নিউক্লিয়ার ব্যাটারি এক চার্জেই জীবন পার

বেটাভোলটাইক ব্যাটারিতে ব্যবহৃত বেটা রশ্মি অত্যন্ত দুর্বল। এটি এক্স-রে বা গামা রশ্মির মতো মানবদেহ ভেদ করতে পারে না।
এমন কোনোদিন কি আসবে, ফুরোবে না স্মার্টফোনের চার্জ থাকবে না চার্জার বলে কিছু? লিখেছেন এহতেশাম শোভন
অফিস থেকে বাসায় ফিরছেন, কলে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিচ্ছেন জুনিয়র কলিগকে— ঠিক এমন সময় চার্জ শেষ হয়ে ফোন গেল বন্ধ হয়ে। এদিকে বাসায় পৌঁছাতে লাগবে আরও এক ঘণ্টা। এমন মুহূর্তে কখনো পড়েছেন? মনে হয়েছে— স্মার্টফোনের চার্জ যদি আজীবন থাকত?
কল্পবিজ্ঞানের পাতায় বা হলিউডের চলচ্চিত্রে আমরা প্রায়ই এমন সব গ্যাজেট দেখি, যেগুলোর শক্তির উৎস ফুরিয়ে যায় না কখনোই। ‘আয়রন ম্যান’-এর বুকের আর্করিয়্যাক্টর কিংবা সাই-ফাই ঘরানার মহাকাশযানের চিরস্থায়ী শক্তির উৎস হিসেবে প্রায়ই দেখা মেলে নিউক্লিয়ার ব্যাটারির।
আর এ ফিকশনের রোমাঞ্চকর প্রযুক্তি বাস্তব পৃথিবীর খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। যে স্মার্টফোনটি প্রতিদিন রাতে নিয়ম করে চার্জ দিতে হয়, সেটি যদি এক চার্জেই পার করে দিতে পারে ২০ থেকে ৫০ বছর, তবে কেমন হবে? বৈজ্ঞানিক গবেষণাগারের দেয়াল পেরিয়ে নিউক্লিয়ার ব্যাটারি এখন বাস্তবের দোরগোড়ায়।
প্রথাগত লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির মতো নিউক্লিয়ার ব্যাটারি রাসায়নিক বিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে না। এর মূল বৈজ্ঞানিক ভিত্তি বেটাভোলটাইকস প্রযুক্তি। এ প্রযুক্তিতে তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ (যেমন: নিকেল-৬৩, ট্রিটিয়াম বা কার্বন-১৪) থেকে নির্গত বেটা কণা বা ইলেকট্রনকে সরাসরি বিদ্যুতে রূপান্তর করা হয়।
তেজস্ক্রিয় ক্ষয় বা রেডিওঅ্যাকটিভ ডিকের ফলে যে শক্তি উৎপন্ন হয়, তাকে ধারণ করার জন্য ব্যবহার করা হয় ডায়মন্ড সেমিকন্ডাক্টর বা হীরা দিয়ে তৈরি অর্ধপরিবাহী স্তর। এ স্তরটি নির্গত ইলেকট্রনগুলোকে গ্রহণ করে একটি সুনির্দিষ্ট বৈদ্যুতিক প্রবাহ বা কারেন্ট তৈরি করে।
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, নিউক্লিয়ার বা পারমাণবিক বলতেই তো চোখের সামনে ভেসে ওঠে চেরনোবিল বা ফুকুশিমার মতো ভয়াবহ পারমাণবিক দুর্ঘটনা কিংবা পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ। তাহলে এই ব্যাটারি পকেটে নিয়ে ঘুরলে কি তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি থাকবে না?
