হিসাবে ভুল ছিল

আঁকা : সোহানুর রহমান
নির্মমভাবে খুন হয় এক শিশু। পরিবারের অভিযোগ বিরোধী পক্ষের দিকে। কিন্তু তদন্তে বেরিয়ে আসে, মূল আসামি যে ঘরেই। লিখেছেন জেমাম আহমেদ
রাত গভীর। সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার কেজাউরা গ্রাম নিস্তব্ধ। তারিখটা ২০১৯ সালের ১৩ অক্টোবর। একটি ঘরে বাবা আবদুল বাছিরের পাশে ঘুমিয়ে ছিল পাঁচ বছরের শিশু তুহিন মিয়া। পাশের ঘরে মা মনিরা বেগম। বাইরে অন্ধকার। রাতের কোনো একসময় ঘরের দরজা খুলে যায়। তুহিনকে নিয়ে যাওয়া হয় বাইরে। ভোরে ঘুম ভাঙার পর গ্রামবাসীর সামনে আসে ভয়াবহ দৃশ্য। বাড়ির কাছের একটি গাছে ঝুলছে তুহিনের মরদেহ। পেটে বিদ্ধ দুটি ছুরি। শরীরে নির্মম নির্যাতনের চিহ্ন। কেটে নেওয়া হয়েছিল দুই কান ও যৌনাঙ্গ। খবর ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগেনি।
কেজাউরা গ্রাম মুহূর্তেই পরিণত হয় জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে। কিন্তু সেই সকালের আতঙ্কের মধ্যেও একটি বিষয় স্পষ্ট ছিল। এই হত্যাকাণ্ড হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো সাধারণ অপরাধের মতো মনে হচ্ছিল না। মরদেহের অবস্থান, শরীরে আঘাতের ধরন ও পেটে বিদ্ধ ছুরি— সবকিছুতেই যেন ছিল সেই বার্তা। কিন্তু কে হত্যা করল তুহিনকে? প্রথম সন্দেহ যায় গ্রামের পুরনো বিরোধের দিকে। কারণ, কেজাউরায় কয়েকটি পরিবারের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ এবং মামলা ও পাল্টাপাল্টি সংঘাতের ইতিহাসও ছিল। তাই প্রথম ধারণা ছিল, প্রতিপক্ষের কেউ হয়তো প্রতিশোধ নিতে শিশুটিকে হত্যা করেছে।
তুহিনের মা মনিরা বেগম পরদিন দিরাই থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। পুলিশ তদন্তে নামে। শুরু হয় জিজ্ঞাসাবাদ। কিন্তু তদন্ত যত এগোয়, সন্দেহের দিক তত বদলাতে থাকে। বাইরে নয়; নজর যায় ঘরের ভেতরে। প্রথম বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়, ঘুমন্ত তুহিনকে ঘর থেকে বের করে কীভাবে গাছ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হলো। সে ছিল বাবার পাশে। রাতের গভীরে একটি শিশুকে ঘর থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া হলো, অথচ ঘুমন্ত বাবা কিছু টের পেলেন না। এ প্রশ্নই তদন্তের গতিপথ পাল্টে দেয়। একে একে গ্রেপ্তার হন তুহিনের বাবা আবদুল বাছির, চাচা নাসির উদ্দিন, আবদুল মোছব্বির, জমশেদ আলী এবং ১৭ বছর বয়সী চাচাতো ভাই শাহরিয়ার আহমদ।
পুলিশের তদন্তে দাবি করা হয়, তুহিনকে হত্যা করে স্থানীয় প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এর অংশ হিসেবে তুহিনের পেটে বিদ্ধ দুটি ছুরির হাতলে প্রতিপক্ষ হিসেবে পরিচিত দুই ব্যক্তির নাম লেখা ছিল।
যেন প্রথম দেখাতেই তদন্তকারীরা অন্যদিকে ছুটে যান। কিন্তু যে গল্প অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার কথা ছিল, তদন্ত শেষ পর্যন্ত সেই গল্পেই আটকে থাকেনি; বরং আলামত, জিজ্ঞাসাবাদ এবং সাক্ষ্যের সূত্র ধরে তদন্ত এগিয়ে যায় পরিবারের সদস্যদের দিকে। ২০১৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর পাঁচজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। চারজন প্রাপ্তবয়স্ক। একজন কিশোর। শুরু হয় বিচারিক প্রক্রিয়া।
