রুপালি পাখির কাণ্ড

অলংকরণ করেছেন রজত
একটা পাখির আজব স্বভাব। অন্যদের নকল করে গান গাইতে চায়। তাতেই যত গণ্ডগোল! কী হলো শেষমেশ, সেই গল্প লিখেছেন জনি হোসেন কাব্য
‘হিচ! কখকখ! মাউউউ!’
বনের ভেতর হঠাৎ এমন বিদঘুটে ডাক। ব্যাপার কী? চমকে উঠল সবাই। ভূত এলো নাকি? আওয়াজটা আসছে কোত্থেকে?
সবাই উঁকি দিয়ে দেখল। শিমুল গাছের সবচেয়ে উঁচু মগডালে বসে গলা ফাটাচ্ছে রুপালি পাখি। তার গায়ের পালকগুলো রুপার মতো ঝকঝকে সুন্দর। কিন্তু গলা দিয়ে বেরোচ্ছে ব্যাঙ আর বিড়ালের কাছাকাছি অদ্ভুত সব ডাক!
নিচে দাঁড়িয়ে বনের পশুরা তো হেসেই লুটোপুটি।
রুপালি পাখির খুব মন খারাপ। পালক সুন্দর হলে কী হবে, তার তো সিংহের মতো জোরালো গর্জন নেই। আবার কোকিলের মতো মিষ্টি সুরও নেই।
একদিন সে ভাবল, ‘ধুর! আমার নিজের তো সুন্দর কোনো সুর নেই। কেউ শুনতেও চায় না। আমি বনের অন্য সবার সুরগুলো গাইব।’
যেই ভাবা সেই কাজ। সে রোজ সকালে উঠে সাধতে লাগল গলা। বনের রাজা সিংহের মতো বুক ফুলিয়ে ‘গরগর’ করতে যায়, কিন্তু গলা দিয়ে বের হয় ‘হিক’। বানরের মতো ‘কিচকিচ’ করতে গিয়ে বিষম খেয়ে কাশতে শুরু করে।
এভাবে জোর করে প্রতিদিন অন্যের ডাক নকল করতে করতে একদিন ঘটল মহাবিপদ! রুপালি পাখি সকালে উঠে মুখ হাঁ করল, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো আওয়াজই বেরোল না। তার গলা একদম বসে গেছে।
গাইতে না পেরে রুপালি পাখি তো অঝোরে কাঁদছে। ঠিক তখন ‘হুতুম-হুত’ শব্দ করে উড়ে এলো বনের সবচেয়ে জ্ঞানী পেঁচা দাদু। চোখে তার গোলচশমা। দাদু মাথা নেড়ে বলল, ‘কী গো রুপালি? তোর এ হাল হলো কী করে?’
রুপালি পাখি ডুকরে কেঁদে উঠল। দাদুকে সব খুলে বলল। দাদু মুচকি হেসে বলল, ‘শোন, সবারই নিজের আলাদা একটা সুর থাকে। সেটাই তার সবচেয়ে সুন্দর সুর। তুই কি জানিস, তোর আসল সুর কোনটা?’
রুপালি পাখি মাথা নাড়ল। না, সে তো জানে না।
পেঁচা দাদু চোখ টিপটিপ করে বলল, ‘কাল ভোরে যখন পুব আকাশে প্রথম সূর্যের আলো ফুটবে, তখন চোখ বন্ধ করবি। অন্য কারও কথা একদম ভাববি না। শুধু চোখ বুঝে খেয়াল করবি, তোর ওই সুন্দর রুপালি পালকে যখন শিরশির বাতাস লাগবে, তখন বুকের ভেতর কেমন আওয়াজ হয়। ভেতর থেকে নিজে নিজে যে সুর বেরিয়ে আসবে, সেটাই তোর আসল ডাক।’
পরদিন ভোরবেলা। টকটকে লাল সূর্য উঠল আকাশে। রুপালি পাখি চোখ বন্ধ করে গাছের ডালে বসল। সে কোকিল, বানর ও সিংহের কথা একদম ভুলে গেল।
হঠাৎ ঝিরঝিরে একটা বাতাস এসে তার রুপালি পালকে কাঁপন তুলল। রিনিঝিনি... রিনিঝিনি। বাতাস আর পালকের ছোঁয়ায় রুপালি পাখির বুকের ভেতর থেকে অদ্ভুত সুন্দর একটা সুর বেরিয়ে এলো— টুই-টুই টিরিং-টিরিং টিং-টিং!
আরে, কী মিষ্টি সে সুর! মনে হলো যেন বনের ভেতর হাজারটা রুপার ঘণ্টা একসঙ্গে বাজছে। সবাই অবাক হয়ে ছুটে এলো। কোকিল চোখ গোল গোল করে বলল, ‘বাহ, তোমার গলা তো দেখছি আমার চেয়েও সুন্দর!’ সিংহ হাসিমুখে বলল, ‘একেবারে মনজুড়ানো গান।’
রুপালি পাখি এবার খুশিতে ডানা ঝাপটে নেচে উঠল। সে বুঝল, সিংহের গর্জন বা কোকিলের ডাক— কোনোটাই তার নয়। নিজের যে মিষ্টি সুর আছে, সেটাই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর গান। এর পর থেকে সে আর কখনোই অন্যকে নকল করার কথা ভাবল না। নিজের সুরেই বনকে রোজ মাতিয়ে রাখল।



