বোন কন্ডাকশন হেডফোন
হাড়ে বাজবে গানের সুর

বধির বেটোফেন পিয়ানোর সঙ্গে যুক্ত ধাতব রড দাঁত িদয়ে চেপে ধরতেন। এভাবেই কম্পন থেকে সুর শুনতেন। এটাই বোন কন্ডাকশন প্রযুক্তির ভিত্তি
বধির মিউজিশিয়ান বেটোফেন সন্ধান পেয়েছিলেন কানের পর্দার বিকল্প। তারই বিবর্তিত রূপ গ্যাজেটপ্রেমীদের বিশেষ এক হেডফোন। লিখেছেন শুভ রহমান
কান দিয়ে শব্দ শুনতে হবে না, একেবারে গান বাজবে মাথার ভেতর। এমন অনুভূতিকেই বাস্তব করেছে বোন কনডাকশন প্রযুক্তি। প্রথম দেখায় এই হেডফোনগুলো একটু অদ্ভুত মনে হতে পারে। কারণ, এগুলো কানের ভেতরে ঢোকে না; বরং কানের ঠিক সামনে গালের হাড়ের (চিকবোন) ওপর চেপে বসে থাকে। আপাতদৃষ্টিতে একে জাদু মনে হলেও এর পেছনে রয়েছে পদার্থবিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞানের এক অনবদ্য মেলবন্ধন, যার ইতিহাস ও বিকাশের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন পৃথিবীর অন্যতম সেরা এক মিউজিশিয়ান।
সাধারণত আমরা যেভাবে শব্দ শুনি, তাকে বলা হয় ‘এয়ার কন্ডাকশন’ বা বায়ু পরিবহন। এই প্রক্রিয়ায় শব্দ-তরঙ্গ বাতাসে ভেসে কানের পর্দায় আঘাত করে এবং সেই কম্পন কানের ভেতরের সূক্ষ্ম হাড়ের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ কান বা কক্লিয়াতে পৌঁছায়। কিন্তু বোন কন্ডাকশন হেডফোন এই পুরো প্রক্রিয়ার প্রথমার্ধকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে যায়। এই হেডফোনগুলো বায়ু তরঙ্গের বদলে সরাসরি যান্ত্রিক কম্পন তৈরি করে। হেডফোনটি যখন গালের হাড়ের ওপর বসে, তখন তার তৈরি সূক্ষ্ম কম্পন সরাসরি মাথার খুলির হাড়ের মধ্য দিয়ে কানের ভেতরের কক্লিয়াতে পৌঁছে যায়। অর্থাৎ, কানের পর্দা ছাড়াই শব্দ সরাসরি অভ্যন্তরীণ কানে চলে যায় এবং মস্তিষ্ক তা শুনতে পায়।
আজকের দিনে এই প্রযুক্তিকে আধুনিক মনে হলেও এর মূল ধারণার পেছনে রয়েছে একজন কিংবদন্তি মিউজিশিয়ানের নাম— লুডভিগ ফান বেটোফেন। অষ্টাদশ শতকের এই জার্মান সুরকার ও পিয়ানোবাদক মাত্র ছাব্বিশ বছর বয়স থেকে ক্রমে তার শ্রবণশক্তি হারাতে শুরু করেন। একপর্যায়ে তিনি প্রায় সম্পূর্ণ বধির হয়ে যান। কিন্তু বেটোফেন দমে যাননি। তিনি শব্দ শোনার জন্য বোন কন্ডাকশনের আদিমতম এক কৌশল আবিষ্কার করেন। তিনি তার পিয়ানোর বডির সঙ্গে একটি ধাতব রড বা কাঠি যুক্ত করতেন এবং সেই কাঠির অন্য প্রান্তটি নিজের দাঁত দিয়ে চেপে ধরতেন। যখন তিনি পিয়ানোতে সুর তুলতেন, তখন পিয়ানোর কম্পন সেই কাঠির মাধ্যমে তার দাঁতে এবং দাঁত থেকে খুলির হাড়ের মধ্য দিয়ে সরাসরি তার অভ্যন্তরীণ কানে পৌঁছাত। এই হাড় দিয়ে শোনার প্রযুক্তির ওপর ভর করেই বধির বেটোফেন তার জীবনের শ্রেষ্ঠ কিছু সিম্ফনি ও সুর সৃষ্টি করে গেছেন।
বেটোফেনের এই ঐতিহাসিক অবদানই মূলত আজকের আধুনিক বোন কন্ডাকশন প্রযুক্তির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল।
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি এসে এই প্রযুক্তিকে প্রথম চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যবহার করা শুরু হয়, বিশেষ করে যাদের কানের পর্দা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে শোনার ক্ষমতা কমে গেছে, তাদের জন্য ‘বোন অ্যানকরড হিয়ারিং এইড’ তৈরি করা হয়। পরে একবিংশ শতাব্দীতে এসে এই প্রযুক্তি সাধারণ মানুষের ব্যবহার্য গ্যাজেট বা হেডফোনে রূপ নেয়।
আজকের বাজারে স্পোর্টসপারসন, অ্যাথলেট ও সাইক্লিস্টদের মধ্যে বোন কন্ডাকশন হেডফোনের জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী। এর সবচেয়ে বড় কারণ হলো পারিপার্শ্বিক সচেতনতা বা সেফটি। প্রথাগত হেডফোন বা ইয়ারবাড কানকে পুরোপুরি ব্লক করে দেয়, যার ফলে রাস্তা দিয়ে হাঁটা বা দৌড়ানোর সময় চারপাশের গাড়ির হর্ন বা কোনো বিপদের শব্দ শোনা যায় না। কিন্তু বোন কন্ডাকশন হেডফোন কানকে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রাখে। ফলে গান শোনার পাশাপাশি বাইরের সমস্ত শব্দও সমানভাবে শোনা যায়, যা দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেতে সাহায্য করে। এ ছাড়া যারা দীর্ঘ সময় হেডফোন ব্যবহার করেন, তাদের কানের ভেতরে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ বা কান ব্যথার ঝুঁকি থাকে। এই হেডফোন কানের ভেতরে না ঢোকায় সেই স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেক কমে আসে।
তবে সব প্রযুক্তির মতোই বোন কন্ডাকশন হেডফোনেরও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যেহেতু এটি বাতাসের বদলে হাড়ের কম্পনের ওপর নির্ভর করে, তাই প্রথাগত প্রিমিয়াম হেডফোনের মতো এতে নিখুঁত ‘বাস’ বা অডিও ফাইল গ্রেড সাউন্ড কোয়ালিটি পাওয়া যায় না। গান শোনার চেয়ে পডকাস্ট, অডিওবুক শোনা কিংবা কল অ্যাটেন্ড করার জন্য এটি বেশি উপযোগী। এ ছাড়া খুব বেশি ভলিউম বাড়িয়ে দিলে গালের হাড়ে একধরনের মৃদু ঝিলিক বা সুড়সুড়ির মতো অনুভূতি হতে পারে, যা অনেকের কাছে অস্বস্তিকর মনে হতে পারে।
বর্তমানে আফটারশকজ, ফিলিপস ও সনির মতো বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বোন কন্ডাকশন হেডফোনের বাজারে নেতৃত্ব দিচ্ছে। তারা দিন দিন এর কম্পন প্রযুক্তিকে আরও উন্নত করছে, যাতে শব্দের মান আরও প্রীতিদায়ক হয় এবং ব্যাটারি লাইফ দীর্ঘ হয়।