২০২০ সালের ৭ জানুয়ারি প্রাপ্তবয়স্ক চার আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। কিশোর আসামির বিচার চলে শিশু আদালতে। মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ ২৬ জন সাক্ষী হাজির করে। আদালতে সাক্ষ্য দেন তুহিনের মা মনিরা বেগমও। তার সাক্ষ্যে উঠে আসে সেই রাতের গুরুত্বপূর্ণ বিবরণ। ১৩ অক্টোবর রাতে তুহিন তার বাবা আবদুল বাছিরের সঙ্গে একই খাটে ঘুমিয়ে ছিল। মা ছিলেন পাশের ঘরে। গভীর রাতে তুহিনের চাচাতো বোন তাদের ঘুম থেকে ডেকে জানান, ঘরের দরজা খোলা। তখন তুহিনকে আর বাবার পাশে পাওয়া যায়নি। কয়েক ঘণ্টা পর জানা যায়, শিশুটিকে হত্যা করে বাড়ির পাশের গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।
শিশুটির শেষ রাতের ঘটনাপ্রবাহ পুনর্গঠন করতে গিয়ে তদন্তকারীদের সামনে বারবার ফিরে আসে একই প্রশ্ন। কে জানত, তুহিন কখন ঘুমাবে? কে জানত ঘরের ভেতরের পরিস্থিতি? কে জানত, তাকে কখন বাইরে নেওয়া যাবে? আর কেনইবা তাকে এমনভাবে হত্যা করা হলো, যাতে পুরো ঘটনাটি একটি প্রতিশোধমূলক হত্যাকাণ্ড বলে মনে হয়?
তদন্তে নাসির উদ্দিন ও কিশোর আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির কথাও আসে। ঘটনার রাতে শিশু তুহিন যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন তার বাবা আবদুল বাছির নিজেই তাকে ঘর থেকে বের করে ঘাতকদের হাতে তুলে দেন। ঘরের বাইরে ওত পেতে থাকা চাচা ও চাচাতো ভাই মিলে ঘুমন্ত শিশুটিকে গলা কেটে হত্যা করে। হত্যাকাণ্ড নিশ্চিত করার পর অপরাধের আলামত হিসেবে তুহিনের পেটে দুটি ছুরি বিদ্ধ করা হয় এবং লাশটি একটি গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়।
২০১৯ সালের শেষ দিকে তদন্ত শেষ হওয়ার পর মামলাটি দ্রুত বিচারিক পর্যায়ে যায়। ২০২০ সালের ১০ মার্চ শিশু আদালত ১৭ বছর বয়সী শাহরিয়ার আহমদকে আট বছরের আটকাদেশ দেন। ছয় দিন পর ১৬ মার্চ আসে মূল মামলার রায়।
সুনামগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ ওয়াহিদুজ্জামান শিকদার তুহিনের বাবা আবদুল বাছির ও চাচা নাসির উদ্দিনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। একই রায়ে আবদুল মোছব্বির ও জমশেদ আলী খালাস পান। আদালতের রায়ে একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু তুহিন হত্যার রহস্যের সবচেয়ে অন্ধকার জায়গাটি থেকে যায় হত্যার উদ্দেশ্য ঘিরে। পুলিশের তদন্ত ও রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্যে সামনে এসেছিল প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর পরিকল্পনার কথা। স্থানীয় বিরোধের জেরেই হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছিল বলে তদন্তে উঠে আসে।
একটি শিশুকে হত্যা করে তার মৃত্যুকেই ব্যবহার করা হয়েছিল অন্য পক্ষের বিরুদ্ধে।
শিশুটির পৃথিবী ছিল খুব ছোট। মা। বাবা। ঘর। গ্রামের পথ। সেই ঘরেই সে ঘুমিয়ে ছিল শেষবার। যে ঘর শিশুটির নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার কথা, তদন্তের একপর্যায়ে সেই ঘর থেকেই বেরিয়ে আসে সন্দেহের সূত্র। যে বাবা সন্তানের পাশে ঘুমিয়ে ছিলেন, শেষ পর্যন্ত তিনিই হয়ে ওঠেন মামলার অন্যতম প্রধান আসামি।



