যে কারণে আমাদের এআই দানবের ভয় দেখানো হয়

ছবি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি
যদি আগে এমন কথা শুনে থাকেন একটি প্রযুক্তি কোম্পানি বলছে, তারা এমন একটি নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) তৈরি করেছে যা এতটাই শক্তিশালী যে, পৃথিবীতে ছেড়ে দেওয়া খুবই বিপজ্জনক; এর পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ। তবে আমাদের সৌভাগ্য যে, তারা আপাতত এটিকে আটকে রেখেছে। তারা শুধু চেয়েছে আমরা যেন জানি। কেমন আজব শোনাচ্ছে না?
ঠিক এটাই এআই কোম্পানি অ্যানথ্রোপিক তাদের নতুন মডেল ‘ক্লড মিথোস’ সম্পর্কে বলছে। কোম্পানির দাবি, মিথোস সাইবার নিরাপত্তার ত্রুটি খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে মানুষের বিশেষজ্ঞদের থেকেও অনেক এগিয়ে এবং এ ধরনের প্রযুক্তি ভুল মানুষের হাতে গেলে তা বিশ্বব্যাপী প্রভাব ফেলতে পারে।
এপ্রিলের শুরুতে এক ব্লগ পোস্টে অ্যানথ্রোপিক বলেছে, ‘এর প্রভাব— অর্থনীতি, জননিরাপত্তা ও জাতীয় নিরাপত্তার ওপর গুরুতর হতে পারে।’
কিছু অতিরঞ্জিত পর্যবেক্ষক এমনও সতর্ক করেছেন যে, মিথোস শিগগিরই আপনাকে আপনার জীবনের প্রতিটি প্রযুক্তি, এমনকি ওয়াইফাই-সংযুক্ত মাইক্রোওয়েভ পর্যন্ত বদলাতে বাধ্য করবে।
তবে বেশ কয়েকজন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এসব দাবিতে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, তবে আপাতত সেটা পাশে রাখি। এটি নতুন কিছু নয়। শীর্ষ এআই কোম্পানিগুলোর নির্বাহীরা নিয়মিতই সতর্ক করেন যে, তাদের তৈরি প্রযুক্তি মানবজাতিকে ধ্বংস করতে পারে। তাহলে, এআই কোম্পানিগুলো কেন চায় আমরা তাদের ভয় পাই?
এটি কোনো কোম্পানির নিজের কাজ নিয়ে কথা বলার অদ্ভুত উপায়। আপনি তো শোনেন না ম্যাকডোনাল্ডস বলছে, তারা এমন একটি বার্গার বানিয়েছে যা এত ভয়ংকর সুস্বাদু যে, সেটি জনসাধারণের জন্য পরিবেশন করা অনৈতিক হবে।
এখানে একটি তত্ত্ব আছে। সমালোচকদের মতে, এআই কোম্পানিগুলোর জন্য মানুষকে প্রলয়ের চিন্তায় ব্যস্ত রাখা লাভজনক, কারণ, এতে তারা বর্তমানে যে বাস্তব ক্ষতি করছে, সেগুলো থেকে দৃষ্টি সরে যায়। প্রযুক্তি নেতারা বললেন, তারা কেবল ভবিষ্যতের অনিবার্য ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করছেন এবং নিরাপত্তাই তাদের অগ্রাধিকার।
কিন্তু অন্যদের মতে, এটি আসলে ভয় ছড়ানোর কৌশল— যা প্রযুক্তির সম্ভাবনাকে অতিরঞ্জিত করে এবং শেয়ারমূল্য বাড়াতে সাহায্য করে।
একই সঙ্গে এটি এমন একটি ধারণা তৈরি করে যে, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে দূরে থাকতে হবে। কারণ, এই কোম্পানিগুলোই নাকি একমাত্র খারাপ লোকদের থামাতে এবং দায়িত্বশীলভাবে এই প্রযুক্তি তৈরি করতে পারে।
যুক্তরাজ্যের এডিনবরা ইউনিভার্সিটির ডেটা ও এআই নীতিশাস্ত্রের অধ্যাপক শ্যানন ভ্যালর বললেন, ‘আপনি যদি এই প্রযুক্তিগুলোকে প্রায় অতিপ্রাকৃত বিপজ্জনক হিসেবে উপস্থাপন করেন, তাহলে আমরা নিজেদের অসহায় মনে করি, মনে হয় আমরা এর সঙ্গে পাল্লা দিতে পারি না। তখন মনে হয় একমাত্র ভরসা ওই কোম্পানিগুলোই।’
আমাকে কেউ থামাও
অ্যানথ্রোপিকের একজন মুখপাত্র জানালেন, কোম্পানি এসব বিষয়ে পরিষ্কার অবস্থান নিয়েছে। তারা মিথোসের সাইবার সক্ষমতা সমর্থনকারী অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ব্লগ পোস্ট শেয়ার করেছে।
