সোনাইছড়িতে সাবধান!
- মিরসরাইয়ের সোনাইছড়ি ট্রেইলে ট্র্যাকিংয়ে কিংবা ক্যাম্পিং করতে গিয়ে নানা ধরনের ভুতুড়ে কাণ্ড-কীর্তির মুখোমুখি হয়েছেন বলে জানিয়েছেন অনেকে। এমন দুটি অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হলো

জয় উদ্দিনের তোলা ছবিতে গ্রাফিক্স করে বসানো হয়েছে ছায়ামূর্তিটি
সব ডাক মানুষের নয়
সোনাইছড়ি নিয়ে নানা গল্প আগেই শুনেছিলাম। কেউ বলে দেশের অন্যতম সুন্দর ট্রেইল, আবার কারও মতে সন্ধ্যার পর এই জঙ্গল এক গোলকধাঁধা— সব পথ যেখানে এক হয়ে যায়। পাহাড় নিয়ে মানুষের একটু বাড়িয়ে বলার অভ্যাস থাকে, তাই এসব শুনে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলাম।
২০২২-২৩ সালের দিকে আমি, শাখাওয়াত আর সাদ্দাম একদিন রওনা হলাম সোনাইছড়ির উদ্দেশে। জ্যাম ঠেলে যখন ট্রেইলে ঢুকলাম, তখন দুপুর ১টা। আকাশ পরিষ্কার, ঝকঝকে রোদ। দুই পাশে উঁচু পাহাড়, বাঁশঝাড় আর লতাপাতায় ঘেরা বিশাল সব পাথর। ভেজা মাটির গন্ধ আর ঝরনার শব্দে চারপাশটা ছিল দারুণ। সাদ্দাম ছবি তোলায় ব্যস্ত আর শাখাওয়াত মুগ্ধ চোখে চারপাশ দেখছে।
হাঁটতে হাঁটতে মাঝপথে কাঁধে বাঁশ নিয়ে ফেরা দুজন স্থানীয় লোকের দেখা মিলল। আমাদের দেখে একজন সতর্ক করলেন, ‘বেশি দেরি করবেন না। সন্ধ্যার পর এই জঙ্গল ভালো না। অনেকেই পথ হারায়, পেছন থেকে ডাক শোনে, কেউ কেউ সাদা কাপড় পরা মানুষও দেখেছে।’
আমরা হেসে উড়িয়ে দিয়ে সামনে এগিয়ে গেলাম। আরও ভেতরে, এক ছোট্ট ছাউনির পাশে কাঠ কুড়ানো এক বৃদ্ধের দেখা মিলল। বিদায় নেওয়ার আগে তিনি নিচু গলায় বললেন, ‘যদি কখনো মনে হয় কেউ পেছন থেকে ডাকছে, ফিরে তাকাবেন না।’
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন?’
বৃদ্ধ রহস্যময় হেসে বললেন, ‘সব ডাক মানুষের হয় না।’
পরপর দুজনের মুখে একই কথা শুনে মনে একটু অস্বস্তি জমলেও পাত্তা দিলাম না।
শেষ ঝরনার কাছে গিয়ে আমরা গল্পে মজে গেলাম। যখন ফেরার কথা মনে হলো, ততক্ষণে আলো দ্রুত ফুরিয়ে এসেছে। জঙ্গলের ভেতরে সূর্য ডোবার আগেই অন্ধকার নেমে আসে। দুপুরে যেখানে পর্যটকদের কোলাহল ছিল, সেখানে এখন শুধু আমরা তিনজন। চারপাশটা হঠাৎ অস্বাভাবিক নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
হাঁটা শুরু করার কিছু সময় পর পেছন থেকে কারও হাঁটার শব্দ পেলাম। আমরা থামতেই শব্দটাও থেমে গেল। আবার হাঁটতেই আবার শব্দ। পেছনে তাকিয়ে দেখলাম কেউ নেই— শুধু জমাট অন্ধকার।
কিছুদূর গিয়ে দেখি একটা বড় পাথরের গায়ে লাল কাপড় বাঁধা। আমি থমকে দাঁড়িয়ে বললাম, ‘এই জায়গাটা কি আমরা আগে পার হইনি?’
সাদ্দাম আঁতকে উঠে বলল, ‘হ্যাঁ, এখানেই তো একটু আগে দাঁড়িয়েছিলাম!’
পথ বদলে অন্যদিকে হাঁটলাম। কিন্তু ঠিক দশ মিনিট পর আবার সেই একই লাল কাপড় বাঁধা পাথর! এবার আমাদের মুখ শুকিয়ে গেল। ঠিক তখনই ঝিরির ওপাশে সাদা কাপড় পরা একজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। অবয়বটা ধীরে ধীরে বাঁশঝাড়ের আড়ালে মিলিয়ে গেল। একটু ভয় করলেও সেদিকে এগিয়ে গেলাম। কিন্তু কাউকে পাওয়া গেল না।
হঠাৎ দূর থেকে এক নারীর কান্নার শব্দ ভেসে এলো। কয়েক সেকেন্ড পর আবার সব নিস্তব্ধ। ভয়ে আমরা প্রায় দৌড়াতে শুরু করলাম।
হঠাৎ খুব কাছ থেকে কে যেন ফিসফিস করে আমার নাম ধরে ডাকল— ‘মিরাজ...’
