আপোফিস আসছে

পৃথিবীর খুব কাছ দিয়ে ছুটে যাবে বিশাল গ্রহাণু আপোফিস। বিজ্ঞানীরা প্রস্তুত এই বিরল মহাজাগতিক ঘটনার সাক্ষী হতে। কিন্তু ঠিক সেই পথেই যদি এসে পড়ে মানুষের ফেলে যাওয়া মহাকাশ বর্জ্য, তাহলে কী ঘটতে পারে— লিখেছেন অলকানন্দা রায়
আসন্ন মহাজাগতিক অতিথি ‘আপোফিস’ গ্রহাণুকে ঘিরে আশঙ্কার মেঘ আরও ঘনীভূত হয়েছে। ২০২৯ সালের ১৩ এপ্রিল পৃথিবীর খুব কাছ দিয়ে বয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে প্রায় ৩৭০ মিটার দীর্ঘ এই বিশাল বস্তুটির। বিজ্ঞানীরা আগেই নিশ্চিত করেছেন, এই যাত্রায় গ্রহাণুটি পৃথিবীতে সরাসরি আঘাত হানবে না। ফলে প্রলয়ংকরী কোনো বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞের আশঙ্কা আপাতত নেই। তবে সাম্প্রতিক এক চাঞ্চল্যকর গবেষণায় সামনে এসেছে এক নতুন উদ্বেগের বিষয়, যা বিশ্ব জুড়ে বিজ্ঞানীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
ইতালির জাতীয় গবেষণা পরিষদের (সিএনআর) ফলিত পদার্থবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের গবেষক জিভিয়া স্কিভিপিনো ও আল্লেসান্দ্রো রোসির এক নতুন গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে ‘দ্য প্ল্যানেটরি সায়েন্স জার্নাল’-এ। তাদের করা কম্পিউটারভিত্তিক নিবিড় পর্যবেক্ষণ বলছে, পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩৬ হাজার কিলোমিটার ওপরে থাকা ভূস্থির কক্ষপথ বা জিওআইর কাছাকাছি দিয়ে অতিক্রম করার সময় আপোফিসের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে মহাকাশের অদৃশ্য মানবসৃষ্ট বর্জ্য। গবেষকদের আশঙ্কা, এই দীর্ঘ যাত্রায় ছোট বা মাঝারি আকারের কোনো মহাকাশ বর্জ্য সরাসরি আঘাত হানতে পারে গ্রহাণুটির গায়ে।
মহাকাশে মানুষের ফেলে যাওয়া অকেজো উপগ্রহ, রকেটের খণ্ডিত অংশ বা বিভিন্ন ক্ষুদ্র ধাতব টুকরোর মতো বর্জ্যগুলো উচ্চ কক্ষপথে এখন এক মারাত্মক ঘাতক হিসেবে রূপ নিয়েছে। এর মধ্যে বড় বস্তুগুলো পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হলেও ছোট ও অদৃশ্য টুকরোগুলোর প্রকৃত সংখ্যা ও অবস্থান সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণাও সীমিত। গবেষক রোসির হিসাব অনুযায়ী, এই অদৃশ্য বর্জ্যগুলোর কিছু কিছু আপোফিসের এতটাই কাছাকাছি চলে আসতে পারে যে, আকস্মিক সংঘর্ষের ঝুঁকি কোনোভাবেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এই সম্ভাব্য সংঘর্ষের পরিণতি নিয়ে বিজ্ঞানীরা সতর্কবার্তা দিয়েছেন। আপোফিস হয়তো পৃথিবীর দিকে ছিটকে আসবে না বা এর মূল কক্ষপথ নাটকীয়ভাবে বদলে যাবে না, তবে এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। যা জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। তাই পৃথিবীর শক্তিশালী মহাকর্ষের টানে আপোফিসের নিজস্ব গতিপ্রকৃতি, ঘূর্ণন কিংবা ভূত্বকে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটছে, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছেন ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার ‘র্যামিস’ ও নাসার ‘ওসাইরিস অ্যাপেক্স’ মহাকাশযানের বিজ্ঞানীরা। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের আগে কোনো মহাকাশ বর্জ্যের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটলে আপোফিসের পৃষ্ঠে আকস্মিক গর্ত তৈরি হতে পারে কিংবা ছিটকে বের হতে পারে ধুলো ও পাথরের বিশাল মেঘ।
ফলে
বিজ্ঞানীদের পুরো গবেষণা ও
পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়া চরম বিশৃঙ্খলার মুখে
পড়বে। গ্রহাণুর পৃষ্ঠের এসব পরিবর্তনের সঠিক
কারণ নির্ধারণ করা অসম্ভব হয়ে
দাঁড়াবে— এগুলো কি পৃথিবীর মহাকর্ষের
স্বাভাবিক প্রভাবে ঘটেছে, নাকি মহাকাশ বর্জ্যের
সঙ্গে হওয়া আকস্মিক ও
ধ্বংসাত্মক সংঘর্ষের ফল? বিজ্ঞানীদের বহু
বছরের নিখুঁত প্রস্তুতি ও হিসাব মুহূর্তেই
ভেস্তে যাওয়ার চরম
ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
যদিও গবেষকরা জানিয়েছেন, ভূস্থির অঞ্চলে বস্তুর ঘনত্ব কম থাকায় কেসলার সিনড্রোমের মতো চেইন-রিঅ্যাকশন বা ধারাবাহিক ধ্বংসযজ্ঞের আশঙ্কা নেই, তবু এ ঘটনা মানবজাতির চরম দায়িত্বহীনতাকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। পৃথিবী ছাড়িয়ে মহাশূন্যের উচ্চ কক্ষপথকেও আমরা আজ এক অদৃশ্য আবর্জনার স্তূপে পরিণত করেছি, যার নিয়ন্ত্রণ এখন আর আমাদের হাতে নেই। আগামী দিনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন মহাকাশ নজরদারি দূরবীক্ষণ যন্ত্র চালুর কথা থাকলেও ২০২৯ সালের এই মহাজাগতিক সাক্ষাতের আগে আমাদের এই সীমিত জ্ঞান বড় ধরনের কোনো বিপর্যয় ডেকে আনে কি না, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় আতঙ্কের বিষয়।






