বায়োলুমিনেসেন্স
উদ্ভিদের প্রভায় আলোকিত হবে শহরের রাস্তা পার্ক

‘অ্যাভাটার’-এর সেই জাদুকরী নীল আলোর বনভূমির দৃশ্য আজ আর শুধু কল্পবিজ্ঞান নয়। লিখেছেন শুভ রহমান
রাতের শহরে পা রাখলেই চোখে পড়ে হাজারো বৈদ্যুতিক বাতির কৃত্রিম রোশনাই। কিন্তু এই উজ্জ্বল আলোয় যখন রাতের আকাশ ঢেকে যায়, তখন হারিয়ে যায় জোনাকি পোকার মিটিমিটি আলো কিংবা প্রকৃতির আসল সৌন্দর্য। অথচ প্রকৃতি নিজেই এমন এক জাদুকরী আলো তৈরির রহস্য লুকিয়ে রেখেছে আমাদের চারপাশে, যার নাম ‘বায়োলুমিনেসেন্স’ বা জীবপ্রভা। গভীর সাগরের তলদেশ কিংবা জোনাকির পেটে যে আলো দেখা যায়, বিজ্ঞানীদের কল্যাণে এখন সেই আলো ছড়াতে শুরু করেছে গাছপালা ও উদ্ভিদকুল। অদূর ভবিষ্যতে আমাদের কংক্রিটের শহুরে পথঘাট কিংবা পার্কগুলো আলোকিত হতে পারে এই জীবন্ত উদ্ভিদের মৃদু ও জাদুকরী আলোয়, যা শক্তি খরচ কমানোর পাশাপাশি পৃথিবীকে দূষণমুক্ত রাখতে বিপ্লব ঘটাবে।
বায়োলুমিনেসেন্স হলো এমন একটি জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়া, যেখানে কোনো জীবের শরীরের ভেতরে বিশেষ রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে কোনো রকম বাহ্যিক বিদ্যুৎ বা শক্তি ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে আলো উৎপাদিত হয়। জোনাকি পোকা বা গভীর সমুদ্রের জেলিফিশের এই প্রাকৃতিক ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞানীরা এখন জিন প্রকৌশল ও সিনথেটিক বায়োলজির সাহায্যে গাছের কোষে আলোর জিন প্রবেশ করাচ্ছেন। এর ফলে গাছগুলো দিনের বেলা সূর্যের আলো থেকে শক্তি সঞ্চয় করে সালোকসংশ্লেষণ চালায় এবং রাতের অন্ধকারে নরম, সবুজ বা জাদুকরী আলো ছড়াতে থাকে। হলিউডের বিখ্যাত সিনেমা ‘অ্যাভাটার’-এর সেই জাদুকরী নীল আলোর বনভূমির দৃশ্য আজ আর শুধু কল্পবিজ্ঞান নয়, বরং তা বাস্তব রূপ নিতে শুরু করেছে।
এই যুগান্তকারী ধারণাটি বাস্তবে রূপ দিতে এবং বাণিজ্যিক উৎপাদনে আনতে বিশ্বের বেশ কিছু উদ্ভাবনী স্টার্টআপ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে। ফ্রান্সভিত্তিক গবেষণা ও বায়োটেক কোম্পানি ‘উডলাইট’ এমন সব উদ্ভিদ নিয়ে কাজ করছে, যা কোনো বাহ্যিক বিদ্যুৎ বা শক্তি ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবে আলো ছড়াতে সক্ষম। তাদের মূল লক্ষ্য হলো শহুরে পথঘাট, পার্ক এবং ঘরের ভেতরের সাজসজ্জায় ঐতিহ্যবাহী বৈদ্যুতিক আলোর বিকল্প হিসেবে এই জীবন্ত গাছগুলোকে জনপ্রিয় করে তোলা।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘লাইট বায়ো’ এই কোম্পানিটি উদ্ভিদবিজ্ঞানে এক বিশাল বিপ্লব ঘটিয়েছে। তারা বিশ্বমানের বায়োলুমিনেসেন্ট পিটুনিয়া ফুল বাজারে এনেছে, যা ঘরের ভেতর বা বাগানে ২৪ ঘণ্টা একটানা মৃদু আলো ছড়াতে পারে। টাইম ম্যাগাজিনের সেরা ইনোভেশনের স্বীকৃতি পাওয়া এই প্রতিষ্ঠানটি উদ্ভিদের নিজস্ব বিপাকীয় প্রক্রিয়াকে কাজে লাগিয়ে আলো তৈরির প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে।
ফ্রান্সের আরেকটি বিখ্যাত কোম্পানি ‘গ্লোয়িই’, যারা মূলত সামুদ্রিক ব্যাকটেরিয়ার বায়োলুমিনেসেন্স প্রযুক্তি ব্যবহার করে শহুরে আসবাবপত্র, সাইনবোর্ড এবং অ্যাম্বিয়েন্ট লাইটিংয়ের বিকল্প তৈরি করছে। তারা এমন তরল ও জৈবিক আলোর প্যানেল তৈরি করেছে, যা শহুরে পথঘাট ও ইভেন্টে টেকসই আলোর উৎস হিসেবে কাজ করতে পারে।
তবে এই প্রযুক্তির বাণিজ্যিক প্রসারে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। উদ্ভিদের আলোর তীব্রতা এখনো পুরোপুরি একটি সড়কবাতির সমান হয়ে ওঠেনি, যা রাতের বেলা গাড়ি চলাচলের পর্যাপ্ত হতে পারে।