এর আগে ২০১৯ সালেও ওপেনএআই তাদের জিপিটি-টু মডেল নিয়ে শঙ্কার কথা বলেছিল। যদিও এখনকার তুলনায় সেটি খুবই পিছিয়ে পড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। পরে অবশ্য কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্যাম অল্টম্যান ভুল স্বীকার করেন যে, জিপিটি-টু নিয়ে তাদের ভয় ছিল অমূলক।
সম্প্রতি সেই অল্টম্যানই এক পডকাস্টে অ্যানথ্রোপিকের ‘ভয়ভিত্তিক মার্কেটিং’-এর কঠোর সমালোচনা করেন।
কিন্তু তার নিজের ‘আমি একটা দানব তৈরি করেছি’ এ ধরনের বক্তব্যও বহুদিনের।
২০১৫ সালে অল্টম্যান বলেছিলেন, ‘এআই সম্ভবত পৃথিবীর শেষ ডেকে আনবে, তবে এর মধ্যে দারুণ কোম্পানি তৈরি হবে।’ পরে তিনি বললেন, চ্যাটজিপিটি চালু করে তিনি নাকি কখনো কখনো ভাবেন, তিনি ‘খারাপ কিছু করে ফেলেছেন কি না’।
২০২৩ সালে অল্টম্যান, অ্যামোডি, বিল গেটস, গুগল ডিপমাইন্ডের প্রধান ডেমিস হাসাবিসসহ শত শত প্রযুক্তি নেতা একটি বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন, যেখানে বলা হয়, ‘মহামারি বা পরমাণু যুদ্ধের মতো এআই থেকে মানবজাতির বিলুপ্তির ঝুঁকি কমানো একটি বৈশ্বিক অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
একই বছরে ইলন মাস্কসহ অনেকেই উন্নত এআই তৈরিতে ছয় মাস বিরতির আহ্বান জানান। মাস্ক নিজেই ছয় মাসের কম সময়ের মধ্যে তার এআই কোম্পানি এক্সএআই চালু করেন।
ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও ‘দ্য এআই কন’ বইয়ের সহলেখক এমিলি এম বেন্ডার বললেন, ‘এটি ক্ষমতার অপ্রমাণিত দাবির একটি ধারাবাহিক অংশ।’ তার মতে, এটি শুধু ওপেনএআই বা অ্যানথ্রোপিক নয়— পুরো এআই শিল্পেরই একটি সাধারণ কৌশল। “তারা বলছে ‘এদিকে তাকাও’, আর পরিবেশ ধ্বংস, শ্রম শোষণসহ বাস্তব সমস্যাগুলোকে আড়াল করছে।”
মিথোস কি সত্যিই এত ভয়ংকর?
অ্যানথ্রোপিক বলছে, তাদের নতুন মডেল এরই মধ্যে প্রযুক্তি জগতে হাজার হাজার ‘উচ্চ ঝুঁকির’ দুর্বলতা খুঁজে পেয়েছে, যা মানুষের বিশেষজ্ঞদের চেয়েও বেশি কার্যকর। তারা ৪০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার সঙ্গে অংশীদারত্ব ঘোষণা করেছে। এসব দুর্বলতা দ্রুত ঠিক করার জন্য।
তবে এসব দাবিতে বড় ধরনের সন্দেহ রয়েছে। এআই নাউ ইনস্টিটিউটের প্রধান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিজ্ঞানী হেইডি খালফ এসব দেখে মুগ্ধ হননি। তিনি বললেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো— ‘ফলস পজিটিভ রেট’ উল্লেখ না করা— যা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। এটি দেখায় কতবার কোনো টুল ভুলভাবে সমস্যার সংকেত দেয়। অ্যানথ্রোপিক এ বিষয়ে কিছু বলেনি।
এ ছাড়া, কোম্পানিটি মিথোসকে বিদ্যমান নিরাপত্তা টুলগুলোর সঙ্গে তুলনাও করেনি, যেগুলো বহু বছর ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে।
কিছু দাবি আছে যে, অ্যানথ্রোপিক হয়তো প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং শক্তির অভাবে মিথোস ব্যাপকভাবে প্রকাশ করেনি। এ প্রশ্নেরও কোনো উত্তর তারা দেয়নি।
তবে এর মানে এই নয় যে, হুমকি নেই। খালফ বললেন, ‘মিথোস সক্ষম হতে পারে।’ বড় কোডবেস বিশ্লেষণে এআই সত্যিই কার্যকর। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া এসব দাবিকে তিনি সন্দেহের চোখে দেখেন।
কেন এত সিরিয়াস?
