কিসের বিনিময়ে ফ্রিতে গৃহকর্মী দিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোম্পানি?

ছবি: শিফট
নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনের একটি ফ্ল্যাটে কড়া নাড়তেই ভেতরে এলেন জনাদুয়েক তরুণ। মাথায় তাদের সাধারণ ক্যাপ, তবে তাতে ফিট করা হাই-টেক ক্যামেরা। এটি কোনো রিয়েলিটি শো বা সাইন্স ফিকশন উপন্যাসের দৃশ্য নয়, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির এক নতুন বাস্তবতা।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক সিটিতে 'শিফট' নামের একটি স্টার্ট-আপ প্রতিষ্ঠান ঘরের যাবতীয় কাজ নিখরচায় করে দেওয়ার এক অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে, তবে তার বিনিময়ে গ্রাহককে দিতে হচ্ছে নিজের ঘরের ভেতরের দৃশ্য ধারণের অনুমতি।
'মাইক্রো এজিআই' নামের একটি প্রতিষ্ঠানের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো আগামী প্রজন্মের স্বায়ত্তশাসিত রোবটদের প্রশিক্ষণ দেওয়া। কাপড় ধোয়া থেকে শুরু করে অসুস্থ মানুষের সেবা করার মতো জটিল কাজগুলো যেন রোবট নিখুঁতভাবে করতে পারে, সেজন্য মানুষের হাতের সুক্ষ্ম নড়াচড়া বা ডেক্সটোরিটি রেকর্ড করা হচ্ছে।
এই ডেটা সংগ্রহের জন্য তরুণ কর্মীরা মাথায় ক্যামেরা পরে দিনভর ঘর পরিষ্কার বা রান্নার কাজ করছেন, আর তাদের ক্যামেরার চোখ তাক করে থাকছে নিজেদের হাতের দিকে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা বেরকান কিলিক জানান, মানবজাতির কল্যাণের জন্যই এই ডেটা সংগ্রহ করা হচ্ছে। চ্যাটজিপিটির মতো মডেলগুলো অনলাইনের লেখা পড়ে শিখতে পারলেও, বাস্তব জগতের প্রতিটি রান্নাঘর, লিভিং রুম কিংবা আসবাবপত্র আলাদা। আলোর ভিন্নতা ও ঘরের একেক রকম পরিবেশের সঙ্গে রোবট কীভাবে খাপ খাইয়ে নেবে, তা শেখাতে বিপুল পরিমাণ বাস্তব ডেটার প্রয়োজন।
সংগৃহীত এসব তথ্য সম্পূর্ণ অ্যানোনিমাস বা পরিচয়হীন করে অন্যান্য রোবটিক্স কোম্পানির কাছে বিক্রি করাই এই প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক মডেল।
তবে নিখরচায় এমন সেবার আড়ালে লুকিয়ে থাকা গোপনীয়তা নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রযুক্তি ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা। ইলেক্ট্রনিক ফ্রন্টিয়ার ফাউন্ডেশনের ররি মির এই প্রক্রিয়াকে 'ডেটা-ব্রাইবিং' বা তথ্যের বিনিময়ে ঘুষ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, সাময়িক সুবিধার জন্য ঘরের ভেতরের সংবেদনশীল তথ্য তুলে দেওয়ার ফল ভবিষ্যতে ভয়াবহ হতে পারে, কারণ এই ডেটা পরবর্তীকালে অন্য কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা সরকারের হাতে চলে যাওয়ার ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
অন্যদিকে ইলেক্ট্রনিক প্রাইভেসি ইনফরমেশন সেন্টারের প্রতিনিধি ক্যালি শ্রোডার একে দেখছেন 'গোপনীয়তা লঙ্ঘনের এক চতুর উপায়' হিসেবে।
তার মতে, ঘরের ভেতরের রেকর্ডিং থেকে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের চরম সংবেদনশীল তথ্য ফাঁস হয়ে যেতে পারে। তাছাড়া, যে ডেটা মানুষ সামান্য কিছু টাকার কাজের বিনিময়ে দিয়ে দিচ্ছে, তা বিক্রি করে কোম্পানিগুলো বিপুল মুনাফা কামাবে, অথচ ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তির কারণেই সাধারণ গৃহকর্মীরা চাকরি হারাতে পারেন।
অবশ্য সব সমালোচনা উড়িয়ে দিয়ে শিফটের প্রতিষ্ঠাতা কিলিক দাবি করেন, এটি পৃথিবীর সবচেয়ে সৎ একটি প্ল্যাটফর্ম। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো প্রতিদিন মানুষের অজান্তেই ডেটা চুরি করছে, যার বিপরীতে ব্যবহারকারীরা কিছুই পাচ্ছেন না। সেখানে তারা সরাসরি কাজের বিনিময়ে ডেটা নিচ্ছেন, যা একটি স্বচ্ছ চুক্তি।
এই প্রযুক্তি বিপ্লবে অংশ নিতে তরুণ কর্মীরাও বেশ উচ্ছ্বসিত, এমনকি তাদের কেউ কেউ নিজের পরিবারের সদস্যদের দৈনন্দিন কাজের ভিডিও-ও পাঠাচ্ছেন এই ডেটা ব্যাংকে।
সূত্র: বিবিসি




