খলিলুল্লাহর কথা মনে আছে?

আঁকা : সোহানুর রহমান
১৯৭৫ সালের ৩ এপ্রিল। ‘দৈনিক বাংলা’ পত্রিকার ভেতরের পাতায় একটি ছোট বক্স নিউজ দেখে শিউরে উঠেছিল গোটা দেশ। খবরের শিরোনামটি ছিল পিলে চমকানোর মতো— ‘সে মরা মানুষের কলজে খায়!’ খলিলুল্লাহ নামের ওই ব্যক্তিকে এখনকার পাঠকদের সামনে ফিরিয়ে এনেছেন ইমরানুর রহমান
পত্রিকার সংবাদটিতে ঝাপসা সাদা-কালো ছবিতে দেখা গিয়েছিল এক তরতাজা যুবককে, যে কি না একটি চেরা লাশ থেকে নির্দ্বিধায় মানুষের কাঁচা কলিজা বের করে মুখে পুরছে। সেই খবরটিই অবসান ঘটায় ঢাকার বুকে নীরবে চলা এক ভয়ংকর, বিকৃত আর অবিশ্বাস্য অধ্যায়ের। উন্মোচিত হয় বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম ও সবচেয়ে আলোচিত ‘ক্যানিবাল’ বা নরখাদক খলিলুল্লাহর নাম।
ঢাকার লালবাগ এলাকায় বাস করা খলিলুল্লাহর নরমাংস খাওয়ার শুরুটা ঠিক কবে হয়েছিল, তা সে নিজেও স্পষ্ট মনে করতে পারেনি। তবে এই ভয়ংকর অভ্যাসের সূচনা হয়েছিল তার ছোটবেলার বন্ধু রবি ডোমের হাত ধরে। খলিলুল্লাহ প্রতিদিন লালবাগ থেকে হেঁটে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে আসত আড্ডা দিতে। রবির বাবা ছিলেন তখন ঢাকা মেডিকেল মর্গের প্রধান ডোম। লাশের গন্ধ, কাটাছেঁড়া আর রক্তের মধ্যে বড় হওয়া রবির বাবা একদিন নিজের ছেলে রবি এবং খলিলুল্লাহকে মরা মানুষের মাংস কেটে খেতে দেন।
ঢাকার বিভিন্ন গোরস্তানের কবর খুঁড়ে সে কাফনের কাপড় চুরি করত
সেই শুরু। যা ছিল সামান্য এক কৌতূহল আর বিকৃত শখ, তা একসময় রূপ নেয় তীব্র পৈশাচিক নেশায়। মানুষের মাংসের স্বাদ খলিলুল্লাহর মগজে এমনভাবে চেপে বসেছিল, প্রতি দুই সপ্তাহ পরপর মানুষের মাংস না পেলে সে একেবারে দিশেহারা ও পাগলের মতো হয়ে যেত। মানুষের শরীরের সব অংশের মধ্যে তার সবচেয়ে বেশি লোভ ছিল ঊরুর নরম মাংসের প্রতি।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বন্ধু রবি ডোম একপর্যায়ে এই ভয়ংকর অভ্যাস বা নরমাংস খাওয়া ছেড়ে দিতে পেরেছিল; কিন্তু খলিলুল্লাহর পক্ষে সেই নেশা ত্যাগ করা সম্ভব হয়নি। মাংসের খোঁজে সে প্রায়ই হন্যে হয়ে ছুটে যেত ঢাকা মেডিকেল কলেজ এবং মিটফোর্ড হাসপাতালের মর্গে। সেখানে থাকা অন্য দুই ডোম— গোপাল ও সোনা তাকে টাকার বিনিময়ে কিংবা খাতিরের কারণে মরা মানুষের মাংস কেটে সরবরাহ করত। খলিলুল্লাহর এই বিকৃতি শুধু মর্গের চার দেয়ালেই সীমাবদ্ধ ছিল না। একবার সে তার নিজের আপন খালা মমিনাকে খাসির মাংসের কথা বলে মানুষের মাংস রান্না করে খাইয়ে দিয়েছিল! খালার অজান্তেই ঘটে যাওয়া এই ঘটনাটি প্রমাণ করে, খলিলুল্লাহর ভেতরকার মানবিক বোধ ততদিনে কতটা লোপ পেয়েছিল।
পুলিশ খলিলুল্লাহকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় রমনা থানায়
খলিলুল্লাহর আরেকটি ভয়ংকর নেশা ও আয়ের উৎস ছিল। সে ছিল একজন দক্ষ কবরচোর। ঢাকার বিভিন্ন গোরস্তান থেকে সদ্য লাশ দাফন করা কবর খুঁড়ে সে কাফনের কাপড় চুরি করত। তবে এই চুরির পেছনে ছিল এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক বৈপরীত্য বা প্যারাডক্স। খলিলুল্লাহ মানুষের মাংস খেত স্রেফ নিজের ভেতরের আদিম ক্ষুধার তাড়নায়, কিন্তু কবর থেকে চুরি করা কাফনের কাপড়গুলো সে নিয়ে যেত পুরান ঢাকার মৌলভীবাজারের কাছাকাছি পুরনো কাপড়ের দোকানে। সেখানে সেগুলো বিক্রি করে যে টাকা পেত, তা দিয়ে সে বাজার থেকে ডাল, চাল বা সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক খাবার কিনে খেত। অর্থাৎ, তার বেঁচে থাকার স্বাভাবিক খরচ আসত মৃত মানুষের কাফন বিক্রি করে, আর তার রসনাতৃপ্তি হতো লাশের মাংস চিবিয়ে।
