বৃষ্টিভেজা বিকালে

আঁকা : অনন্যা বিশ্বাস
২০১৬ সালের বর্ষাকালের কথা। এক পার্কে আমাদের সঙ্গে যা ঘটে গেল, তার কোনো যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা খুঁজে পাইনি আজও। সেদিন আমার সঙ্গে ছিল এক বান্ধবী, ধরা যাক তার নাম ‘নিধা’। বর্ষার মেঘে আকাশ ঢাকা ছিল, তাই পুরো পার্কটাই ছিল প্রায় নির্জন। হাঁটতে হাঁটতে আমরা পুকুরের ধারে একটা পুরনো গাছের নিচে গিয়ে বসলাম।
জায়গাটা নিয়ে আগে থেকেই নানা কথা শুনেছিলাম। দুপুরের দিকে নাকি লোকজন ওদিকে খুব একটা আসে না। আমি সেগুলো তেমন পাত্তা দিইনি। আমাদের সামনে একটা সরু পথ পার্কের মূল অংশে উঠে গেছে। সেই পথ ছাড়া ওদিক থেকে বের হওয়ার আর কোনো রাস্তা নেই। গল্পে মশগুল ছিলাম। এমন সময় টিপটিপ করে বৃষ্টি শুরু হলো। চারপাশ ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে উঠছিল। ঠিক তখনই একজন বৃদ্ধা এসে আমাদের সামনে দাঁড়ালেন। গায়ে পুরনো ভেজা শাড়ি, মাথাভর্তি সাদা চুল। বয়স আশির কাছাকাছি। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন, ‘বাবা, ১০টা টাকা দাও।’
পকেট থেকে ২০ টাকার একটা নোট বের করে তার হাতে দিলাম। তিনি নোটটা নিয়ে মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন। সেই হাসিটা আজও আমার মনে আছে... কেমন যেন অদ্ভুত শান্ত, অথচ ব্যাখ্যা করা যায় না। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে আমাদের সামনের সরু পথটা ধরে হাঁটতে শুরু করলেন। আমরা আবার নিজেদের গল্পে ফিরে গেলাম। মিনিটখানেক, হয়তো দুই মিনিট কেটেছে... হঠাৎ নিধা কথা বলা বন্ধ করে দিল। ওর মুখের দিকে তাকাতেই বুঝলাম, কিছু একটা হয়েছে। ও ফ্যাকাশে মুখে পথটার দিকে তাকিয়ে আছে। তারপর হঠাৎ আমার হাত চেপে ধরে বলল, ‘চলো। এখনই এখান থেকে বের হতে হবে।’ আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী হয়েছে?’
‘পরে বলব। আগে চলো।’ বৃষ্টি তখন আরও বেড়েছে। কিন্তু নিধা একমুহূর্তও সেখানে থাকতে রাজি নয়। পার্ক থেকে বেরিয়ে একটা রিকশায় উঠলাম। কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বললাম না। শুধু বৃষ্টির শব্দ আর রিকশার চাকার ছপছপ আওয়াজ। হঠাৎ নিধা নিচু গলায় বলল, ‘মহিলাকে কোথাও দেখেছিলে?’ আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘মানে?’
ও বলল, ‘আমি পুরো সময় ওই পথটার দিকেই তাকিয়ে ছিলাম। এক-দুই মিনিটের মধ্যে একজন আশি বছরের মানুষ এতটা পথ হেঁটে কোথায় গেল? সামনে তো কাউকে দেখলাম না। যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল!’
আমি কোনো উত্তর দিতে পারলাম না। পথটা আমাদের বসার জায়গা থেকেই পুরো দেখা যাচ্ছিল। মাঝখানে কোনো মোড় ছিল না, লুকানোর মতোও কিছু ছিল না।