বিজ্ঞান বলছে, উত্তরটি হলো— না। বেটাভোলটাইক ব্যাটারিতে ব্যবহৃত বেটা রশ্মি অত্যন্ত দুর্বল। এটি এক্স-রে বা গামা রশ্মির মতো মানবদেহ ভেদ করতে পারে না। এমনকি এক টুকরো সাধারণ কাগজ বা ব্যাটারির প্রতিরক্ষামূলক অ্যালুমিনিয়াম কেসিং ভেদ করার ক্ষমতাও এ রশ্মির নেই। ফলে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি অতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে যেভাবে বিস্ফোরিত হতে পারে, নিউক্লিয়ার ব্যাটারিতে সেই ঝুঁকি একেবারেই নেই।
বাস্তব দুনিয়ায় এ প্রযুক্তির অগ্রগতি কত দূর? সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের বেটাবোল্ট নামের একটি স্টার্টআপ কোম্পানি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের উপযোগী ক্ষুদ্রাকৃতির নিউক্লিয়ার ব্যাটারি তৈরি করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। তারা একটি কয়েন বা মুদ্রার চেয়েও ছোট আকারের ব্যাটারি তৈরি করেছে, যা নিকেল-৬৩ আইসোটোপ এবং ডায়মন্ড সেমিকন্ডাক্টর ব্যবহার করে একটানা ৫০ বছর বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে সক্ষম।
তবে এখনই আমাদের স্মার্টফোন বা ল্যাপটপে এ ব্যাটারি যুক্ত হতে পারছে না, যার পেছনে রয়েছে কিছু সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক ও ব্যবহারিক চ্যালেঞ্জ। প্রথম চ্যালেঞ্জটি শক্তির ঘনত্ব বা পাওয়ার ডেনসিটি। বর্তমানের নিউক্লিয়ার ব্যাটারিগুলো দীর্ঘ সময় ধরে একটানা শক্তি দিতে পারলেও, একবারে খুব বেশি বিদ্যুৎ বা উচ্চ ওয়াটের কারেন্ট আউটপুট দিতে পারে না। এদের শক্তি পরিমাপ করা হয় মাইক্রোওয়াট বা মিলিওয়াট স্কেলে। অন্যদিকে, একটি আধুনিক স্মার্টফোন সচল রাখতে কিংবা প্রসেসরের ভারী কাজের জন্য কয়েক ওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। ফলে, বর্তমান প্রযুক্তির একটিমাত্র নিউক্লিয়ার ব্যাটারি দিয়ে সরাসরি স্মার্টফোন চালানো অসম্ভব।
তাহলে এর সমাধান কী? বিজ্ঞানীরা এখন হাইব্রিড মডেলের কথা ভাবছেন। যেখানে একটি ছোট নিউক্লিয়ার ব্যাটারি সারাক্ষণ ব্যাকগ্রাউন্ডে থেকে ফোনের মূল লিথিয়াম ব্যাটারিকে চার্জ করতে থাকবে। ফলে ফোনটি ব্যবহার না করলেও সেটি নিজে নিজেই চার্জ হতে থাকবে এবং ব্যবহারকারীকে কখনোই চার্জার প্লাগে ফোন গুঁজতে হবে না।
আপাতত সাধারণ কনজিউমার ইলেকট্রনিকসে এর ব্যবহার সীমিত হলেও, নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে নিউক্লিয়ার ব্যাটারি এরই মধ্যে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। মানবদেহের ভেতরে বসানো পেসমেকার, যা সচল রাখতে আগে প্রতি কয়েক বছর পরপর অপারেশনের প্রয়োজন হতো, সেখানে এই ব্যাটারির ব্যবহার চিকিৎসা খাতকে বদলে দিতে পারে। এ ছাড়া গভীর সমুদ্রে বসানো সেন্সর, ভূগর্ভস্থ বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি এবং মহাশূন্যের রিমোট মনিটরিং সিস্টেমে, যেখানে বারবার ব্যাটারি পরিবর্তন করা অসম্ভব, সেখানে নিউক্লিয়ার ব্যাটারিই বড় ভরসা হয়ে উঠতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, মহাকাশযানগুলোতে আরটিজি নামক এক ধরনের থার্মোইলেকট্রিক নিউক্লিয়ার ব্যাটারি বহু বছর ধরেই সফলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ভবিষ্যতের পৃথিবী যখন আরও বেশি স্বয়ংক্রিয় এবং আইওটি বা ইন্টারনেট অব থিংস-নির্ভর হয়ে উঠবে, তখন কোটি কোটি সেন্সরের জন্য চার্জহীন শক্তির উৎস প্রয়োজন হবে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, আগামী এক থেকে দুই দশকের মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তির আরও উন্নতি হলে এবং উৎপাদন খরচ কমলে নিউক্লিয়ার ব্যাটারি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠবে। সেদিন হয়তো আর বেশি দূরে নয়, যখন পাওয়ার ব্যাংকের ঝামেলা চুকিয়ে মানুষ এমন যুগে প্রবেশ করবে, যেখানে শক্তির উৎস হবে চিরস্থায়ী, নিরাপদ এবং পরিবেশবান্ধব।




