প্রান্তিক মানুষের ডিজিটাল স্বাবলম্বিতায় কাজ করছে গ্রামীণফোন

“ডিজিটাল ইনক্লুশন ফর মার্জিনালাইজড কমিউনিটিস” উদ্যোগের দ্বিতীয় পর্যায়ের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করল প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ও টেলিনরের সঙ্গে অংশীদারিত্বে গ্রামীণফোন।
একসময় ইন্টারনেট ব্যবহার মানেই ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সীমাবদ্ধ থাকা। কিন্তু এখন একটি স্মার্টফোন এবং প্রয়োজনীয় ডিজিটাল দক্ষতা একজন মানুষের শিক্ষা, সরকারি সেবা, আর্থিক লেনদেন এমনকি কর্মসংস্থানেরও নতুন দরজা খুলে দিতে পারে। তবে এই সুযোগ এখনও দেশের সব মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি। বিশেষ করে নারী, কিশোরী এবং বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ডিজিটাল দুনিয়ায় প্রবেশের পথে রয়ে গেছে নানা প্রতিবন্ধকতা।
এই বৈষম্য কমিয়ে সবার জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ও টেলিনরের সঙ্গে অংশীদারিত্বে “ডিজিটাল ইনক্লুশন ফর মার্জিনালাইজড কমিউনিটিস” উদ্যোগের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু করেছে গ্রামীণফোন। নতুন এই পর্যায়ে ২০২৮ সালের মধ্যে দেশের ৪০ লাখ প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যার ৭০ শতাংশই হবেন নারী ও কিশোরী।
৩০ জুলাই রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দ্বিতীয় পর্যায়ের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পাশাপাশি উদযাপন করা হয় প্রথম পর্যায়ের সাফল্যও।
উদ্যোগটি শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত দেশের ৩২টি জেলার ৩৩ লাখেরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬৮ শতাংশই নারী ও কিশোরী। শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রশিক্ষণ নয়, শিক্ষার জন্য ইন্টারনেট ব্যবহার, অনলাইন সরকারি সেবা গ্রহণ, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ডিজিটাল জন্মনিবন্ধন এবং ডিজিটাল মাধ্যমে আয় বৃদ্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।
এই অর্জনের ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও বিস্তৃত পরিসরে কাজ করার পরিকল্পনা নিয়েছে গ্রামীণফোন।
অনুষ্ঠানে গ্রামীণফোনের হেড অব এনভায়রনমেন্ট, সোশ্যাল ও গভর্ন্যান্স (ইএসজি) ফারহানা ইসলাম এবং ডিজিটাল ইনক্লুশন লিড তাজরিবা খুরশীদ উদ্যোগটির অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
পরে অনুষ্ঠিত হয় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি বিষয়ক একটি প্যানেল আলোচনা। এতে অংশ নেন প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর কবিতা বোস, জিএসএমএ-এর সিনিয়র মার্কেট এঙ্গেজমেন্ট ম্যানেজার গগনদীপ মনচান্দা, টেলিনর এশিয়ার চিফ কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার মনীষা ডোগরা, গ্রামীণফোনের চিফ কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ এবং চিফ মার্কেটিং অফিসার ফারহা নাজ জামান।
আলোচনায় উঠে আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—শুধু ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করলেই ডিজিটাল বৈষম্য দূর হয় না। মানুষের হাতে প্রযুক্তি পৌঁছানোর পাশাপাশি সেটি নিরাপদ ও কার্যকরভাবে ব্যবহারের সক্ষমতাও তৈরি করতে হয়।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল গ্রামীণফোনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইয়াসির আজমানের সঙ্গে উদ্যোগটির কয়েকজন সুবিধাভোগী—পিয়ালী সিনহা, শানু আক্তার, মোনালিসা আক্তার ইরিন ও অন্তরা আক্তারের প্রাণবন্ত আলাপচারিতা।
তাদের অভিজ্ঞতায় উঠে আসে, কীভাবে ডিজিটাল দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণ, জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি এবং ডিজিটাল অর্থনীতিতে অংশগ্রহণের নতুন পথ তৈরি হয়েছে। প্রযুক্তি এখানে শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; বরং আত্মবিশ্বাস, সক্ষমতা এবং স্বাবলম্বিতার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বললেন, “বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তর অবশ্যই অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীরা যেন প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা, সরকারি সেবা এবং ডিজিটাল অর্থনীতিতে অর্থবহভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে এজন্য তাদের প্রয়োজনীয় ডিজিটাল দক্ষতায় দক্ষ করে তুলতে নেয়া এমন উদ্যোগগুলো সরকারের ভিশনকে সমৃদ্ধ করে। ২০২৮ সালের মধ্যে আটটি সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মানুষের কাছে পৌঁছানোর যে লক্ষ্যমাত্রা এই পরবর্তী পর্যায়ে নেওয়া হয়েছে, তা আমাকে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হওয়ার লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো গোষ্ঠী যেন পিছিয়ে না পড়ে তা নিশ্চিত করার জন্য এটি একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। এই ডিজিটাল যুগে টিকে থাকার জন্য মানুষকে দক্ষতা, জ্ঞান ও আত্মবিশ্বাসে সমৃদ্ধ করা আমাদের জন্য ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ, যতটা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করা।”
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. এমদাদ উল বারী বললেন, “কার্যকর বা অর্থবহ কানেক্টিভিটি কেবল নেটওয়ার্ক কাভারেজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর জন্য প্রয়োজন ডিজিটাল সাক্ষরতা এবং প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার। গ্রামীণফোনের এই উদ্যোগটি পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে কীভাবে ডিজিটাল বৈষম্য দূর হতে পারে তার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।”
ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের পরবর্তী ধাপ এখন কেবল ইন্টারনেট সংযোগ সম্প্রসারণ নয়; বরং প্রতিটি মানুষকে প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ করে তোলা। কারণ ডিজিটাল দক্ষতা আজ শিক্ষা, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা হওয়া এবং সরকারি সেবার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
৩৩ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছানোর অভিজ্ঞতা নিয়ে এবার ৪০ লাখ মানুষের জন্য নতুন যাত্রা শুরু করেছে গ্রামীণফোন। লক্ষ্য শুধু প্রযুক্তি হাতে তুলে দেওয়া নয়, বরং প্রযুক্তিকে মানুষের ক্ষমতায়নের মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। আর সেই লক্ষ্য পূরণে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে দেশের ডিজিটাল রূপান্তর হবে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, আরও টেকসই।







