁড়িয়ে আছে এক তীক্ষ্ণ, কালো, ভীতিপ্রদ পর্বত। দূর থেকে তাকে দেখলে মনে হয় বরফের সাগরের মাঝখানে কেউ যেন আকাশ ছুঁয়ে দেওয়া এক কৃষ্ণ পিরামিড বসিয়ে দিয়েছে। সেটিই মাকালু—পৃথিবীর পঞ্চম উচ্চতম শৃঙ্গ, উচ্চতা ৮,৪৮৫ মিটার। পর্বতারোহীদের কাছে যার আরেক নাম “মহা কালো এক”।
এভারেস্টের নাম সবাই জানে, কিন্তু অভিজ্ঞ পর্বতারোহীদের কাছে মাকালু আলাদা ভয়ের নাম। কারণ এখানে শুধু উচ্চতা নয়, আছে খাড়া ঢাল, পাথুরে দেয়াল, অনিশ্চিত আবহাওয়া, তীব্র বাতাস এবং দীর্ঘ প্রযুক্তিনির্ভর আরোহনপথ। অনেক পর্বতারোহী বলেন, এভারেস্টে মানুষের ভিড় আছে, মানাসলুতে বাণিজ্যিক আয়োজন আছে, কিন্তু মাকালু এখনো অনেকটাই বন্য। এখানে পাহাড় এখনো মানুষের সঙ্গে আপস করেনি।
১৯৫৫ সালে প্রথম ফরাসি দল মাকালুর চূড়ায় ওঠে। সেই থেকেই একে অনেকে “ফরাসি পর্বত” বলেও ডাকেন। আজও ইউরোপীয় আরোহীদের কাছে এটি স্বপ্নের শৃঙ্গ।
আবার ফিরে আসি বাবর আলীর কাছে। পরের দিনগুলোতে পথ আরও কঠিন হয়েছে। টাডোসা, লাংমালে খারকা পেরিয়ে ধীরে ধীরে বড় গাছ হারিয়ে গেছে। মাটি উধাও হয়ে চারপাশে শুধু পাথর আর পাথর। বোল্ডারের ফাঁক দিয়ে এগোতে হয়েছে। বড় পাথরের ওপর ছোট পাথর সাজিয়ে বানানো পথচিহ্ন দেখে পথ চিনতে হয়েছে।
লাংমালে খারকায় এক বাদামি কুকুরের কথা লিখেছেন তিনি। কুকুরটি নাকি শুয়ে থেকেই বিস্কুট দাবি করত। এইসব ছোট্ট মুহূর্তে বোঝা যায়, কঠিন অভিযানের মাঝেও মানুষ সঙ্গ খোঁজে।
১৫ এপ্রিলের ডায়েরিতে ফুটে ওঠে আবহাওয়ার প্রভাব। সেদিন রোদ উঠেছিল। সবাই হাসিখুশি। যে জার্মান আরোহী খুব একটা কথা বলতেন না, সেও নাকি সবাইকে দেখে বলছিলেন, “আজ দারুণ দিন।” আমেরিকান দম্পতি ডেভ আর শেলি সেই দিনটির নাম দিয়েছিলেন “রবিবার”, যদিও দিনটি ছিল বুধবার। শুধু সূর্যের দেখা পাওয়ার আনন্দেই এমন নামকরণ।
১৬ এপ্রিলের ডায়েরিতে আছে পাকিস্তানের তরুণ পর্বতারোহী সাজিদ আলী সাদপারার সঙ্গে সাক্ষাতের কথা। তিনি কিংবদন্তি আরোহী আলী সাদপারার ছেলে। বাবর আলী লিখেছেন, নামের মিলেই যেন তাদের বন্ধুত্ব হয়ে গেল দ্রুত। হিমালয়ে মানুষকে পরিচয় করিয়ে দেয় দেশ নয়, স্বপ্ন।
১৯ এপ্রিল উচ্চতর বেস ক্যাম্পে পূজার আয়োজন হয়। শেরপাদের বিশ্বাস, পর্বত দেবতার আবাস। তাই আরোহণের আগে প্রার্থনা জরুরি। পাথরের বেদি, জুনিপারের ধোঁয়া, খাদ্যসামগ্রী উৎসর্গ সব মিলিয়ে আচার শেষ হলে আরোহীদের গলায় বাঁধা হয় আশীর্বাদের সুতা। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অভিজ্ঞতা—সবকিছুর পরও মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ানো মানুষ শেষ পর্যন্ত প্রার্থনাকেই ভুলে না।
২০ এপ্রিলের ডায়েরিতে আছে কঠিন সিদ্ধান্তের কথা। রাতভর তুষারপাত, সকালে প্রবল বাতাস। প্রথম শিবিরের পথে যাওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করা হয়। বাবর আলী দলনেতা হিসেবে সিদ্ধান্ত নেন, আজ ওঠা হবে না। পাহাড়ে অনেক সময় এগোনোর চেয়ে ফিরে আসার সিদ্ধান্তই বড় প্রজ্ঞা।
সেদিনই আরেক ঘটনা। এক বিদেশি নারী আরোহী পিচ্ছিল পথে আটকে পড়েছিলেন। নামতে ভয় পাচ্ছিলেন। বাবর আলী পুরোনো প্রশিক্ষণে শেখা কৌশলে দড়ি ব্যবহার করে নিজে নেমে আসেন। ঘটনাটি শুধু দক্ষতার নয়, চরম পরিবেশে ঠান্ডা মাথা রাখারও উদাহরণ।
এখন বাবর আলী হাইয়ার বা উচ্চতর বেস ক্যাম্পে আছেন অপেক্ষায়। মাকালুতে সাধারণত উচ্চতর বেস ক্যাম্প থেকে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় শিবির হয়ে চূড়ায় উঠতে হয়। প্রতিটি ধাপই কঠিন। বরফঢাল, ফাটল, পাথুরে অংশ, তীব্র বাতাস, সবই অপেক্ষায় থাকে।
সুযোগের জানালা খুব ছোট। কয়েকদিনের অনুকূল আবহাওয়া এলেই আরোহীরা চূড়ান্ত আক্রমণে যান। বাতাস থামবে, বরফ কিছুটা স্থির হবে, তখনই শুরু হবে চূড়ান্ত শিখর আক্রমণ। মাকালু জয় করলে এটা হবে বাবরের পঞ্চম আট হাজারি। আর আমরা অপেক্ষায় আছি, মাকালুর কালো পিরামিডের মাথায় কবে জ্বলে উঠবে বাংলাদেশের আরেকটি সাফল্যের আলো।