১৯৭৫ সালের এপ্রিলের সেই ঘটনার পর চারদিকে যখন চরম উত্তেজনা আর আতঙ্ক, তখন টনক নড়ে কর্তৃপক্ষের। কিছুদিন পরই খলিলুল্লাহ যখন তার সেই চেনা নরমাংসের নেশায় আবারও হাসপাতালের মর্গে পা রাখে, তখন ওত পেতে থাকা কর্মচারীরা তাকে হাতেনাতে ধরে ফেলে।
তাকে সরাসরি হাজির করা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক কর্নেল এম এল রহমানের কক্ষে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে কর্নেল সাহেব দ্রুত ডেকে পাঠান কলেজের অধ্যক্ষ ডা. এম এ জলিল এবং তৎকালীন প্রখ্যাত মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সামাদসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসকদের।
সবাই মিলে খলিলুল্লাহকে জেরা শুরু করতেই বেরিয়ে আসে তার দীর্ঘদিনের নরমাংস ভোজনের লোমহর্ষক ইতিহাস। পরে পুলিশ ডাকা হয় এবং তারা তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় রমনা থানায়।
লাঞ্ছনা থেকে বাঁচতে খলিলুল্লাহ জীবনের শেষ দিনগুলোতে বেছে নিয়েছিল আজিমপুর গোরস্তানকে
তবে পুলিশ ও চিকিৎসকরা তার স্বীকারোক্তি থেকে নিশ্চিত হন, সে কোনো সাধারণ অপরাধী নয়, জটিল মানসিক রোগে আক্রান্ত। ফলস্বরূপ, তাকে কোনো সাধারণ কারাগারে না পাঠিয়ে চিকিৎসার জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হয় পাবনা মানসিক হাসপাতালে।
পাবনা মানসিক হাসপাতালে দীর্ঘদিনের নিবিড় চিকিৎসা এবং ওষুধের প্রভাবে খলিলুল্লাহর ভেতরের সেই ভয়ংকর উন্মাদনা ধীরে ধীরে কমে আসে। সে নরমাংস খাওয়ার নেশা থেকে মুক্ত হয়ে মোটামুটি সুস্থ জীবনে ফিরে আসে।
কিন্তু সুস্থ হয়ে সমাজে ফিরে আসার পর খলিলুল্লাহর জন্য অপেক্ষা করছিল এক অন্যরকম নরক। সমাজ তাকে সুস্থ মানুষ হিসেবে গ্রহণ করেনি। ‘কলিজাখেকো’, ‘রাক্ষস’ কিংবা ‘মানুষখেকো’ তকমা লেগে যাওয়ায় কেউ তাকে কোনো কাজ দিত না, সমাজ বা পরিবারে মাথা গোঁজার ঠাঁই দিত না। খ্যাপাটে জনতা অনেক সময় তাকে রাস্তায় দেখলেই কৌতূহলবশত ঢিল মারত বা শারীরিকভাবে চরম আঘাত করত।
লাঞ্ছনা আর অপমানের হাত থেকে বাঁচতে খলিলুল্লাহ জীবনের শেষ দিনগুলোতে বেছে নিয়েছিল আজিমপুর গোরস্তানকে। এবার আর মরা মানুষের মাংসের লোভে কিংবা কাফন চুরির উদ্দেশ্যে নয়; সমাজ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য, একটুখানি শান্তির সন্ধানে সে গোরস্তানের নীরবতাকে আপন করে নিয়েছিল।
খলিলুল্লাহর শেষ বয়সটা কেটেছে চরম অবহেলা, দারিদ্র্য আর দুর্বিষহ যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে। শুধু সে নিজে নয়, তার এই অতীতের ভুলের খেসারত দিতে হয়েছে তার পরিবার ও সন্তানদেরও। সমাজের প্রতিটি কোণ থেকে জোটা লাঞ্ছনা আর ঘৃণা সইতে সইতে একসময় সে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে।
টাকার অভাবে তার ছেলে বাবার ন্যূনতম চিকিৎসাটুকুও করাতে পারেনি। অবহেলা আর বিনা চিকিৎসায় ভুগতে ভুগতে ২০০৫ সালের এক তপ্ত ভরদুপুরে মুখ-হাত-পা ফুলে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে এই একদা ভয়ংকর কিন্তু পরে সমাজ-বিতাড়িত মানুষটি।