ওপেনএআই ও অ্যানথ্রোপিক বলে, পৃথিবী ধ্বংস রোধ করাই তাদের অস্তিত্বের কারণ। ওপেনএআই শুরু হয়েছিল একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে, নিরাপদ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে। পরে অ্যানথ্রোপিক গড়ে ওঠে, কারণ তারা মনে করেছিল ওপেনএআই যথেষ্ট নিরাপত্তামুখী নয়। এখন উভয়ই শেয়ারবাজারে প্রবেশের পথে।
গুগল তাদের এআই অস্ত্র তৈরির সীমা শিথিল করেছে। ওপেনএআই অলাভজনক মর্যাদা ছাড়তে আইনি লড়াই করেছে। অ্যানথ্রোপিক তাদের নিরাপত্তা নীতি পরিবর্তন করেছে। ফলে এমনটা ভাবার আর সুযোগ নেই যে, এদের কেউ বাজারে আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ ছেড়ে দেবে শুধু ভালো থাকার জন্য।
এদিকে স্বাস্থ্যসেবায় এআই ব্যবহারের চাপ বাড়ছে, যদিও ভুল নির্ণয়ের ঝুঁকি রয়েছে। ডেটা সেন্টারগুলো বিপুল পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত করতে পারে। এআই ব্যবহার মানুষের মানসিক সমস্যাও বাড়াতে পারে। ডিপফেক এরই মধ্যে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।
এআই কোম্পানিগুলো বলছে তারা এসব বিষয় গুরুত্ব দেয়। কিন্তু একই সঙ্গে মহাপ্রলয়ের কথাও বেশি করে বলছে— যাতে এসব অভিযোগ ধামাচাপা পড়ে যায়। বাস্তবে ধামাচাপা পড়ছেও। অর্থাৎ কৌশল কাজ করছে।
দানব নাকি ত্রাতা?
একই সঙ্গে যারা ধ্বংসের কথা বলে, তারাই আবার মুক্তির প্রতিশ্রুতিও দেয়। অল্টম্যান ২০২৪ সালে বললেন, এআই জলবায়ু সমস্যার সমাধান করবে, মহাকাশে উপনিবেশ গড়বে, এমনকি পদার্থবিজ্ঞানের সব রহস্য উদ্ঘাটন করবে।
আসলে ইউটোপিয়ান ও ডেস্টোপিয়ান একই মুদ্রার দুই পিঠ। আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোনো দেবতা নয়— এটি মানুষের তৈরি পণ্যই। পরমাণু অস্ত্র যেমন নিয়ন্ত্রণযোগ্য, হয়তো এআইটাও তেমন।
স্পষ্ট করে বলা যাক : এআই হয়তো একদিন পৃথিবী দখল করতে পারে— এটা তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব। কিন্তু নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, এই ধারণা কি সিলিকন ভ্যালির আগের গল্পগুলোর মতো শোনাচ্ছে না?
আমরা কি সবাই এখন মার্ক জুকারবার্গের মেটাভার্সে বাস করছি? বিটকয়েন কি বিশ্বব্যাপী মুদ্রা হয়ে গেছে। ২০১০-এর দশকে কী বলা হয়নি— সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গণতন্ত্র বাঁচাবে?
এসব হয়তো একদিন সত্যি হবে। আবার নাও হতে পারে।
সূত্র: বিবিসি



