নরকের নাম জোনটাউন

জিম জোন্স (বামে) এবং জোনটাউনে মৃত্যুর মিছিল
সুদর্শন যুবক জিম জোন্স। প্রতিষ্ঠা করেন ‘পিপলস টেম্পল’। মানুষকে শোনাতেন কষ্টহীন ও সাম্যের পৃথিবীর গল্প। কিন্তু নিজেই হয়ে ওঠেন এক ভয়ংকর, বিকারগ্রস্ত সাইকোপ্যাথ। লিখেছেন আখলাকুজ্জামান অনিক
গায়ানার গহিন অরণ্য। ১৯৭৮ সালের ১৮ নভেম্বরের বিকাল। জঙ্গলের স্যাঁতসেঁতে গন্ধের সঙ্গে মিশে ছিল এক অদ্ভুত তীব্র ঘ্রাণ— গ্রেপ ফ্লেভারের ফলের জুসের সঙ্গে মেশানো সায়ানাইডের হাড়হিম করা গন্ধ। বিশাল এক কাঠের প্যাভিলিয়নের চারপাশে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে ৯১৮টি নিথর দেহ— নারী, পুরুষ আর অসংখ্য শিশু। দূর থেকে মনে হবে রঙিন কাপড়ে বোনা বিশাল গালিচা। প্রায় সবার মুখ মাটিতে গোঁজা, একে অন্যকে জড়িয়ে আছে তারা। আর এ লাশের পাহাড়ের ঠিক মাঝখানে, একটি কাঠের চেয়ারে মাথা এলিয়ে পড়ে আছে এক ব্যক্তি। চোখে কালো সানগ্লাস আর মাথার ডান পাশে তাজা গুলির ক্ষত। জিম জোন্স। যে নিজেকে ঈশ্বর ভাবত, অথচ পৃথিবীর বুকে রচনা করে গেল এক নিখুঁত নরক।
এই বিভীষিকার শুরু ১৯৫০-এর দশকে আমেরিকায়। ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের সুদর্শন যুবক জিম জোন্সের ছিল কথা বলার জাদুকরী ক্ষমতা। আমেরিকায় বর্ণবাদের চরম উৎকর্ষের সেই সময়ে সে প্রতিষ্ঠা করল ‘পিপলস টেম্পল’ নামের একটি চার্চ। জোন্স তাদের শোনাত সাম্য, সমাজতন্ত্র আর কষ্টহীন এক পৃথিবীর স্বপ্ন। এ মায়াজালে আটকা পড়ে হাজার হাজার মানুষ নিজেদের জমানো অর্থ ও সহায়-সম্পত্তি চার্চের নামে লিখে দিয়ে জিম জোন্সের পায়ে লুটিয়ে পড়ল।
সত্তরের দশকের মাঝামাঝি জোন্সের চার্চের ভেতরের অন্ধকার রূপ-শারীরিক নির্যাতন, অর্থ আত্মসাৎ আর মগজ ধোলাইয়ের খবর আমেরিকান পত্রিকায় ছাপতে শুরু করে। আইন ও পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে জোন্স তার প্রায় হাজারখানেক অন্ধ অনুসারীকে নিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ গায়ানার দুর্গম জঙ্গলে পালিয়ে যায়। সেখানে সে গড়ে তোলে তার স্বপ্নের শহর ও অনুসারীদের জন্য পৃথিবীর বুকে একমাত্র স্বর্গ—‘জোনটাউন’।
জোনটাউনে পা রাখার পর অনুসারীরা বুঝতে পারে, এটি স্বর্গ নয়, বরং এক ভয়ংকর কারাগার
তবে জোনটাউনে পা রাখার পর অনুসারীদের স্বপ্নের ঘোর কাটতে সময় লাগেনি। তারা বুঝতে পারে, এটি স্বর্গ নয়, বরং এক ভয়ংকর কারাগার। সবার পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে চারপাশে বসানো হয় সশস্ত্র প্রহরীদের কড়া পাহারা। রাতে শুরু হতো জোন্সের উন্মাদ ভাষণ। সে বোঝাত, আমেরিকান সরকার তাদের মারতে আসছে। প্রায়ই মধ্যরাতে ‘হোয়াইট নাইট’ নামের মহড়ার আয়োজনে ঘুমন্ত মানুষদের জাগিয়ে তুলে তাদের হাতে বিষের কাপ ধরিয়ে দিয়ে আনুগত্য প্রমাণের জন্য পান করতে বলা হতো। যদিও সেগুলো সত্যিকারের বিষ ছিল না, কিন্তু জোন্স মূলত তাদের এক ভয়ংকর চূড়ান্ত পরিণতির জন্য প্রস্তুত করছিল।
আমেরিকায় থাকা পরিবারগুলোর অভিযোগে সাড়া দিয়ে ১৯৭৮ সালের নভেম্বরে ক্যালিফোর্নিয়ার কংগ্রেসম্যান লিও রায়ান সাংবাদিক ও উদ্বিগ্ন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে জোনটাউন পরিদর্শনে আসেন। ১৭ নভেম্বর জিম জোন্স উৎসবের আয়োজন করে তাদের বোঝানোর চেষ্টা করে যে, সবাই সুখে আছে। কিন্তু পরদিন সকালে কয়েকজন অনুসারী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গোপনে লিও রায়ানের হাতে চিরকুট গুঁজে দিয়ে বলে, ‘আমাদের বাঁচান, আমরা এখান থেকে যেতে চাই। এটা একটা নরক।’
লিও রায়ান পনেরোজন দলত্যাগী অনুসারীকে নিয়ে আমেরিকার উদ্দেশে রওনা দেওয়ার জন্য কাছের পোর্ট কাইতুমা এয়ারস্ট্রিপে পৌঁছান। প্লেনে ওঠার প্রস্তুতিকালেই জোন্সের পাঠানো গুণ্ডারা সেখানে হাজির হয়ে এলোপাতাড়ি গুলি শুরু করে। ঘটনাস্থলেই রক্তে লুটিয়ে পড়েন লিও রায়ান, তিনজন সাংবাদিক এবং একজন দলত্যাগী অনুসারী।
সরকারি কর্মকর্তাকে হত্যার খবর জোনটাউনে পৌঁছাতেই জিম জোন্স বুঝে যায়, তার খেলা শেষ। সে তড়িঘড়ি করে সবাইকে মূল প্যাভিলিয়নে জড়ো করে শুরু করে ইতিহাসের অন্যতম মর্মান্তিক ম্যাসাকার। সবার আগে শিশুদের বিষ খাওয়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। শিশুদের তীক্ষ্ণ আর্তনাদ ও বিষের যন্ত্রণায় ভারী হয়ে ওঠে জোনটাউনের আকাশ। এরপর আসে বড়দের পালা। কেউ পালানোর চেষ্টা করলে গুলি করার ভয় দেখানো হয়।
মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ৯১৮ জন মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয় এক বিকারগ্রস্ত মানুষের জেদ আর অন্ধ বিশ্বাস। সবশেষে, অনুসারীদের লাশের স্তূপের মাঝে দাঁড়িয়ে জিম জোন্স নিজের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে ট্রিগার চাপে।






