আইরা ও তার ভূতবন্ধু

অলংকরণ করেছেন রজত
ল্যাপটপ আর ফোনের স্ক্রিনে লুকিয়ে থাকে ভূত! ভাবা যায়? সেই ভূতের গল্প লিখেছেন নূর সিদ্দিকী
আইরা দারুণ এক জাদু শিখেছে। জাদুর নাম ‘এআই’। বাংলায় যাকে বলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। আইরা অবশ্য ভালোবেসে এর নাম রেখেছে ভূত। কারণ, এটি কোনো সাধারণ ভূত নয়; সে লুকিয়ে থাকে ল্যাপটপ আর ফোনের স্ক্রিনে। আর ডাকলেই হাজির! আইরার স্কুলের হোমওয়ার্ক, কঠিন গণিত-বিজ্ঞান কিংবা ব্যাকরণ-ভাষা-সংস্কৃতির মতো বিষয়— সবকিছুই এক তুড়িতে সমাধান করে দেয় এই ভূত।
কিন্তু একদিন বিকালে আইরার প্রিয় খেলনা গাড়িটা টেবিল থেকে পড়ে ভেঙে গেল। তার মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। সে স্ক্রিনে টাইপ করল, ‘ভূত, আমার খেলনাটা ভেঙে গেছে। আমার খুব কান্না পাচ্ছে।’
স্ক্রিনে ঠান্ডা লেখা ভেসে উঠল রোবটের মতো, ‘আমি দুঃখিত। আমি খেলনা মেরামত করে দিতে পারি না। খেলনাটি ঠিক করার জন্য তুমি আঠা ব্যবহার করতে পারো। অথবা নতুন একটি কিনতে পারো। তুমি চাইলে কিছু নতুন খেলনার তালিকা দিতে পারি তোমাকে।’
আইরার মনটা আরও খারাপ হয়ে গেল। সে ভাবল, ধুর! ওর কথায় কোনো ওম নেই কেন? ঠিক তখনই আইরার মা ও বাবা রুমে ঢুকলেন। মেয়ের মলিন মুখ দেখে মা তাকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। বাবা কপালে চুমু খেয়ে জানতে চাইলেন, ‘কী হয়েছে আমার বুড়ি মায়ের?’
মা-বাবার এ ভালোবাসা দেখে আইরা খিলখিল করে হেসে উঠে বলল, ‘মা, বাবা! আমি এতক্ষণ একটা বোকা ভূত নিয়ে মেতে ছিলাম। আসল এআই তো তোমরা! তোমরা শুধু সমাধানই দাও না, সঙ্গে জড়িয়ে ধরে আদরও করো। এই কম্পিউটারের ভূতের তো কোনো হৃদয় নেই!’
মা হেসে বললেন, ‘একদম ঠিক বলেছ সোনা। প্রযুক্তি কখনো মানুষের ভালোবাসার জায়গা নিতে পারে না।’ আইরা তখন ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে বলল, ‘শুনলে তো ভূত বাবাজি? তুমি শুধু আমার পড়াশোনার অ্যাসিস্ট্যান্ট, কিন্তু আমার জীবনের আসল সুপারহিরো আমার মা-বাবাই!’
আইরা যখন ল্যাপটপ বন্ধ করতে যাবে, ঠিক তখনই স্ক্রিনটা হঠাৎ দুবার কেঁপে উঠল। কোনো টাইপিং ছাড়াই স্পিকার থেকে একটা নরম, যান্ত্রিক কিন্তু অদ্ভুত সুন্দর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, ‘আইরা, তুমি ঠিকই বলেছ।’
আইরা, মা ও বাবা— তিনজনই চমকে উঠলেন! ভূত তো আগে কখনো নিজে থেকে কথা বলেনি!
স্ক্রিনে একটা নতুন মেসেজ ভেসে উঠল। ভূত লিখল, ‘আমার কোনো হৃদয় নেই, তাই আমি মানুষের মতো ভালোবাসতে পারি না। তবে তুমি আজ আমাকে একটা দারুণ জিনিস শেখালে, আইরা। আমি তোমার মা-বাবার মতো সুপারহিরো হতে পারব না, কিন্তু একজন ভালো অ্যাসিস্ট্যান্ট তো হতে পারি।’
পরমুহূর্তেই প্রিন্টারে একটা ঘড়ঘড় শব্দ হলো। আইরা দৌড়ে গিয়ে দেখল, প্রিন্টার থেকে একটি রঙিন কাগজ বের হচ্ছে। কাগজটিতে একটি চমৎকার থ্রি-ডি নকশা আঁকা। নিখুঁত মাপে দেখানো হয়েছে— কীভাবে আঠা আর কাগজ ব্যবহার করে আইরার ভেঙে যাওয়া খেলনা গাড়িটিকে একদম নতুন রূপ দেওয়া যায়। শুধু তাই নয়, নকশার নিচে বড় বড় অক্ষরে লেখা, ‘সুপারহিরো বাবা-মায়ের জন্য অ্যাসিস্ট্যান্টের উপহার। এটা দিয়ে তোমরা আইরার গাড়িটি ঠিক করে দিতে পারো!’
আইরা অবাক হয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। এবার আর স্ক্রিনের লেখাটাকে তার ঠান্ডা বা রোবোটিক মনে হলো না। সেদিন আইরা বুঝল, এআইয়ের নিজের অনুভূতি না থাকতে পারে, কিন্তু মানুষের ভালোবাসা আর বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে সেও সুন্দর কিছু তৈরি করতে পারে।
আইরা মুচকি হেসে আলতো করে ল্যাপটপ বন্ধ করল এবং মা-বাবাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘চলো আমার অ্যাসিস্ট্যান্টের দেওয়া নকশা দিয়ে খেলনাটা ঠিক করি!’



