ফোনের ১০ হাজার এমএএইচ ব্যাটারিতে শঙ্কায় পাওয়ার ব্যাংক

স্মার্টফোনের ব্যাটারির সক্ষমতা বাড়ছে দ্রুত। একসময় ৪ হাজার বা ৫ হাজার এমএএইচ ব্যাটারিকে বড় মনে করা হতো। এখন বাজারে ৭ হাজার, ৮ হাজার, এমনকি ১০ হাজার এমএএইচ ব্যাটারির স্মার্টফোনও দেখা যাচ্ছে। তাহলে পাওয়ার ব্যাংকের ভবিষ্যৎ কী হবে? লিখেছেন ইমরানুর রহমান
চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান শাওমি রেডমি নোট ১৭ প্রো ম্যাক্স ফাইভজি মডেলে ১০ হাজার এমএএইচের সিলিকন-কার্বন ব্যাটারি যুক্ত করেছে। অন্যান্য ফোন কোম্পানিও এই পথেই হাঁটছে। বড় ব্যাটারি ও দ্রুত চার্জিং প্রযুক্তির এই অগ্রগতি নতুন করে প্রশ্ন তুলছে— স্মার্টফোনই যদি একাধিক দিন চার্জ ধরে রাখতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে পাওয়ার ব্যাংকের প্রয়োজন কতটা থাকবে?
প্রশ্নটি শুধু প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভোক্তার অভ্যাস, বাজারের চাহিদা এবং প্রযুক্তিপণ্যের ব্যবসায়িক ভবিষ্যৎ। বড় ব্যাটারির স্মার্টফোন জনপ্রিয় হলে পাওয়ার ব্যাংকের প্রয়োজন কিছু ক্ষেত্রে কমতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে পণ্যটির বাজার দ্রুত হারিয়ে যাবে; বরং ব্যবহারকারীর চাহিদা অনুযায়ী পাওয়ার ব্যাংকের ধরন ও ব্যবহার বদলে যেতে পারে।
স্মার্টফোন নির্মাতাদের মধ্যে বড় ব্যাটারি ব্যবহারের প্রতিযোগিতা ক্রমে জোরালো হচ্ছে। তবে ব্যাটারির সক্ষমতা বেশি হলেই যে সব পরিস্থিতিতে ফোনটি দীর্ঘ সময় চলবে, তা নয়। স্ক্রিন ব্যবহারের সময়, গেম খেলা, ভিডিও দেখা, মোবাইল নেটওয়ার্কের অবস্থা এবং অন্যান্য কাজের ওপর ব্যাটারির স্থায়িত্ব নির্ভর করে। কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বিশ্ববাজারে বিক্রি হওয়া স্মার্টফোনের গড় ব্যাটারি সক্ষমতা ছিল ৫ হাজার ২৯১ এমএএইচ। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় তা প্রায় ৪০০ এমএএইচ বেশি। একই সময়ে ৬ হাজার এমএএইচ বা তার বেশি ব্যাটারির স্মার্টফোন বিশ্ববাজারে বিক্রির ২৯ শতাংশ দখল করে, যা ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ছিল ১০ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায়, বড় ব্যাটারির ফোনের দিকে বাজারের ঝোঁক বাড়ছে।
রিয়েলমি পি৪ পাওয়ার ও নারজো পাওয়ারের মতো মডেলে প্রায় ১০ হাজার এমএএইচের ব্যাটারি ব্যবহারের মাধ্যমে এই প্রবণতাকে আরও সামনে এনেছে। অন্যদিকে, অনার এক্স৭০ মডেলে রয়েছে ৮ হাজার ৩০০ এমএএইচ ব্যাটারি। সিলিকন-কার্বন ব্যাটারি প্রযুক্তির অগ্রগতিও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। প্রচলিত লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির তুলনায় এই প্রযুক্তি একই আয়তনে বেশি শক্তি ধারণের সুযোগ দিতে পারে। ফলে ফোনের আকার খুব বেশি না বাড়িয়েও ব্যাটারির সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে।
তবে সব স্মার্টফোন নির্মাতা একই কৌশল অনুসরণ করছে না। স্যামসাং ও অ্যাপলের বহু জনপ্রিয় মডেলে তুলনামূলক ছোট ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের পণ্য পরিকল্পনায় ব্যাটারির পাশাপাশি ফোনের ওজন, পুরুত্ব, নকশা, কর্মক্ষমতা ও সামগ্রিক ব্যবহার-অভিজ্ঞতাও গুরুত্ব পায়। অর্থাৎ ভবিষ্যতের স্মার্টফোন বাজারে একদিকে বড় ব্যাটারির ফোনের চাহিদা বাড়তে পারে, অন্যদিকে হালকা ও পাতলা ফোনের বাজারও টিকে থাকবে।
এই পরিবর্তনের প্রভাব পাওয়ার ব্যাংকের বাজারে কতটা পড়ছে, তা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। তবে স্মার্টফোনের ব্যাটারি বড় হওয়ার কারণে পাওয়ার ব্যাংকের বিক্রি কমে যাচ্ছে— এমন সরাসরি সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নির্ভরযোগ্য বৈশ্বিক তথ্য এখনো স্পষ্ট নয়। কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ভারতীয় বাজারবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালে জোরালো চাহিদার পর ২০২৫ সালে দেশটির পাওয়ার ব্যাংকের চালান বৃদ্ধির গতি কমেছে। বাজারের আগের সম্প্রসারণ এবং নতুন ক্রেতা যুক্ত হওয়ার গতি কমে যাওয়াকে এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে বাজারের মোট আর্থিক মূল্য তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল। দ্রুত চার্জিং, ইউএসবি-সি এবং উন্নত নকশার পাওয়ার ব্যাংকের প্রতিও ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ছিল।
আন্তর্জাতিক বাজারের পূর্বাভাসও পাওয়ার ব্যাংক শিল্পের সম্ভাব্য স্থায়িত্বের ইঙ্গিত দেয়। গ্র্যান্ড ভিউ রিসার্চের একটি বাজার গবেষণা প্রতিবেদনে ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী পাওয়ার ব্যাংকের বাজারমূল্য প্রায় ২০ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাজারটি ২২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে এবং ২০৩৩ সালে তা ৩৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হতে পারে। এসব সংখ্যা পূর্বাভাস, নিশ্চিত বিক্রির হিসাব নয়।
পাওয়ার ব্যাংক কিন্তু শুধু স্মার্টফোন চার্জ করার জন্য ব্যবহৃত হয় না। ব্লুটুথ ইয়ারফোনের কেস, ট্যাবলেট, ক্যামেরা এবং উপযুক্ত ক্ষমতা ও চার্জিং প্রযুক্তিসম্পন্ন পাওয়ার ব্যাংক দিয়ে কিছু ল্যাপটপও চার্জ করা যায়। ফলে একাধিক ডিভাইস ব্যবহারকারীদের কাছে এর প্রয়োজন থেকে যাওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
ভবিষ্যতে এই বাজারে শুধু বেশি এমএএইচের ব্যাটারি দেওয়ার প্রতিযোগিতা থাকবে না; চার্জিংয়ের গতি, বহনযোগ্যতা, নিরাপত্তা এবং একাধিক ডিভাইস চার্জ করার সুবিধাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।