আমি থমকে গেলাম। বৃদ্ধের সেই কথাটা হাতুড়ির মতো বাজল মাথায়, সব ডাক মানুষের হয় না।
আমরা মরিয়া হয়ে দৌড়াচ্ছি। হঠাৎ সাদ্দাম হাত চেপে ধরে ইশারা করল। সামনে একটা শুকনো গাছের নিচে সাদা পাঞ্জাবি পরা এক বৃদ্ধ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে। একটুও নড়ছেন না। হঠাৎ এক ঝোড়ো বাতাস এসে চোখে ধুলো ছুড়ে দিল। দুই সেকেন্ড পর চোখ মেলতেই দেখি, সামনে কেউ নেই! ফাঁকা পথ!
আমরা আর একমুহূর্তও দাঁড়াইনি। একছুটে যখন জঙ্গল থেকে লোকালয়ে বের হলাম, তখন বুক থেকে যেন পাথর নামল। চায়ের দোকানি আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে সবজান্তা ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে শুধু বললেন, ‘দেরি হয়ে গিয়েছিল, তাই না?’
পাহাড় ধসের রাত
ক্যাম্পিং আমার নেশা ও মানসিক শান্তির ওষুধ। কিন্তু ২০২২ সালের অক্টোবরে বন্ধু আরিফসহ আমরা চারজন সোনাইছড়িতে যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলাম, তা সারা জীবন মনে রাখার মতো।
ট্রেইলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত হয়ে গেল। আমরা সবাই ক্লান্ত। আরিফ রাতের ঝরনার ছবি তুলতে ভালোবাসে, তাই ও ক্যামেরা নিয়ে নেমে গেল। তখন রাত সাড়ে ১১টা। চারজনের মধ্যে দুজনের তাঁবু ঝরনার ঠিক পাশে আর আমার ও আরিফের তাঁবু একটু দূরে। ক্লান্ত থাকায় আমি তাঁবুতেই রয়ে গেলাম।
মিনিট পনেরো পর হঠাৎ এক বিকট শব্দে পুরো জঙ্গল কেঁপে উঠল! মনে হলো পাশেই বিশাল কোনো পাহাড় ধসে পড়েছে। ভয়ে আমার গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল। চিৎকার করে আরিফকে ডাকলাম। আরিফ ছুটে এলো। দুজনে লাইট জ্বালিয়ে চারপাশ খুঁজলাম, কিন্তু কোথাও ধসের কোনো চিহ্ন নেই। অথচ শব্দটা আমরা চারজনই স্পষ্ট শুনেছিলাম।
ভয় কাটাতে সবাই ঝরনার পাশে চেরাগ জ্বালিয়ে আড্ডা দিলাম। কিন্তু আমার চোখ থেকে ঘুম উধাও। রাত ২টার দিকে খাওয়া শেষ করে যখন শুতে গেলাম, তখন শুরু হলো অন্য এক অদ্ভুত উপদ্রব।
কোনো এক নাম না জানা প্রাণীর গোঙানির মতো ডাক। আমি পাহাড়ের প্রকৃতির শব্দ ও জীবজন্তুর ডাক ভালো করেই চিনি, কিন্তু এই আওয়াজ সম্পূর্ণ অচেনা ছিল। কিছুক্ষণ পরপর আমার মনে হচ্ছিল, তাঁবুর ঠিক বাইরে কেউ একজন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে। পায়ের টানার খসখস শব্দে আমার সারা রাত একটুও ঘুম হলো না। সকালে আরিফকে বলতেই ও বলছিল, ঘুমে থাকায় কিছু শোনেনি।
লোকালয়ে ফিরে গ্রামবাসীদের জিজ্ঞেস করতেই তারা বলছিল, ‘এখানে খারাপ কিছু নেই, ওসব আপনাদের মনের ভুল।’ কিন্তু একই সঙ্গে চারজনের মনের ভুল কীভাবে হয়?
আসল ট্র্যাজেডি শুরু হলো বাড়ি ফেরার পর।
আমি রাতে ঘুমাতে পারছিলাম না। রুম গুছিয়ে বাইরে যেতাম, ফিরে দেখতাম সবকিছু অদ্ভুতভাবে এলোমেলো হয়ে আছে। মাঝরাতে হঠাৎ ঘরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক রকম বেড়ে যেত, যেন গা পুড়ে যাচ্ছে। দমবন্ধ করা এক অনুভূতি। আরিফকে ফোনে সব জানাতেই ও আঁতকে উঠে বলল, ‘অবস্থা ভালো ঠেকছে না, তুই দ্রুত হুজুরের কাছে যা!’
সোনাইছড়ির সেই রাত আমাদের চেনা বাস্তবটা ওলটপালট করে দিয়েছিল।






